ফিচার

বিশ্বকাপে আলোচনায় ‘শোম্যান’ আইশোস্পিড: কে এই তরুণ, কী তার পরিচয়?

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই মাঠে তারকাদের লড়াই। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠের বাইরে একজনের উপস্থিতি সমান আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি কোনো ফুটবলার নন, কোচ নন, এমনকি ক্রীড়া সাংবাদিকও নন। তবু স্টেডিয়ামে ঢুকলেই ক্যামেরা ঘুরে যায় তার দিকে। খেলোয়াড়রা ছবি তুলতে এগিয়ে আসেন, দর্শকরা নাম ধরে চিৎকার করেন, আর ফিফার প্রেসিডেন্টও তাকে পাশে বসিয়ে ম্যাচ উপভোগ করেন।

Advertisement

তিনি হলেন আইশোস্পিড (IShowSpeed)-যার আসল নাম ড্যারেন জেসন ওয়াটকিনস জুনিয়র। স্পিড নামটি এসেছে তার ডাক নাম স্পিডি থেকে। ছোটবেলা থেকেই সে তীব্র গতিতে দৌড়াতে পারতেন। এজন্য তার নাম দেওয়া হয় স্পিডি। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি ইউটিউবের গেমিং স্ট্রিমার থেকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ডিজিটাল তারকায় পরিণত হয়েছেন। আর বিশ্বকাপে তার উপস্থিতি যেন ফুটবলের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সোশ্যাল মিডিয়া সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন।

বিশ্বকাপে মাঠের বাইরে আইশোস্পিডের উপস্থিতি সমান আলোচনার জন্ম দিয়েছে

কে এই আইশোস্পিড?

২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের সিনসিনাটিতে জন্ম নেওয়া আইশোস্পিডের যাত্রা শুরু হয় খুব সাধারণভাবে। ২০১৬ সালে ইউটিউব চ্যানেল খুললেও প্রথম কয়েক বছর তেমন সাড়া পাননি। তখন নিয়মিত ভিডিও বানিয়েও দর্শক ছিল হাতে গোনা।

Advertisement

কিন্তু করোনা মহামারির সময় পরিস্থিতি বদলে যায়। বাসায় বসে গেমিং লাইভস্ট্রিম, মজার প্রতিক্রিয়া, অদ্ভুত চিৎকার, হঠাৎ নাচ কিংবা অনিয়ন্ত্রিত উচ্ছ্বাস এসবই তাকে রাতারাতি ভাইরাল করে তোলে। তার ভিডিওর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা। দর্শকরা কখনোই বুঝতে পারতেন না, পরের মুহূর্তে তিনি কী করতে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন লামিন ইয়ামালের ভাই কেইনের প্রিয় ৫ ফুটবলার, তালিকায় নেই মেসি রোনালদো তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা

আইশোস্পিডের পরিচয়ের সঙ্গে আরেকটি নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। রোনালদোর প্রতি তার ভালোবাসা এতটাই প্রবল যে ভিডিওতে প্রায়ই পর্তুগিজ মহাতারকার বিখ্যাত ‘সিউই’ উদযাপন করেন। রোনালদোর ম্যাচ দেখার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছুটে গেছেন। বহু বছর ধরে একবার রোনালদোর সঙ্গে দেখা করার স্বপ্ন দেখেছেন, আর সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার ভিডিও কোটি কোটি মানুষ দেখেছে। রোনালদোকে নিয়ে তার আবেগই তাকে ফুটবলপ্রেমীদের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে। অনেক তরুণ ভক্ত প্রথমে তাকে ইউটিউবার হিসেবে চিনলেও পরে ফুটবলের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে দেখতে শুরু করেন।

আইশোস্পিডর আসল নাম ড্যারেন জেসন ওয়াটকিনস জুনিয়র

বিশ্বকাপে কেন এত গুরুত্ব?

