কোনো শহরকে সত্যিকার অর্থে জানতে হলে শুধু তার বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানগুলো দেখলেই হয় না। সেই শহরের মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে হয়। তার গণপরিবহনে চড়তে হয়। তার সকাল, দুপুর কিংবা বিকেলের ছন্দের ভেতর নিজেকে মিশিয়ে দিতে হয়। তাহলেই শহরটি ধীরে ধীরে তার আসল রূপ উন্মোচন করে। টরন্টোতে এসে আমারও এমনই অভিজ্ঞতা হলো, যা নিছক এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়ার যাত্রা ছিল না বরং ছিল একটি শহরের হৃৎস্পন্দন অনুভব করার সুযোগ। সেদিনের সফরসঙ্গী ছিলেন আমার সহধর্মিণী ময়না। জীবনের দীর্ঘ পথচলার মতো ভ্রমণের পথেও তার উপস্থিতি প্রতিটি মুহূর্তকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
Advertisement
আমরা দুজনই নতুন কোনো শহরে গেলে মানুষের জীবনযাত্রা, রাস্তা, গাছপালা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং প্রকৃতিকে গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখি। কারণ একটি শহরের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার দৈনন্দিন জীবনের ভেতরেই। সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে স্কারবোরোর কেনেডি রোডের আশপাশ তখন কর্মব্যস্ত মানুষের পদচারণায় মুখর। কোথাও অফিসফেরত মানুষের অপেক্ষা, কোথাও শিক্ষার্থীদের হাসি, কোথাও আবার বৃদ্ধ দম্পতি ধীর পায়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। বাতাসে ছিল গ্রীষ্মের কোমল উষ্ণতা, তবে তার মধ্যে কোনো ক্লান্তি ছিল না। রাস্তার দুপাশে সারি সারি সবুজ গাছ যেন শহরকে একটি নীরব আশ্রয় দিয়ে রেখেছে।
আমরা একটি বাসস্টপে এসে দাঁড়ালাম। হাতে ছিল প্রেস্টো কার্ড। ছোট্ট এই কার্ডটিই যেন টরন্টোর বিশাল গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রবেশপত্র। বাস, স্ট্রিটকার কিংবা সাবওয়ে, সব পথই এর মাধ্যমে এক সুতোয় গাঁথা। বর্তমানে প্রেস্টো কার্ডে একজন প্রাপ্তবয়স্ক যাত্রীর একবারের ভাড়া মাত্র ৩ দশমিক ৩০ কানাডিয়ান ডলার। প্রথমবার কার্ড ট্যাপ করার পর পরবর্তী দুই ঘণ্টা পর্যন্ত একই ভাড়ায় যতবার ইচ্ছা বাস, ট্রাম কিংবা ট্রেনে ওঠানামা করা যায়। শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে আবার ফিরে এলেও এই সময়ের মধ্যে নতুন করে ভাড়া দিতে হয় না।
ফলে দর্শনার্থী কিংবা নতুন ভ্রমণকারীদের জন্য শহরটিকে কাছ থেকে দেখার এটি এক দারুণ সুযোগ। নির্ধারিত সময়ে বাস এসে থামল। কেউ ধাক্কাধাক্কি করছে না, কেউ অস্থির নয়। যাত্রীরা একে একে উঠে পড়ছেন। চালক হাসিমুখে সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। এই ছোট্ট সৌজন্যবোধও যেন টরন্টোর নাগরিক সংস্কৃতি ও শৃঙ্খলাবোধের নীরব পরিচয় বহন করে। বাস চলতে শুরু করল। জানালার পাশে বসে বাইরের পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে লাগলাম। প্রশস্ত রাস্তার দুপাশে পরিচ্ছন্ন ফুটপাত, সাইকেলের জন্য আলাদা লেন, সবুজ পার্ক, ছোট্ট কফিশপ, বহুতল ভবন আর মাঝেমধ্যে লাল ইটের পুরোনো বাড়ি। মনে হচ্ছিল, আধুনিকতার ভেতরেও শহরটি তার অতীতকে সযত্নে লালন করছে।
