মতামত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষ বাংলাদেশ গঠনে সরকারের নতুন অভিযাত্রা

বিশ্ব এখন এক নতুন প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন প্রথম শিল্পবিপ্লবের, বিদ্যুৎ দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের এবং ইন্টারনেট তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। আর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এটি আর কেবল কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি শাখা নয়; বরং অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় নিরাপত্তাসহ প্রায় প্রতিটি খাতের রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। যে দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে যত বেশি বিনিয়োগ করবে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সে দেশ তত এগিয়ে থাকবে।

Advertisement

এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই বাংলাদেশ সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সম্প্রতি সাভারের ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ল্যাব’ এবং ‘এআই প্রজেক্ট কম্পিটিশন-২০২৬’-এর উদ্বোধনকালে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে এবং গবেষণা-উদ্ভাবনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।” তাঁর মতে, এআই শুধু একটি প্রযুক্তি নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সরকারের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা, উদ্ভাবনী প্রকল্প, স্টার্টআপ উন্নয়ন, তৃণমূল পর্যায়ে প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, যা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

বিশ্ব অর্থনীতিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারস (PwC)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ১৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন করতে পারে। এর মধ্যে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রায় ৬ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন এবং নতুন পণ্য ও সেবার মাধ্যমে প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করে, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মক্ষেত্র কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে পরিবর্তিত হবে। ফলে ভবিষ্যতের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হবে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি কোনো একক খাতের প্রযুক্তি নয়; বরং বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেটের মতো একটি সাধারণ উদ্দেশ্যভিত্তিক প্রযুক্তি, যা অর্থনীতি ও সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিল্প, ব্যাংকিং, পরিবহন, বিচার, প্রশাসন, গণমাধ্যম, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।

Advertisement

সহজভাবে বলতে গেলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন একটি প্রযুক্তি, যা মানুষের মতো তথ্য বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। বিপুল পরিমাণ তথ্য, উন্নত অ্যালগরিদম এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ব্যবস্থার সমন্বয়ে এটি কাজ করে। বর্তমানে মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং, নিউরাল নেটওয়ার্ক এবং লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের মতো প্রযুক্তি এআইকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে এটি মানুষের ভাষা বুঝতে, ছবি বিশ্লেষণ করতে, সফটওয়্যার তৈরি করতে, গবেষণায় সহায়তা করতে এবং জটিল সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম হচ্ছে।

চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লড ও কোপাইলটের মতো প্রযুক্তি এখন আর কেবল প্রযুক্তিপ্রেমীদের কৌতূহলের বিষয় নয়; শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, গণমাধ্যম, গবেষণা ও সরকারি সেবার বাস্তব কর্মপরিবেশে এগুলোর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে, শিক্ষক পাঠদানে, প্রকৌশলী নকশা প্রণয়নে, ব্যাংকার ঝুঁকি বিশ্লেষণে এবং গবেষক তথ্য বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিচ্ছেন। তাই অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ একে ‘নতুন যুগের বিদ্যুৎ’ বলে অভিহিত করেন। যেমন বিদ্যুৎ একসময় শিল্প ও অর্থনীতির প্রতিটি খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তেমনি আগামী দিনের প্রায় প্রতিটি প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রেও থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি শুধু উৎপাদনশীলতা বাড়াবে না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও দ্রুত, তথ্যনির্ভর ও নির্ভুল করে তুলবে।

বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে বর্তমানে যে প্রতিযোগিতা চলছে, অনেক বিশ্লেষকের মতে তা একবিংশ শতাব্দীর নতুন প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা। একসময় প্রতিযোগিতা ছিল প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্প উৎপাদন কিংবা সামরিক শক্তিকে কেন্দ্র করে; এখন তা ক্রমেই স্থানান্তরিত হয়েছে তথ্য, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের প্রায় সব উদীয়মান অর্থনীতি এআইকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।

গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তৈরিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ওপেনএআই, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা, অ্যানথ্রপিক এবং এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক এআই প্রযুক্তির নেতৃত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে চীন ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শীর্ষ শক্তি হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিপুল বিনিয়োগ করছে এবং স্মার্ট সিটি, শিল্প স্বয়ংক্রিয়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বয়ংচালিত যানবাহনে ব্যাপকভাবে এআই ব্যবহার করছে। ভারত জাতীয় এআই মিশনের আওতায় কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বহুভাষিক প্রযুক্তি উন্নয়নে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে সিঙ্গাপুর সরকারি সেবা ও স্মার্ট সিটি ব্যবস্থাপনায় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রশাসনিক আধুনিকায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফল প্রয়োগ ঘটাচ্ছে।

Advertisement

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে বহু প্রচলিত চাকরির ধরন বদলে যাবে, তবে একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানেরও ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে যেসব দেশ বিনিয়োগ করবে, তারাই এই পরিবর্তনের সর্বাধিক সুফল ভোগ করবে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা আর বিলাসিতা নয়; বরং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অপরিহার্য শর্ত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি কোনো একক খাতের প্রযুক্তি নয়; বরং বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেটের মতো একটি সাধারণ উদ্দেশ্যভিত্তিক প্রযুক্তি, যা অর্থনীতি ও সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিল্প, ব্যাংকিং, পরিবহন, বিচার, প্রশাসন, গণমাধ্যম, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।

