কৃষি ও প্রকৃতি

গাছ লাগানোর মৌসুম কিন্তু এখনই

মাহাফুজা শিরিন

Advertisement

পরিবেশবান্ধব গাছ লাগানোর গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। শখ করে অনেকেই বাগান করেন, বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগিয়ে থাকেন। অনেকেই আছেন ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে লাগিয়ে থাকেন নানা ধরনের ফল এবং বনজ গাছ। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ভরা বর্ষাই হলো বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণের সবচেয়ে মোক্ষম সময়। গাছ যেমন পরিবেশের বন্ধু; ঠিক তেমনই মানুষেরও বন্ধু।

গাছ মনকে প্রশান্তি দেয় এবং আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে। এ ছাড়া সবুজ গাছ ছাড়া কোনো বাসস্থান হোক সেটা গ্রাম কিংবা শহর, কেমন যেন অসম্পূর্ণ লাগে। গাছের সবুজ পাতা যেন প্রকৃতির নিজস্ব এক ক্যানভাস। গ্রামের আঙিনায় কিংবা নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায়, আমাদের চারপাশকে সবুজে ভরিয়ে তোলার জন্য বছরের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়টি কিন্তু এখনই। আষাঢ়-শ্রাবণের এই ভরা বর্ষায় যখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে; তখন মাটি ফিরে পায় তার প্রাণ আর তপ্ত ধরা শান্ত হয়। প্রকৃতি নিজেই এই সময় চারা গাছের জন্য পরম মমতার কোল পেতে দেয়। প্রকৃতিপ্রেমী সচেতন ব্যক্তিরা সুযোগটা কখনো হাতছাড়া করেন না।

বলা হয়—বৃক্ষরোপণের জন্য বর্ষাকাল উপযুক্ত ঋতু। যেহেতু বৃক্ষরোপণের আদর্শ সময় এখনই। এই যেমন আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র এই কয়েক মাসই হচ্ছে গাছের চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়। তাই প্রকৃতিপ্রেমী যারা আছেন, তারা দেরি না করে আপনার উঠোন কিংবা বারান্দায় লাগিয়ে ফেলুন পছন্দের কোনো ফল, ফুল বা বনজ গাছ। যাদের গাছ লাগানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে জায়গা এবং সামর্থ্য আছে; তারা আর দেরি না করে লাগিয়ে ফেলুন পরিবেশবান্ধব গাছ।

Advertisement

আরও পড়ুন নটডাঙ্গা বিলের শাপলা আর পুঁটি মাছের ঝোল

বর্ষাকালে চারা রোপণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রাকৃতিক সেচ। এই সময় গাছ লাগালে বেশিরভাগ গাছের পরিচর্যাই প্রাকৃতিকভাবে পূরণ হয়ে যায়। এই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে এবং মাটির নিচের স্তর পর্যন্ত পর্যাপ্ত জল পৌঁছে যায়। ফলে নতুন রোপণ করা চারার শেকড় খুব সহজেই মাটির গভীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রকৃতি নিজ থেকেই আপন রূপে সাজে। কৃত্রিমভাবে জল দেওয়ার ঝামেলা যেমন কমে; তেমনই কড়া রোদে চারা শুকিয়ে মারা যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে না বললেই চলে। অর্থাৎ প্রকৃতির এই অনুকূল পরিবেশ নতুন একটি প্রাণকে দ্রুত বেড়ে উঠতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, সঠিক জায়গায় সঠিক চারাটি নির্বাচন করা। ​বসতবাড়ির আঙিনায় বা ঘরের ঠিক আশেপাশে অথবা বড় বাড়ি হলে, বাড়ির পেছনে আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, মাল্টা কিংবা লেবুর মতো ফলদ গাছ লাগানো চমৎকার সিদ্ধান্ত। এতে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটার পাশাপাশি আবার ছায়াও পাওয়া যায়। এ ছাড়া আমলকী, অর্জুন বা নিমের মতো ঔষধি গাছও আঙিনায় জায়গা পেতে পারে। ​সীমানা বা পতিত জমিতেও গাছ লাগানো যায়। বাড়ির সীমানা ঘেঁষে বা রাস্তার পাশে দেবদারু, রেইনট্রি বা মেহগনির মতো দীর্ঘমেয়াদি কাঠ উৎপাদনকারী বনজ গাছ লাগানো উচিত। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এগুলো যেন গ্রামের বাড়ি বা ভবনের মূল কাঠামোর খুব কাছাকাছি না হয়।

