মতামত

ঘড়ির কাঁটায় বন্দি জীবন: আমাদের অদৃশ্য সামাজিক সংকট

আজকের ব্যস্ত ঢাকায় পরিচিত কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, "কেমন আছেন?", তবে অবধারিতভাবে যে উত্তরটি পাবেন তা কিন্তু ক্রমশ টাকা-পয়সা বা আর্থিক টানাপোড়েনের বৃত্ত পেরিয়ে ভিন্ন এক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করবে। উত্তরটি মূলত ‘সময়’ নিয়ে—যাতায়াতের অন্তহীন ক্লান্তি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, গৃহস্থালির অবৈতনিক কাজ কিংবা সরকারি দপ্তরের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শেষে নিজের জন্য কতটা কম সময় অবশিষ্ট রইল, তা নিয়ে। বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে দারিদ্র্যকে কেবল আয়ের অঙ্কে পরিমাপ করে এসেছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS,2021) সর্বপ্রথম ‘সময় ব্যবহার সমীক্ষা’র (Time Use Survey) মাধ্যমে দেশীয় প্রেক্ষাপটে ‘ঘণ্টায় দারিদ্র্য’ বা সময়ের ঘাটতি পরিমাপ করা শুরু হয়েছে। এই সমীক্ষায় যে চিত্রটি উঠে এসেছে, তা আমাদের অনেকের পূর্বানুমানকেই সমর্থন করে: এ দেশের কোটি মানুষের জন্য পকেট ফাঁকা হওয়ার অনেক আগেই দিনের ২৪টি ঘণ্টা ফুরিয়ে যায়। আর সময়ের এই তীব্র ও নীরব অভাব আমাদের সামাজিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক বন্ধন এবং খোদ অর্থনীতিকেই এক অদৃশ্য চোরাবালির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

Advertisement

‘সময়ের দারিদ্র্য’ (Time Poverty) পরিভাষাটি প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। ১৯৭৭ সালে মার্কিন অর্থনীতিবিদ ক্লেয়ার ভিকেরি (Clair Vickery) ‘জার্নাল অফ হিউম্যান রিসোর্সেস’-এ প্রকাশিত তাঁর "দ্য টাইম-পুওর: এ নিউ লুক অ্যাট পভার্টি" (The Time-Poor: A New Look at Poverty) শীর্ষক যুগান্তকারী গবেষণাপত্রে এই তত্ত্বটি প্রথম উপস্থাপন করেন। ভিকেরি যুক্তি দিয়েছিলেন, কেবল আয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় দারিদ্র্যসীমা জীবনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে আড়াল করে। অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি একটি পরিবারের সুস্থ বেঁচে থাকার জন্য রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পারস্পরিক যত্ন নেওয়ার মতো অনানুষ্ঠানিক কাজের পেছনেও প্রচুর সময়ের প্রয়োজন হয়। একটি পরিবার আয়ের নিরিখে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও বাস্তবে তারা চরম নিঃস্ব হতে পারে, কারণ সেই আয়কে একটি সম্মানজনক জীবনে রূপান্তর করার মতো প্রয়োজনীয় সময় পরিবারের কারও হাতেই থাকে না। ভিকেরি দেখিয়েছেন, এই ফাঁদটি একক অভিভাবকদের সবচেয়ে বেশি বিপন্ন করে।

আজ প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরেও গবেষকরা তাঁর দেওয়া সেই মৌলিক সংজ্ঞাকেই ধারণ করছেন: সময়ের দারিদ্র্য হলো আসলে "ঐচ্ছিক" বা "অবসর" সময়ের তীব্র অভাব—অর্থাৎ, বেতনভুক্ত শ্রম, অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজ এবং ঘুম বা খাওয়ার মতো জীবনধারণের মৌলিক জৈবিক চাহিদা মেটানোর পর যে সময়টুকু অবশিষ্ট থাকে। এটি এমন এক সংকট, যা মানুষকে সুস্থ বিনোদন, বিশ্রাম, পরিবারকে সঙ্গ দেওয়া এবং একটি পরিপূর্ণ সামাজিক জীবন গড়ে তোলার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।

