বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দেয়। বন্যার কারণে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন বিপর্যস্ত হয়; তেমনই কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতেও নেমে আসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। বন্যার পানিতে ফসলের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে গবাদিপশু। অনেক কৃষক পরিবারের কাছে একটি গরু বা কয়েকটি ছাগল সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং আয়ের প্রধান উৎস। তাই বন্যার সময় প্রাণিসম্পদ রক্ষা করা মানে শুধু পশু বাঁচানো নয়, একটি পরিবারের জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা।
Advertisement
বন্যার সময় গবাদিপশুর সুরক্ষায় কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত, কোন বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে এবং দুর্যোগকালীন সময়ে কী কী করণীয়। এসব বিষয় নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন ইন্টার্ন পশুচিকিৎসক মো. লিখন ইসলাম।
গবাদিপশুর সুরক্ষায় বন্যার আগে যেভাবে প্রস্তুতি নেবেনদুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা। তাই বন্যার সম্ভাবনা দেখা দিলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং বন্যার সম্ভাবনা দেখা দিলে গবাদিপশুকে দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আগেই পরিকল্পনা করে রাখতে হবে। বন্যার সময় পশুর খাদ্য ও পানির সংকট এড়াতে শুকনো খড়, সাইলেজ, ঘাস, দানাদার খাদ্য এবং বিশুদ্ধ পানির পর্যাপ্ত মজুত রাখতে হবে। পশুখাদ্য অবশ্যই উঁচু, শুকনো ও নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে বন্যার পানিতে তা নষ্ট না হয়। প্রয়োজন হলে কলা, কাঁঠাল, বাঁশসহ অন্যান্য নিরাপদ গাছের পাতা বিকল্প খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
বন্যা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই সরকারি টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী, ক্ষুরা রোগ (এফএমডি), লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি), ব্ল্যাক কোয়ার্টার (বিকিউ), অ্যানথ্রাক্সসহ প্রয়োজনীয় রোগের টিকা সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি গাভি, বাছুর ও অসুস্থ পশুর জন্য আলাদা যত্ন ও ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা জরুরি।
Advertisement
বন্যার পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করলে কোনো অবস্থাতেই গবাদিপশুকে নিচু বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বেঁধে রাখা যাবে না। দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়স্থল, উঁচু বাঁধ অথবা নির্ধারিত পশু আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে হবে। পশুকে কখনোই বন্যার দূষিত পানি পান করতে দেওয়া যাবে না। সম্ভব হলে বিশুদ্ধ পানি অথবা ফুটিয়ে ঠান্ডা করা পানি সরবরাহ করতে হবে। একইসঙ্গে ভেজা, পচা বা ছত্রাকযুক্ত খড় ও খাদ্য খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এগুলো খাওয়ালে খাদ্যে বিষক্রিয়া ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
বন্যার সময় গোয়ালঘর যতটা সম্ভব পরিষ্কার ও শুকনো রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে খড়, তুষ বা শুকনো উপকরণ বিছিয়ে পশুর দাঁড়ানোর জন্য আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দীর্ঘসময় পানিতে অবস্থান করলে পশুর পায়ে ক্ষত, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। তাই পশুর শারীরিক অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
দুধেল গাভিকে নিয়মিত দোহন করতে হবে, যাতে ওলানে প্রদাহ (মাস্টাইটিস) সৃষ্টি না হয়। বাছুর ও গর্ভবতী পশুর প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে। প্রয়োজনে ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী ইলেকট্রোলাইট, খনিজ ও ভিটামিন সরবরাহ করা যেতে পারে।
বন্যার পরে যেসব কাজ করবেনবন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে শেষ হয় না। বরং এ সময় বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যেতে পারে। তাই বন্যার পর গোয়ালঘর ভালোভাবে পরিষ্কার করে জীবাণুনাশক দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে এবং সম্পূর্ণ শুকিয়ে নেওয়ার পর পশু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
Advertisement
বন্যার পরপরই নতুন গজানো ঘাস বা বন্যার পানিতে ডুবে থাকা ঘাস গবাদিপশুকে খাওয়ানো উচিত নয়। প্রথম কয়েক দিন শুকনো খড় ও নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করা ভালো। ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী কৃমিনাশক প্রয়োগ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় টিকাদান সম্পন্ন করতে হবে।
যেসব পশুর মধ্যে দুর্বলতা, জ্বর, ডায়রিয়া, ক্ষুধামন্দা, শ্বাসকষ্ট বা খোঁড়ানোর মতো লক্ষণ দেখা যায়। তাদের দ্রুত আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো মৃত পশু খোলা স্থানে ফেলে রাখা যাবে না। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে, যাতে রোগ ছড়িয়ে না পড়ে।
গবাদিপশুর জন্য বন্যা মোকাবিলায় যেসব উদ্যোগ নেওয়া উচিতজলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বন্যার ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রতিটি গ্রামে পশু আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন, জরুরি পশুখাদ্যের মজুত নিশ্চিত করা, ভ্রাম্যমাণ ভেটেরিনারি সেবা সম্প্রসারণ এবং খামারিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। একইসঙ্গে প্রতিটি খামারির উচিত নিজের খামারের জন্য একটি দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করে রাখা।
গবাদিপশু শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি গ্রামীণ পরিবারের জীবিকা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের অন্যতম ভিত্তি। তাই সঠিক পরিকল্পনা, আগাম প্রস্তুতি, নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে বন্যায় প্রাণিসম্পদের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যক্তি, সমাজ এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে প্রাণিসম্পদ সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এসইউ