ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, ইতিহাস আর অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত। সেই ইতিহাসে আর্জেন্টিনা এমন একটি নাম, যারা বারবার বিশ্বকাপকে নিজেদের গল্পে রাঙিয়েছে। আর গত দুই দশকে সেই গল্পের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র ছিলেন লিওনেল মেসি। কোটি ভক্তের কাছে তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি আশা, স্বপ্ন আর বিশ্বাসের প্রতীক। বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনার জার্সির সঙ্গে মেসির নাম যেন অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে।
Advertisement
২০০৬ সালে তরুণ প্রতিভা হিসেবে বিশ্বকাপে অভিষেক হয়েছিল মেসির। তখন থেকেই শুরু হয় অপেক্ষা-ডিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরি কি পারবেন আর্জেন্টিনাকে আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে? প্রতিটি বিশ্বকাপে সেই প্রশ্ন আরও বড় হয়েছে। প্রতিপক্ষ বদলেছে, দল বদলেছে, কোচ বদলেছে; কিন্তু বদলায়নি মেসির কাঁধে থাকা প্রত্যাশার পাহাড়।
আরও পড়ুন বিশ্বকাপে যে ফাইনাল ম্যাচগুলো আজও বিতর্কিত২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ ছিল সেই স্বপ্ন পূরণের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানোর গল্প। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন মেসি। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তার নেতৃত্ব, গোল এবং অ্যাসিস্ট আর্জেন্টিনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। কিন্তু ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটজের একমাত্র গোলে ভেঙে যায় কোটি মানুষের স্বপ্ন। ম্যাচ শেষে মাথা নিচু করে ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেসির সেই ছবি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। সেবার তিনি গোল্ডেন বল জিতেছিলেন, কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁতে পারেননি।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ছবি: এএফপি
Advertisement
এরপরও থেমে যাননি তিনি। জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন একসময়, আবার ভক্তদের ভালোবাসায় ফিরে এসেছেন। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে শিরোপার অপেক্ষার অবসান ঘটান। আর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে যেন নিজের ফুটবল জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় লিখে ফেলেন। অসাধারণ নেতৃত্ব, গুরুত্বপূর্ণ গোল এবং অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনাকে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই রোমাঞ্চকর ফাইনাল শুধু একটি ম্যাচ নয়, আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা নাটকীয় গল্প হয়ে আছে। অবশেষে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলে নিয়ে মেসি যেন নিজের অসম্পূর্ণ গল্পটিকে পূর্ণতা দেন।
আরও পড়ুন ব্রাজিলের খেলোয়াড়কে ঘুমের ওষুধ মেশানো পানি খাইয়েছিল আর্জেন্টিনা!কিন্তু ফুটবল কখনোই একই গল্প বারবার লেখে না। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সী মেসি আবারও আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এটিই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা দারুণ ছন্দে ছিল। কঠিন সব প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দল আবারও ফাইনালে পৌঁছে যায়। ভক্তদের বিশ্বাস ছিল, মেসি হয়তো দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে বিদায় নেবেন।
কিন্তু ফাইনালের মঞ্চ আবারও নির্মম হয়ে ওঠে। স্পেনের বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত হার মানে। পুরো দল লড়াই করলেও শেষ হাসি হাসতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা। ২০২২ সালে যিনি ট্রফি হাতে বিশ্বকে জয় করেছিলেন, চার বছর পর তাকেই দেখা গেল পরাজয়ের বেদনা নিয়ে মাঠ ছাড়তে। বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই এখানেই-এখানে কোনো কিংবদন্তির জন্য আলাদা নিয়ম নেই।
মেসি এমন একজন ফুটবলার, যিনি পাঁচটির বেশি বিশ্বকাপে খেলেছেন। ছবি: এএফপি
Advertisement
তবে একটি হার কখনোই মেসির বিশ্বকাপ-ঐতিহ্যকে ম্লান করতে পারে না। তিনি এমন একজন ফুটবলার, যিনি পাঁচটির বেশি বিশ্বকাপে খেলেছেন, অসংখ্য গোল করেছেন, নকআউট পর্বে দলকে বারবার উদ্ধার করেছেন এবং এক প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীদের বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতাই বদলে দিয়েছেন। তার জার্সি পরে লাখো শিশু ফুটবল খেলতে শুরু করেছে, তার উদযাপন অনুকরণ করেছে কোটি মানুষ।
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য মেসি শুধু একটি নাম নয়, একটি যুগ। তিনি দেখিয়েছেন, ব্যর্থতা শেষ নয়। ২০১৪ সালের অশ্রু পেরিয়ে ২০২২ সালের হাসি যেমন এসেছে, তেমনি ২০২৬ সালের ফাইনালের হারও তার উত্তরাধিকারকে ছোট করতে পারে না। কারণ একজন কিংবদন্তির পরিচয় শুধু কতগুলো ট্রফিতে নয়, তিনি কত কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, সেটিতেও নির্ধারিত হয়।
আরও পড়ুন মেসির যেসব রেকর্ড এখনো কেউ ভাঙতে পারেননিবিশ্বকাপের ইতিহাসে মেসির গল্প তাই সাফল্য ও আক্ষেপ দুইয়েরই গল্প। কখনো ট্রফি ছুঁতে না পারার বেদনা, কখনো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গৌরব, আবার কখনো শেষবারের মতো ফাইনালে উঠে শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার হতাশা। কিন্তু সবকিছুর শেষে একটি সত্য অটুট থাকে বিশ্বকাপের ইতিহাস লেখা হলে আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসির নাম একই অধ্যায়ে, একই আবেগে, একই শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হবে।
কেএসকে