মেক্সিকোর ইকুয়েডরের বিপক্ষে জয়ের পর উদযাপনের সময় চার সমর্থকের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মেক্সিকো বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচকে সামনে রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্বিগুণ করার পাশাপাশি ‘অ্যাঞ্জেল অব ইনডিপেনডেন্স’ স্মৃতিস্তম্ভ এবং মেক্সিকো সিটির প্রধান চত্বরের ফ্যান ফেস্টে দর্শকসংখ্যা সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
Advertisement
শুক্রবার মেক্সিকো সিটির মেয়র ক্লারা ব্রুগাদা ম্যাচের আগে ও পরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তিনি জানান, শ্বাসরোধ ও হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে চার সমর্থকের মৃত্যুর ঘটনার পর এসব অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক শহর হওয়ার পাশাপাশি ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মেক্সিকো দল এত দূর পর্যন্ত পৌঁছানোয় দেশটির ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। স্টেডিয়ামের অতিরিক্ত টিকিটমূল্যের কারণে অনেক সমর্থক মাঠে যেতে না পেরে রাস্তায় নেমে বড় পর্দায় খেলা দেখছেন এবং দলের জয় উদযাপন করছেন।
ফেব্রুয়ারিতে গুয়াদালাহারায় এক মাদকচক্রের প্রধানের মৃত্যুর পর হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
Advertisement
নিরাপত্তা জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ৩০ জুনের মর্মান্তিক ঘটনার পর। সেদিন শহরের কেন্দ্রস্থল পাসেও দে লা রেফর্মা এলাকার আশপাশে উদযাপনের সময় ১৯ ও ৪৪ বছর বয়সী দুই নারী এবং ৪৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তি শ্বাসরোধে মারা যান।
এছাড়া জরুরি সেবা কর্মীরা ২৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে মৃগীরোগজনিত খিঁচুনি ও পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণের কারণে চিকিৎসা দেন। পরে হাসপাতালে হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে তাঁরও মৃত্যু হয়।
চারটি মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে মেক্সিকো সিটির অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে। মেয়র ক্লারা ব্রুগাদা সাংবাদিকদের জানান, রোববার মনুমেন্ট টু ইন্ডিপেনডেন্স, যা সাধারণভাবে ‘অ্যাঞ্জেল’ নামে পরিচিত, এবং জোকালো চত্বরে প্রবেশ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে নির্ধারিত সংখ্যার বেশি মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
মেক্সিকো সিটির জননিরাপত্তা সচিব পাবলো ভাসকেজ জানান, বিজয় উদযাপনের জনপ্রিয় স্থান অ্যাঞ্জেল স্মৃতিস্তম্ভ এলাকায় সর্বোচ্চ ২৫ হাজার মানুষ প্রবেশ করতে পারবেন। এই সীমা পূর্ণ হয়ে গেলে সমর্থকদের পাসেও দে লা রেফর্মা সড়কের বিভিন্ন বিকল্প স্থানে পাঠানো হবে, যেখানে বড় পর্দায় ম্যাচ দেখা ও উদযাপনের ব্যবস্থা থাকবে।
Advertisement
একই ব্যবস্থা থাকবে শহরের প্রধান চত্বর জোকালোতেও। নির্ধারিত ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে গেলে সেখানে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং দর্শকদের মেক্সিকো সিটির বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত ৫০টির বেশি নির্ধারিত ভিউয়িং জোনে গিয়ে ম্যাচ দেখার অনুরোধ জানানো হবে।
ভাসকেজ আরও জানান, পাসেও দে লা রেফর্মা এলাকায় ৬ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে, যা ৩০ জুনের তুলনায় দ্বিগুণ। এছাড়া এস্তাদিও আজতেকার আশপাশে দায়িত্ব পালন করবেন ৭ হাজার ৫০০ পুলিশ সদস্য এবং জোকালো এলাকায় থাকবেন আরও ৩ হাজার ৩০০ জন।
তিনি আরও জানান, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে অ্যাঞ্জেল অব ইনডিপেনডেন্স স্মৃতিস্তম্ভের আশপাশে বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হবে। ওই এলাকায় ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা ও ডেলিভারি কর্মীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি পাসেও দে লা রেফর্মা সংলগ্ন কয়েকটি মেট্রো ও মেট্রোবাস রুট কৌশলগতভাবে সাময়িক বন্ধ রাখা হবে।
মেক্সিকো সিটির সরকারবিষয়ক সচিব সিজার ক্রাভিওতো জানান, ৫ জুলাই ভোর থেকে পরদিন পর্যন্ত শহরের কেন্দ্রস্থলের রাস্তায় মদ্যপ পানীয় বিক্রি নিষিদ্ধ থাকবে। তবে ভোজসভা কক্ষ, রেস্তোরাঁ, হোটেল, ব্যক্তিগত ক্লাব, সিনেমা হল, থিয়েটার ও অডিটোরিয়ামে মদ্যপানের অনুমতি থাকবে।
অন্যদিকে, শহরের নাগরিক সুরক্ষা সচিব মিরিয়াম উরযুয়া সমর্থকদের ভিড়ের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ খেলাধুলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘ওয়ান্ট টু ফ্লাই!’, যেখানে একজনকে জনতার ওপর ছুঁড়ে দেওয়া হয় এবং অন্যরা তাকে ধরে ফেলে, এবং ‘শ্যাল উই সুইম!’, যেখানে ডিজনির ফাইন্ডিং নেমো চলচ্চিত্রের চরিত্র ডরির জনপ্রিয় গানের তালে সমর্থকেরা একসঙ্গে ঢেউয়ের মতো সামনে এগিয়ে যান।
কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই শুক্রবার গভীর রাতে রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলের সান্তা ফে এলাকায় অবস্থিত নিজেদের হোটেলে পৌঁছায় ইংল্যান্ড দল।
দলের আগমন নিশ্চিত করতে মোতায়েন ছিলেন কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য। এ সময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থকেরা করতালির মাধ্যমে ইংল্যান্ড দলকে স্বাগত জানান। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী, ন্যাশনাল গার্ড এবং মেক্সিকো সিটির স্থানীয় পুলিশও দায়িত্ব পালন করে।
তবে অন্তত প্রথম রাতে ইংল্যান্ড দলের হোটেলের বাইরে বড় ধরনের কোনো সমর্থক সমাবেশ দেখা যায়নি। আগের ম্যাচে ইকুয়েডরের বিপক্ষে যেমন মেক্সিকোর প্রতিপক্ষ দলের হোটেলের বাইরে অসংখ্য সমর্থক জড়ো হয়ে রাতভর উচ্চ শব্দ করে তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন, এবার তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
আরএএইচইউএল/আইএন