ভারি বর্ষণের কারণে বাংলাদেশের কিছু জায়গা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। লাখ মানুষ ক্ষত্রিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যা শুধু ঘরবাড়ি, ফসল কিংবা রাস্তাঘাটের ক্ষতি করে না, মানুষের মনে তৈরি করে অনিশ্চয়তা, ভয় এবং উদ্বেগও। হঠাৎ ঘর ছাড়তে হওয়া, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হারানোর আশঙ্কা, সন্তান বা বয়স্ক স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
Advertisement
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে স্থির থাকাটাও জরুরি। কারণ পরিবারের একজন সদস্য যদি শান্ত থাকতে পারেন, তাহলে অন্যদের মাঝেও সেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পরিস্থিতি মেনে নেওয়াই প্রথম ধাপদুর্যোগের সময় সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না। তাই যা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তা নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন। কী হারিয়েছেন, সেটি নিয়ে বারবার ভাবার চেয়ে এখন কী করা প্রয়োজন, সেদিকে মনোযোগ দিন। বাস্তবতা মেনে নিয়ে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়াই কঠিন সময় পার করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
পরিবারের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুনবন্যার সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলুন। কেউ ভয় পাচ্ছে কি না, কার কী প্রয়োজন, কে কী ভাবছে জানার চেষ্টা করুন। অনেক সময় শুধু নিজের উদ্বেগের কথা কাউকে বলতে পারলেও মানসিক চাপ অনেকটা কমে যায়। পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে সাহস দিলে অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি হয়।
Advertisement
বন্যার সময় শিশুকে দিন নিরাপত্তার অনুভূতি
শিশুদের সামনে আতঙ্ক ছড়াবেন নাশিশুরা বড়দের আচরণ দেখে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে। তাই তাদের সামনে অতিরিক্ত ভয়, কান্না বা হতাশা প্রকাশ না করাই ভালো। সহজ ভাষায় পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলুন এবং আশ্বস্ত করুন যে সবাই মিলে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করছেন। গল্প বলা, ছবি আঁকা, গান শোনা কিংবা ছোটখাটো খেলায় শিশুদের ব্যস্ত রাখলে তাদের মানসিক চাপও কমে।
গুজব থেকে দূরে থাকুনদুর্যোগের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে, যা মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই শুধু সরকারি সংস্থা, আবহাওয়া অধিদপ্তর বা বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করুন। যাচাই না করা খবর অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা থেকেও বিরত থাকুন।
ছোট ছোট রুটিন বজায় রাখুনবন্যার সময় স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হলেও যতটা সম্ভব নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করুন। সময়মতো খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, ওষুধ খাওয়া এবং সুযোগ পেলেই বিশ্রাম নেওয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন। ছোট ছোট এই রুটিন মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
Advertisement
বিপদের সময় একসঙ্গে থাকাই সবচেয়ে বড় সাহস
একে অপরকে দায়িত্ব ভাগ করে দিনসব দায়িত্ব একজনের কাঁধে চাপিয়ে না দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দিন। কেউ খাবার গুছিয়ে রাখবে, কেউ শিশু বা বয়স্কদের দেখাশোনা করবে, কেউ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সামলাবে। সবাই যখন কোনো না কোনো কাজে যুক্ত থাকে, তখন অসহায়ত্বের অনুভূতি কমে যায় এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
নিজের শরীরেরও যত্ন নিনমানসিকভাবে শক্ত থাকতে হলে শরীরও সুস্থ রাখা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়া, ঘুমের অভাব বা পানিশূন্যতা মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সুযোগ পেলেই বিশ্রাম নিন, বিশুদ্ধ পানি পান করুন এবং যতটা সম্ভব পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
আরও পড়ুন বৃষ্টির দিনে অফিসে যাতায়াত সহজ করার উপায় প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে দ্বিধা করবেন নাঅনেকেই মনে করেন, কষ্ট নিজের মধ্যেই চেপে রাখতে হবে। কিন্তু যদি দীর্ঘদিন ভয়, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা বা হতাশা কাটতে না চায়, তাহলে চিকিৎসক, কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহায়তা নেওয়া উচিত। একইভাবে প্রতিবেশী, স্বেচ্ছাসেবক বা আত্মীয়দের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় সহায়তা চাইতে দ্বিধা করবেন না।
আরও পড়ুন ছাতা কেনার আগে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেনবন্যার মতো দুর্যোগ একসময় শেষ হয়, কিন্তু এই সময় পরিবারের সদস্যরা যেভাবে একে অপরের পাশে থাকেন তাহলে কঠিন সময়কে অনেকটাই সহজ করে দিতে পারে। মনে রাখবেন, দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো পরিবার, আর সেই পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একে অপরের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা।
সূত্র: ইউনিসেফ, ভিটা হেলথ গ্রুপ, মিডিয়াম
এসএকেওয়াই