শিক্ষা খাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পাঠদান, স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়ন, গবেষণা সহায়তা এবং স্মার্ট ক্লাসরুম পরিচালনায় এআই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। স্বাস্থ্যসেবায় রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা, ওষুধ উদ্ভাবন ও টেলিমেডিসিনে এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। কৃষিতে স্যাটেলাইট চিত্র, ড্রোন ও সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে জমির অবস্থা বিশ্লেষণ, রোগবালাই শনাক্তকরণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং ফলন বৃদ্ধিতে এআই কার্যকর ভূমিকা রাখছে। শিল্প উৎপাদনে স্মার্ট ফ্যাক্টরি, রোবটনির্ভর উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়ও এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

একইভাবে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে জালিয়াতি শনাক্তকরণ, ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন, গ্রাহকসেবা, ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ বিশ্লেষণে এআই নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রশাসনিক সেবায় ভূমি ব্যবস্থাপনা, কর প্রশাসন, স্মার্ট ট্রাফিক, নাগরিক সেবা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এর ব্যবহার বাড়ছে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করছে না; রাষ্ট্রীয় সেবার দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও শক্তিশালী করছে।

বাংলাদেশেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। গত এক দশকে ডিজিটাল অবকাঠামো, মোবাইল ইন্টারনেট, ডিজিটাল আর্থিক সেবা, ই-গভর্ন্যান্স এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের যে ভিত্তি গড়ে উঠেছে, তার ওপর দাঁড়িয়ে সরকার এখন এআইভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে প্রতিষ্ঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ল্যাব দেশের গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইসিটি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক এআই গবেষণা ল্যাব গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।” বাস্তবিক অর্থেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প-উপযোগী প্রযুক্তি উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না করতে পারলে কোনো দেশ প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব অর্জন করতে পারে না।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এই গবেষণাগারে ২৫টি এনভিডিয়া ডিজি স্পার্ক কম্পিউটার এবং পাঁচটি আরটিএক্স-৩০৬০ ও আরটিএক্স-৪০৯০ জিপিইউসমৃদ্ধ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার স্থাপন করা হয়েছে। পাঁচজন পূর্ণকালীন গবেষক ইতোমধ্যে ‘এআই প্রফেসর’, ‘এআই প্রক্টর’ ও ‘এআই রেজিস্ট্রার’-এর মতো উদ্ভাবনী সমাধান তৈরি করেছেন এবং ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবিত ১৪৫টি এআই প্রকল্পের মধ্য থেকে সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোকে সরকারের স্টার্টআপ ফান্ড ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী।

সরকার তৃণমূল পর্যায়ে এআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রসারণ এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সুবিধা বিস্তারের উদ্যোগও নিয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীকেন্দ্রিক প্রযুক্তি উন্নয়নের পরিবর্তে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণরাও সমানভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে। এর ফলে ডিজিটাল বৈষম্য হ্রাস পাবে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে ওঠার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কও রয়েছে। কেউ মনে করেন এআই মানুষের কর্মসংস্থান কমিয়ে দেবে, আবার অন্যদের মতে এটি নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করবে। বাস্তবতা হলো, প্রতিটি শিল্পবিপ্লবের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও কিছু প্রচলিত পেশার অবসান ঘটালেও নতুন দক্ষতাভিত্তিক পেশার সৃষ্টি করবে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে ডেটা সায়েন্টিস্ট, এআই ইঞ্জিনিয়ার, মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, রোবটিক্স প্রকৌশলী এবং প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারের মতো পেশায় চাহিদা দ্রুত বাড়বে। অন্যদিকে পুনরাবৃত্তিমূলক ও নিয়মভিত্তিক অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে। ফলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে নতুন দক্ষতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের জন্য এটি একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও সুবর্ণ সুযোগ। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী তরুণ। এই বিপুল জনশক্তিকে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিগত দক্ষতায় গড়ে তুলতে পারলে তারা শুধু দেশীয় নয়, বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারের আগামী পাঁচ বছরে আইসিটি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও জরুরি। দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি, গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামোর অভাব, বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই উন্নয়ন, তথ্যের নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডিপফেক এবং এআইয়ের নৈতিক ব্যবহার—এসব বিষয়ে সময়োপযোগী নীতিমালা ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তির সুফলের পাশাপাশি নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একটি জাতীয় উন্নয়ন কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ক্রমে আধুনিক এআই গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা, গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা জোরদার, বিদ্যালয় পর্যায় থেকে কোডিং শিক্ষা, স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং সরকারি সেবায় এআইয়ের ব্যবহার সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও প্রযুক্তি সহযোগিতাও বাড়ানো জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানের প্রযুক্তি। যে দেশ এটি দ্রুত আয়ত্ত করবে এবং গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদে বিনিয়োগ বাড়াবে, সেই দেশই আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেবে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ সেই সম্ভাবনারই প্রতিফলন। এখন প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতিগত সমর্থন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং গবেষণাভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে এই অভিযাত্রাকে আরও গতিশীল করা।

সর্বোপরি বলতে হয়, এআই শুধু একটি প্রযুক্তি নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই উপলব্ধিকে সামনে রেখে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং তরুণ সমাজ সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকারী নয়, বরং উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও বিশ্বে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।

লেখকঃ অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্টMizan12bd@yahoo.com

এইচআর/এএসএম