এ ছাড়া ছাদ কিংবা বারান্দায়ও গাছ লাগানো সম্ভব। শহরে যাদের আঙিনা নেই, তাদের জন্য ছাদ বা বারান্দাই ভরসা। বিভিন্ন ধরনের ফলগাছ, ফুলগাছ ও সবজি থেকে শুরু করে ধনেপাতা, পুদিনা পাতাসহ সব ধরনের গাছ ফলানো সম্ভব। মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের প্রধান মালী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্ষাকালে মৌসুমি এবং বারোমাসি ফুল গাছ লাগানো যেতে পারে।’ মৌসুমি ফুলের মধ্যে আছে তরুণিকা, কসমস, পুত্তলিকা, জিনিয়া, বোতাম, দোপাটি, নয়নতারা, মোরগকদম, অ্যামারেন্থাস ইত্যাদি বর্ষার ফুল। এ ছাড়া বারোমাসি ফুলের মধ্যে আছে, চেরি, কামিনী, গাঁদা, মোসন্ডা, অ্যালামেন্ডা, রজনীগন্ধা, কাঠগোলাপ, গালফিমিয়া, দোলনচাঁপা, গ্লাডিওলাস, লিলি ইত্যাদি। এমন হরেক রকম ফুলগাছ থেকে আপনার পছন্দ অনুযায়ী বর্ষাকালে ভরিয়ে তুলুন নিজের শখের বাগান।

আরও পড়ুন প্রাণিমণ্ডলে জীবজগতের বেঁচে থাকার লড়াই

ফুল আর ফল গাছ পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুব কম থাকলেও বনজ এবং ঔষধি গাছ লাগাতে আমাদের মধ্যে কিছু কিছু মানুষ অনেক সময় আলসেমি করে থাকেন। অথচ এই বনজ এবং ঔষধি গাছ বাড়ির শোভাবৃদ্ধির পাশাপাশি নিশ্চিত করবে ভবিষ্যৎ আয়ের ব্যাপারটিও। বনজ গাছ থেকে পাবেন মূল্যবান কাঠ। এর মধ্যে রয়েছে গর্জন, মেহগনি, কড়ই, সেগুন, শিশু, শিরীষ, গামারি ইত্যাদি। আনুমানিক একটি বনজ গাছের চারার দাম ২০-৫০ টাকা। সাধারণত বনজ গাছ লাগানোর ১০-১৫ বছর পর উল্লেখযোগ্য অর্থমূল্যের কাঠ পাওয়া যেতে পারে। সুতরাং ভবিষ্যৎ সঞ্চয় নিশ্চিত করে কোনো নার্সারিতে গিয়ে চারা কিনে বাড়ির আঙিনায় লাগিয়ে ফেলুন পছন্দের বনজ গাছগুলো।

Advertisement

এ ছাড়া আপনার শহরের বাসার ছাদে ড্রামে করে লাগিয়ে ফেলতে পারেন বারোমাসি জাতের আম, পেয়ারা, ডালিম কিংবা বিভিন্ন বিদেশি ফলের গাছ। এসব বারোমাসি ফলের চাষ এখন দারুণ জনপ্রিয়। আর বারান্দার অল্প আলো-ছায়ায় মানিপ্ল্যান্ট, ক্যালাথিয়া বা বিভিন্ন ইনডোর প্লান্টও করা যায়। তবে শুধু গাছ রোপণ করলেই হবে না, গাছ রোপণের পর খেয়াল রাখতে হবে গাছের গোড়ায় যেন জল না জমে। বর্ষার অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো জল জমে যাওয়া। চারা গাছের গোড়ায় জল জমলে শেকড় পচে গাছ মারা যেতে পারে। তাই গাছের গোড়ার মাটি চারপাশের মাটির চেয়ে কিছুটা উঁচু ও ঢালু করে দেওয়া উচিত, যাতে জল সহজে সরে যায়। বর্ষার ঝোড়ো হাওয়া বা টানা বৃষ্টিতে কচি চারাটি হেলে পড়তে পারে। তাই লাগানোর পরপরই একটি শক্ত কাঠি বা বাঁশের খুঁটি দিয়ে গাছটিকে সোজা করে বেঁধে দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি গবাদিপশু বা ছোট শিশুদের হাত থেকে বাঁচাতে চারপাশে খাঁচা বা বেড়া দেওয়া প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম সময়ে আমাদের চারপাশের পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখতে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। ​একটি গাছ লাগানো মানে কেবল একটি সবুজ অবয়ব দাঁড় করানো নয়; এটি হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও স্বাস্থ্যকর পৃথিবীর নিশ্চয়তা। প্রকৃতির এই অকৃপণ আহ্বানে সাড়া দিয়ে চলুন আমরা প্রত্যেকে অন্তত একটি করে চারাগাছ লাগাই। সরকারি ও বেসরকারিভাবে এখন দেশজুড়ে চলছে বৃক্ষমেলা, নার্সারিগুলোও সেজেছে হরেক রকমের মানসম্মত চারার পসরায়। আপনার হাতের ছোঁয়ায় বেড়ে ওঠা একটি গাছ আগামী দিনে হয়ে উঠুক পাখির নীড়, অক্সিজেনের আধার আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৈরি হোক কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়।

এসইউ