সাব্বির হোসাইন
Advertisement
এশিয়ার মাত্র কয়েকটি দেশের বনে-জঙ্গলে বাঘের অস্তিত্ব টিকে আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সাগরের কোলঘেঁষে জেগে ওঠা নোনা জলের ম্যানগ্রোভ বন ‘সুন্দরবন’ হলো বাঘের অন্যতম প্রধান বিচরণস্থল। এখানকার বাঘ বিশ্বজুড়ে ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ নামে পরিচিত। যা তার অনন্য ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের বাঘের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
সাম্প্রতিক বাঘশুমারি আমাদের কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। ২০২৩-২৪ সালে আধুনিক ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালিত সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৫টিতে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালের প্রথম ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি (প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে ঘনত্ব ২.১৭)।
২০১৮ সালে তা বেড়ে হয় ১১৪টি (ঘনত্ব ২.৫৫) এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জরিপে তা রেকর্ড ১২৫টিতে (ঘনত্ব ২.৬৪) উন্নীত হয়। এ জরিপে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঘের শাবকের উপস্থিতিও শনাক্ত করা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বনভূমিতে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রম সফল হওয়ায় এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
Advertisement
তবে এই আনন্দের পেছনে লুকিয়ে আছে বড় শঙ্কা। জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন, পরিবেশের বিপর্যয় এবং উপযুক্ত বাসস্থানের অভাবে বাঘের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির সাথে বাঘেরা সব সময় খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না। পরিবেশবিদদের মতে, যদি এখনই বাঘ সংরক্ষণে আরও জোরদার ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম গ্রহণ না করা হয়, তবে অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের এই গর্ব।
বাঘের সংখ্যা হ্রাসের কারণআমাদের দেশসহ বিশ্বজুড়েই বাঘের সংখ্যা দিন দিন কমছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস, পাহাড় কাটা, যান্ত্রিক যানবাহনের আধিক্য এবং সর্বোপরি জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বাঘের আদি বাসস্থান ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
অথচ বাঘ কেবল একটি বন্যপ্রাণী নয়; সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার মূল চালিকাশক্তি। বাঘ টিকে থাকলে বন বাঁচবে, আর বন বাঁচলে রক্ষা পাবে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাঘের নিরাপদ বংশবিস্তার ও সুরক্ষায় আমরা এখনো আশানুরূপ সচেতন নই।
আরও পড়ুন বন্যায় গবাদিপশুর সুরক্ষায় করণীয় বাঘ রক্ষায় করণীয়সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় পরিবেশবিদরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। যথা:
Advertisement
সুন্দরবনের ক্ষতি করতে পারে এমন যে কোনো ধরনের শিল্প-কারখানা বা বাণিজ্যিক প্রকল্প অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। উজাড় হওয়া বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার করে বাঘের জন্য নিরাপদ ও শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চোরা শিকার ও অবৈধ বাণিজ্য রোধবাঘের চামড়া ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আন্তর্জাতিক অবৈধ বাজার ধ্বংস করতে হবে। ‘বন অপরাধ দমন আইন’ কঠোরভাবে প্রয়োগ করে চোরা শিকারিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বন বিভাগের নিবিড় টহল জোরদার করতে হবে। বনের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বনের ওপর স্থানীয় মানুষের নির্ভরশীলতা কমাতে তাদের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা জরুরি।
আরও পড়ুন প্রচণ্ড গরমে পোষা প্রাণীর যত্ন খাদ্যের প্রাচুর্য ও প্রজনন সুবিধাবাঘের প্রধান খাদ্য—যেমন হরিণ ও বন্য শূকরের সংখ্যা স্বাভাবিক রাখতে হবে। খাদ্যের অভাব হলেই বাঘ লোকালয়ে চলে আসে এবং মানুষের হাতে মারা পড়ে। তাই বনের ভেতর তাদের খাদ্য ও অবাধ প্রজননের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে মানুষ প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। এখনই সময় পরিবেশ ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ড ও অতিরিক্ত যান্ত্রিক যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করার। অন্যথায় আমরা যেমন চিরতরে বন হারাব; তেমনই বিলুপ্ত হয়ে যাবে আমাদের অহংকার রয়েল বেঙ্গল টাইগার। মনে রাখতে হবে, বন বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে আর পরিবেশ বাঁচলেই কেবল মানবজাতি টিকে থাকবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গী।
এসইউ