ভিকেরির এই তত্ত্বের সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ এখন পরিসংখ্যান দিয়েও প্রমাণ করা সম্ভব। ইউএন উইমেনের (UN Women) সহযোগিতায় আটটি বিভাগের ৮,০০০ পরিবারে পরিচালিত বিবিএস টাইম ইউজ সার্ভে (TUS) ২০২১-এ, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৭,০০০-এরও বেশি মানুষের দৈনিক সময়ের হিসাব নেওয়া হয়েছিল। ফলাফল দেখায়, আমাদের একই ২৪ ঘণ্টা লিঙ্গভেদে কতটা অসমভাবে বিভক্ত। পুরুষরা গড়ে প্রতিদিন কর্মসংস্থান এবং সংশ্লিষ্ট কাজে ৬.১ ঘণ্টা ব্যয় করেন, যেখানে নারীরা করেন মাত্র ১.২ ঘণ্টা—যা প্রায় পাঁচগুণ ব্যবধান। অথচ সমান্তরালে, নারীরা সম্মিলিতভাবে দৈনিক ৫.৮ ঘণ্টা অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজে ব্যয় করেন, যেখানে পুরুষরা ব্যয় করেন মাত্র ০.৮ ঘণ্টা—যা প্রায় সাত গুণ বেশি! আয়ের প্রচলিত সংজ্ঞায় হয়তো এদের কাউকেই দরিদ্র বলা যাবে না, কিন্তু যে নারীরা বেতনভুক্ত কাজের পাশাপাশি প্রতিদিন প্রায় ছয় ঘণ্টার অবৈতনিক কাজের বোঝা একাই বহন করছেন, কিংবা যে কর্মজীবীরা দিনের বড় অংশ ট্রাফিক জ্যাম আর আমলাতান্ত্রিক মন্থরতায় হারিয়ে ফেলছেন, তাদের কাছে দিনটাই এখন সবচেয়ে দুর্লভ সম্পদ।

Advertisement

একটি দেশের অগ্রগতি কেবল তার জিডিপি দিয়ে নয়, বরং তার নাগরিকরা তাদের সন্তানদের লালন-পালন করতে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নিতে, নিজেরা সুস্থ বিনোদন ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে এবং সামাজিক জীবনে অংশ নিতে কতটা 'সময়' পাচ্ছে—তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত। যতক্ষণ না আমাদের জাতীয় পরিকল্পনায় এই সময়ের হিসাবটি গুরুত্ব পাবে, ততক্ষণ আমাদের তথাকথিত উন্নয়ন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে—কাগজে-কলমে সমৃদ্ধ, কিন্তু বাস্তবে এক নিঃশেষিত ও ক্লান্ত সমাজ।

জরিপটির বিভাগ-ভিত্তিক উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কেন ঢাকার দিকে আমাদের বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। জাতীয়ভাবে, বেতনভুক্ত কাজে লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান ঢাকার বুকেই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। এখানকার পুরুষরা দৈনিক গড়ে ৬.৮৪ ঘণ্টা কর্মসংস্থানে ব্যয় করলেও নারীরা ব্যয় করেন মাত্র ১.৬৪ ঘণ্টা। এর ওপরে ঢাকার নারীদের ঘাড়ে চেপে থাকে প্রতিদিন ৪.৪৮ ঘণ্টা অবৈতনিক গৃহস্থালি এবং ১.৩৬ ঘণ্টা পরিবারের পরিচর্যার বাড়তি দায়িত্ব।

সম্ভবত আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ঢাকার মানুষ—নারী-পুরুষ নির্বিশেষে—অন্যান্য বিভাগের বাসিন্দাদের তুলনায় সামাজিকতা, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং ধর্মীয় অনুশীলনে সবচেয়ে কম সময় দেন। পুরো দিনে সব মিলিয়ে এই খাতে ব্যয় হয় মাত্র ১.৯১ ঘণ্টা, যেখানে ঢাকার বাইরে এই সময় গড়ে ২.০ থেকে ২.৬ ঘণ্টা। অন্য কথায়, যান্ত্রিক জীবনের জাঁতাকলে পড়ে ঢাকার বাসিন্দারা প্রথমেই সমাজ, প্রতিবেশি ও নাগরিক জীবনকে জীবন থেকে ছেঁটে ফেলেন।