Advertisement
কিছুক্ষণ পর বাস এসে পৌঁছাল কেনেডি স্টেশনে। এটি শুধু একটি স্টেশন নয়, টরন্টোর পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্র। এখানে বাস, সাবওয়ে এবং স্ট্রিটকার একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে সহজ করে তুলেছে। স্টেশনের ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো যেন একটি চলমান পৃথিবীতে প্রবেশ করেছি। কেউ দ্রুত হেঁটে যাচ্ছেন অফিসে পৌঁছানোর তাড়ায়, কেউ পরিবারের সঙ্গে গল্প করতে করতে প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। সবাই যেন নীরবে একটি অলিখিত নিয়ম মেনে চলছেন। এমন শৃঙ্খলা দেখে অজান্তেই নিজের দেশের কথা মনে পড়ে গেল। ভাবলাম, উন্নত অবকাঠামোর পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও একটি দেশের বড় সম্পদ। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। দূরে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে আলো ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পরই ট্রেন এসে থামল। দরজা খুলতেই যাত্রীরা আগে নামলেন, তারপর অন্যরা উঠলেন। এত মানুষের মধ্যেও কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো নেই। এই দৃশ্যটুকু যেন অদৃশ্য সামাজিক শিক্ষার প্রতিফলন।
ট্রেনে উঠে আমরা পাশাপাশি বসলাম। ময়না জানালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, বিদেশের শহরগুলোকে ট্রেনের জানালা দিয়েই সবচেয়ে সুন্দর দেখা যায়। তার কথার সঙ্গে আমিও একমত হলাম। সত্যিই, ট্রেনের জানালা যেন একটি চলমান ক্যানভাস। প্রতিটি মুহূর্তে দৃশ্য বদলাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেই শহরের গল্প ধরা পড়ছে। কখনো ট্রেন ভূগর্ভস্থ অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে যাচ্ছে, আবার কিছুক্ষণ পরই আলোর জগতে উঠে আসছে। জানালার বাইরে দেখা যাচ্ছে সারি সারি গাছ, দূরে উঁচু কনডোমিনিয়াম, কোথাও শিশুদের খেলার মাঠ, কোথাও ছোট্ট পার্কে বেঞ্চে বসে গল্প করছেন বৃদ্ধ দম্পতি। শহরের প্রতিটি দৃশ্য যেন শান্ত অথচ প্রাণবন্ত। ময়নার সঙ্গে গল্প করতে করতে কখন যে পথ এগিয়ে যাচ্ছিল, তা টেরই পাইনি। মাঝেমধ্যে আমরা দুজনই চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। কিছু দৃশ্য আছে, যা ভাষার চেয়ে নীরবতায় অনেক বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে।
টরন্টোকে পৃথিবীর অন্যতম বহুসাংস্কৃতিক শহর বলা হয়। সেই বৈচিত্র্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে গণপরিবহনের ভেতরে। একই কামরায় পাশাপাশি বসে আছেন বিভিন্ন দেশের মানুষ। কারো ভাষা ইংরেজি, কারো ফরাসি, কারো আরবি, কারো চীনা, কারো আবার বাংলা। কারো মাথায় পাগড়ি, কারো হিজাব, কারো হাতে বই, কারো কোলে শিশু। সবাই নিজ নিজ পরিচয় নিয়ে উপস্থিত, কিন্তু শহরটি তাদের সবাইকে সমানভাবে আপন করে নিয়েছে। এই দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ একটি শহরে এসে নিজেদের স্বপ্ন বুনছেন। কেউ নতুন জীবন শুরু করেছেন, কেউ পড়াশোনা করছেন, কেউ ব্যবসা করছেন, কেউবা অবসরের জীবন কাটাচ্ছেন। প্রত্যেকের গল্প আলাদা, কিন্তু তাদের গন্তব্যের পথ এক। এই বৈচিত্র্যের মাঝেই টরন্টোর সৌন্দর্য এবং শক্তি নিহিত।