এর প্রধান অনুঘটক ঢাকার চিরচেনা ট্রাফিক জ্যাম। রাজধানীতে যানবাহনের গড় গতি এক দশক আগের প্রায় ২১ কিলোমিটার থেকে কমে ঘণ্টায় ৫ থেকে ৭ কিলোমিটারে এসে ঠেকেছে—যা মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতির চেয়ে সামান্যই বেশি! ঢাকার যাত্রীরা প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় কর্মঘণ্টা স্রেফ পিচঢালা রাস্তায় অপচয় করছেন। গবেষকদের অনুমান, এর ফলে আমাদের এই মেগাসিটি প্রতিদিন প্রায় ৫০ লক্ষ কর্মঘণ্টা হারাচ্ছে, যার বার্ষিক প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতি শত শত কোটি ডলার। কিন্তু এই হারিয়ে যাওয়া সময়গুলো আসলে একেকটি পরিবার থেকে কেড়ে নেওয়া সময়—যা একজন পিতা বা মাতা তাঁর সন্তানের পাশে বসে কাটাতে পারতেন, বা বঞ্চিত হওয়া সেই জরুরি ঘুম, যা একজন শ্রমিক ভোরের শিফটে যাওয়ার আগেটুকুও পান না।

Advertisement

এর সাথে যোগ হয়েছে দীর্ঘ ও অনিয়ন্ত্রিত কর্মঘণ্টা। আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা পোশাক শ্রমিকরা প্রায়শই বায়ারদের রপ্তানি ডেডলাইন মেলানোর জন্য দীর্ঘ ওভারটাইম করতে বাধ্য হন, যেখানে নিজেদের কাজের সময়সূচির ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল জনগোষ্ঠী—রিকশাচালক, হকার কিংবা গৃহকর্মীদের তো কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টাই নেই; নেই কোনো ছুটি বা অসুস্থতার প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা। ডিজিটাল প্রযুক্তির অতিরিক্ত আগ্রাসন এই সংকটকে আরও জটিল করেছে—স্মার্টফোনের সার্বক্ষণিক টুংটাং শব্দ অফিস ও বাড়ির মধ্যকার সীমারেখাকে সম্পূর্ণ মুছে দিয়েছে। আর রয়েছে আমাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মন্থর গতি; একটি সনদ, জমির দলিল বা ব্যাংকের সাধারণ কাজের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট হওয়া যেন নিয়তি। এই পুরো চরম বাস্তবতাকে এক সুতোয় বেঁধেছে আমাদের দুর্বল নগর পরিকল্পনা, যা গণপরিবহনকে উপেক্ষা করে নির্মিত হয়েছে এবং কর্মক্ষেত্রের কাছাকাছি মানুষের আবাসন নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

সময়ের এই চড়া মূল্য সবাই সমানভাবে দেয় না। ‘টাইম ইউজ সার্ভে’র তথ্য এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখে না। বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৈবাহিক অবস্থা নির্বিশেষে—সময়ের এই অসম লড়াইয়ে নারীরাই অবৈতনিক কাজের সিংহভাগ বোঝা একাকী বহন করছেন। বিবিএসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ক্ষুরধার বাস্তবতা: খাবার তৈরি এবং ঘর পরিষ্কারের মতো ব্যক্তিগত গৃহস্থালি কাজে নারীরা পুরুষদের তুলনায় "সর্বোচ্চ প্রায় ৩৩ গুণ এবং সর্বনিম্ন ১৫ গুণ" বেশি সময় ব্যয় করেন!

বিবাহ এই ব্যবধানের পালে আরও হাওয়া দেয়; বিবাহিত নারীরা বিবাহিত পুরুষদের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি ঘরোয়া এবং পরিচর্যার বোঝা কাঁধে নেন। এবং আমাদের প্রচলিত ধারণার বিপরীতে গিয়ে সমীক্ষাটি দেখায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নারীদের এই প্রথাগত ধারা থেকে মুক্ত করতে পারেনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন নারীরা উচ্চশিক্ষিত নারীদের চেয়ে বেতনভুক্ত চাকরিতে প্রকৃতপক্ষে বেশি সক্রিয়, অথচ পুরুষদের অবৈতনিক কাজের পরিমাণ শিক্ষার স্তরভেদে প্রায় অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।

পোশাক খাতের নারী শ্রমিকরা এই ফাঁদের এক ভিন্ন রূপের মুখোমুখি। কারখানার দীর্ঘ শিফটের পর যখন তাঁরা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ঘরে ফেরেন, তখন সন্তানদের দেওয়ার মতো কোনো সময় তাঁদের হাতে থাকে না। ফলে এই শিশুদের শৈশব কাটে একাকীত্বে ও অভিভাবকহীন অরক্ষিত পরিবেশে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের বিশ্রাম নেওয়ার কোনো সুযোগই থাকে না, কারণ একদিন কাজ না করলে তাদের উনুনে হাঁড়ি চড়ে না। এমনকি শিক্ষার্থীরাও স্কুল, যানজট এবং অন্তহীন কোচিং ক্লাসের ঘূর্ণাবর্তে পড়ে শৈশবের সোনালী সময়টুকু রাস্তাতেই হারিয়ে ফেলছে। আর সবশেষে, পরিবারের যত্ন নেওয়ার মূল দায়িত্বটি যেহেতু অবধারিতভাবে নারীর ওপরই বর্তায়, তাই সবার চাহিদা মেটানোর পর তাঁর নিজের জন্য ২৪ ঘণ্টার ডায়েরিতে কোনো সময় অবশিষ্ট থাকে না।

সময়ের এই স্থায়ী অভাব কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া একজন নাগরিকের কাছ থেকে উৎপাদনশীলতা বা সৃজনশীল উদ্ভাবন আশা করা কঠিন। দীর্ঘস্থায়ী অতিরিক্ত কর্মচাপ শেষমেশ কর্মক্ষমতা হ্রাস, অপর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক অবসাদ এবং পারিবারিক কাঠামোর ধীর অবক্ষয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিবিএসের জরিপটি এই সুপ্ত সংকটের এক নীরব ইঙ্গিত দেয়। গ্রামীণ উত্তরদাতারা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, ১০-এর স্কেলে তাঁদের জীবন-সন্তুষ্টি স্কোর দিয়েছেন গড়ে মাত্র ৬.৩, যেখানে শহুরে উত্তরদাতাদের স্কোর ছিল ৬.৬–৬.৭। আর যারা বিধবা, বিবাহবিচ্ছেদপ্রাপ্ত বা বিচ্ছিন্ন, তারা সব গোষ্ঠীর মধ্যে সর্বনিম্ন সন্তুষ্টির (৫.৩–৫.৪) স্তরে রয়েছেন। উপাত্তই সাক্ষ্য দিচ্ছে, সময় এবং মানসিক সুস্থতা একই সুতোয় গাঁথা।

এর সামাজিক মূল্য পরিমাপ করা কঠিন হলেও তা সুদূরপ্রসারী। বাবা-মায়েরা যখন সন্তানদের নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার জন্য সময় পান না, তখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। পরিবারের বয়োবৃদ্ধরা অবহেলা ও একাকীত্বে ভোগেন। আমাদের নাগরিক জীবন—সামাজিক মেলামেশা, সুস্থ আড্ডা, এমনকি প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়ার মতো মানবিক বন্ধনগুলো আজ বিলুপ্তির পথে, কারণ একটি বিকেল বা সন্ধ্যা শান্তিতে কাটানোর অবসর কারও নেই। বই পড়া, বিনোদন কিংবা সুস্থ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যে ন্যূনতম মানসিক অবকাশ (Mental Space) প্রয়োজন, তা প্রতিদিনের যান্ত্রিক ব্যস্ততার কাছে প্রতিনিয়ত হেরে যাচ্ছে। যে সমাজে সময়ের স্থায়ী দুর্ভিক্ষ থাকে, সেই সমাজে শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক সহানুভূতি আর মানবিক মূল্যবোধেরই আকাল দেখা দেয়।