ট্রেনের ছন্দময় শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আমার মনেও নানা স্মৃতি ভেসে উঠছিল। বাংলাদেশের ট্রেন ভ্রমণের কথা মনে পড়ল। খোলা জানালা দিয়ে ধানের ক্ষেত, নদী, কাশফুল, ছোট্ট স্টেশন আর চায়ের দোকানের ডাক। সেই স্মৃতির সঙ্গে টরন্টোর আধুনিক রেলযাত্রার কোনো মিল নেই। তবু দুটির ভেতরেই এক অদ্ভুত আবেগ কাজ করে। একটিতে রয়েছে জন্মভূমির টান, অন্যটিতে রয়েছে নতুন পৃথিবীকে জানার বিস্ময়। এই যাত্রাপথে আরেকটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। প্রতিবন্ধী, বয়স্ক কিংবা ছোট শিশুকে নিয়ে ভ্রমণকারী মানুষের জন্য প্রতিটি স্টেশনে রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। লিফট, চলন্ত সিঁড়ি, স্পষ্ট নির্দেশনা এবং হুইলচেয়ারের জন্য আলাদা স্থান। সবকিছুই এমনভাবে পরিকল্পিত যে একজন মানুষ সম্মানের সঙ্গে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। সভ্যতা শুধু উঁচু ভবন নির্মাণে নয়, মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্যেও প্রকাশ পায়।
Advertisement
ট্রেন থেকে নেমে যখন আবার শহরের আলো বাতাসে ফিরে এলাম; তখন মনে হলো কয়েক ঘণ্টার এই যাত্রায় যেন অনেক কিছু শিখে ফেলেছি। একটি শহরকে ভালোবাসতে হলে তার জাদুঘর কিংবা সুউচ্চ ভবন দেখাই যথেষ্ট নয়। তার প্রতিদিনের চলমান জীবনকে অনুভব করতে হয়। বাসের অপেক্ষায় দাঁড়ানো মানুষ, সাবওয়ের প্ল্যাটফর্ম, ট্রেনের জানালা, পথের গাছ, অপরিচিত মানুষের হাসি, সবকিছু মিলিয়েই একটি শহরের আত্মা গড়ে ওঠে। ভ্রমণ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার অনুভূতি শেষ হয় না। ঘরে ফিরে ছবিগুলো দেখা যায়, ভিডিওগুলো আবার চালানো যায়, কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলো জমা থাকে হৃদয়ের গভীরে।
স্কারবোরোর কেনেডি থেকে শুরু হওয়া সেই বাস, সাবওয়ে এবং রেলযাত্রা আমার কাছে শুধু একটি পরিবহন অভিজ্ঞতা নয় বরং ছিল টরন্টোকে কাছ থেকে জানার নীরব পাঠশালা। আজও সেই বিকেলের কথা মনে পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পরিচ্ছন্ন স্টেশন, ছন্দময় ট্রেন, সবুজে ঘেরা রাস্তা আর জানালার পাশে বসে থাকা ময়নার শান্ত মুখ। মনে হয়, জীবনের বড় বড় আনন্দ অনেক সময় দূরদেশের কোনো বিস্ময়কর স্থানে নয় বরং প্রিয় মানুষের পাশে বসে অচেনা শহরের জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। হয়তো এ কারণেই ভ্রমণ শুধু পথ অতিক্রম করার নাম নয়। ভ্রমণ হলো নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার আরেকটি সুযোগ। একটি শহরকে জানার পাশাপাশি নিজের ভেতরকার অনুভূতিগুলোকেও নতুন করে চিনে নেওয়ার একটি নীরব উপলক্ষ।
টরন্টোর ট্রাম, বাস এবং রেলের সেই সুশৃঙ্খল যাত্রা আমার কাছে তাই শুধু প্রবাসের একটি দিনের স্মৃতি নয় বরং জীবনের দীর্ঘ ভ্রমণপঞ্জিতে সংরক্ষিত উজ্জ্বল, শান্ত এবং গভীর আবেগের অধ্যায়।
এসইউ