সময়ের এই পরম দরিদ্রতা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত কিছু পলিসি ইন্টারভেনশনের মাধ্যমে এই চাপ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব:

নগর পরিবহন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার: নির্ভরযোগ্য বাস সার্ভিস, সুপরিকল্পিত মেট্রো রেলের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং নিরাপদ ফুটপাথ ও সাইকেল লেন তৈরির মাধ্যমে নাগরিকদের যাতায়াতের সময় বাঁচানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

নমনীয় কর্মব্যবস্থার (Flexible Work) আইনি স্বীকৃতি: হাইব্রিড বা বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ এবং নমনীয় কাজের সময়সূচি চালু করা জরুরি, যাতে পরিবারের দায়িত্ব সামলে মানুষ নিজের সময়কে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে পারে।

সরকারি পরিষেবার সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন: জমির রেকর্ড, এনআইডি, বিভিন্ন সরকারি লাইসেন্স এবং কর দাখিলের মতো নাগরিক সেবাগুলোকে পুরোপুরি ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল প্ল্যাটর্মে নিয়ে আসতে হবে, যাতে সরকারি অফিসের লাইনে মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট না হয়।

বিকেন্দ্রীকরণ: শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানকে ঢাকার বাইরে জেলা শহরগুলোতে বিকেন্দ্রীকরণ করা গেলে বিপুল জনগোষ্ঠীর রাজধানীমুখী যাতায়াতের সময় এক ধাক্কায় কমে যাবে।

সাশ্রয়ী শিশুযত্ন কেন্দ্র (Daycare) স্থাপন: প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সাশ্রয়ী শিশুযত্ন কেন্দ্র গড়ে তুললে কর্মজীবী মায়েরা সন্তান সুরক্ষার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের জন্য কিছু ঐচ্ছিক সময় পুনরুদ্ধার করতে পারবেন।

নিয়মিত 'সময়-ব্যবহার সমীক্ষা': বিবিএসের প্রথম সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত বিরতিতে 'Time Use Survey' পরিচালনা করা উচিত, যাতে সময়ের ঘাটতির মাত্রা বুঝতে অনুমানের ওপর নির্ভর না করে সুনির্দিষ্ট ডেটাভিত্তিক পলিসি তৈরি করা যায়।

বাংলাদেশ তার গৌরবের উন্নয়নের আখ্যানটি সাজিয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান মাথাপিছু আয় এবং রপ্তানির জয়গান গেয়ে। নিঃসন্দেহে এই অর্জনগুলো প্রশংসনীয়। কিন্তু দেশের নিজস্ব 'সময় ব্যবহার সমীক্ষা' স্পষ্ট করে দেয় যে, শুধুমাত্র টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা প্রবৃদ্ধি আমাদের সামাজিক বিকাশের কত বড় শূন্যতাকে আড়াল করে। যেখানে লক্ষ লক্ষ নারী তাঁদের প্রথম কর্মদিবসের পাশাপাশি ঘরে আরও একটি অবৈতনিক কর্মদিবস পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন, এবং রাজধানী শহরটিতে দেশের অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে মানুষের একে অপরের জন্য সময় সবচেয়ে কম, সেখানে উন্নয়ন একপেশে হতে বাধ্য।

একটি দেশের অগ্রগতি কেবল তার জিডিপি দিয়ে নয়, বরং তার নাগরিকরা তাদের সন্তানদের লালন-পালন করতে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নিতে, নিজেরা সুস্থ বিনোদন ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে এবং সামাজিক জীবনে অংশ নিতে কতটা 'সময়' পাচ্ছে—তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত। যতক্ষণ না আমাদের জাতীয় পরিকল্পনায় এই সময়ের হিসাবটি গুরুত্ব পাবে, ততক্ষণ আমাদের তথাকথিত উন্নয়ন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে—কাগজে-কলমে সমৃদ্ধ, কিন্তু বাস্তবে এক নিঃশেষিত ও ক্লান্ত সমাজ।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।

এইচআর/এএসএম