বিশ্বকাপ চলাকালে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ম্যাচে দেখা গেছে আইশোস্পিডকে। কখনো খেলোয়াড়দের সঙ্গে আড্ডা, কখনো সাবেক কিংবদন্তিদের সাক্ষাৎকার, কখনো দর্শকদের সঙ্গে উচ্ছ্বাস সব মিলিয়ে তিনি যেন বিশ্বকাপের অঘোষিত ডিজিটাল দূত। বিশেষ করে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ উপস্থিতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ইনফান্তিনো একাধিক ম্যাচে তাকে পাশে বসিয়ে খেলা দেখেছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং ফিফার ডিজিটাল প্রচারণার অংশ হিসেবেও তাকে দেখা গেছে।

Advertisement

এর পেছনে কারণও আছে। প্রচলিত টেলিভিশনের বাইরে এখন কোটি কোটি তরুণ ফুটবল অনুসরণ করেন ইউটিউব, টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে। আইশোস্পিডের কোটি কোটি অনুসারী সেই তরুণ দর্শকদের বড় একটি অংশ। ফলে তার মাধ্যমে বিশ্বকাপের প্রচার আরও বিস্তৃত হয়েছে।

আইশোস্পিডের ব্যতিক্রমী প্রতিক্রিয়া তাকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তোলে

কেন সব খেলোয়াড়-সেলিব্রিটির সঙ্গে দেখা যায় স্পিডকে?

লিওনেল মেসি থেকে কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, জুড বেলিংহাম, নেইমার কিংবা অসংখ্য সাবেক কিংবদন্তি-অনেকেই আইশোস্পিডের সঙ্গে দেখা করেছেন। কারণ, তিনি শুধু একজন কনটেন্ট নির্মাতা নন; তিনি এমন একজন ইনফ্লুয়েন্সার, যার একটি ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। বিশ্বের বড় বড় ক্লাব, ব্র্যান্ড এবং ক্রীড়া সংস্থাগুলোও বুঝে গেছে, নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে আইশোস্পিডের মতো নির্মাতাদের গুরুত্ব কতটা। তাই খেলোয়াড়রাও তার সঙ্গে ভিডিও করতে আগ্রহী হন। এতে তার জনপ্রিয়তা যেমন বাড়ে, তেমনি খেলোয়াড়দেরও নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।

আরও পড়ুন আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয় আজও কেন ‘বিতর্কিত’? পাগলাটে কাণ্ডেই স্পিড আলাদা পরিচিতি

আইশোস্পিডের জনপ্রিয়তার বড় কারণ তার অপ্রত্যাশিত আচরণ। কখনো জনসমক্ষে হঠাৎ ‘সিউই’ চিৎকার করে লাফিয়ে ওঠেন, কখনো ফুটবল নিয়ে রাস্তার মাঝখানে খেলতে শুরু করেন, আবার কখনো লাইভস্ট্রিমে নিজের প্রতিক্রিয়ায় দর্শকদের হাসিয়ে কাঁদিয়ে ছাড়েন। তার ভিডিওতে নাটকীয়তা থাকলেও সেটাই দর্শকদের কাছে বিনোদনের বড় উৎস। অনেক সময় সমালোচনার মুখেও পড়েছেন, তবে বিতর্কও তার জনপ্রিয়তা কমাতে পারেনি।

একঝাঁক তারকার সঙ্গে আইশোস্পিড

মানবিক কাজেও প্রশংসিত

শুধু বিনোদন নয়, বিভিন্ন সময় মানবিক কাজেও অংশ নিয়েছেন আইশোস্পিড। ভক্তদের সহায়তা করা, শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো, দাতব্য কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে সমর্থন দেওয়ার কারণে তিনি প্রশংসাও পেয়েছেন।বিভিন্ন দেশে সফরের সময় স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অভ্যাসও তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। অনেক সময় রাস্তায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে ফুটবল খেলেছেন, ছবি তুলেছেন কিংবা ছোট উপহার দিয়ে চমকে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন বাবা আলাদা, ইয়ামালের ভাই কেইন সম্পর্কে কতটা জানেন স্পিডের সংগ্রাম থেকে শীর্ষে ওঠা

আজ কোটি কোটি অনুসারী থাকলেও শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। একসময় খুব কম দর্শক নিয়ে নিয়মিত লাইভস্ট্রিম করতেন। পরিবার ও পড়াশোনার পাশাপাশি কনটেন্ট তৈরি চালিয়ে গেছেন। অনেকেই তাঁকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। প্রতিদিন নতুন কিছু করার চেষ্টা, নিরলস পরিশ্রম এবং নিজের স্বকীয়তা ধরে রাখার কারণেই ধীরে ধীরে সাফল্য এসেছে। বর্তমানে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও এক্স সব মিলিয়ে তার অনুসারীর সংখ্যা কয়েকশ মিলিয়নের কাছাকাছি। তার ভিডিও নিয়মিত কোটি কোটি ভিউ পায়।

টম ক্রুজ ও আমেরিকান র‍্যাপার সোয়ে লি সঙ্গে আইশোস্পিড 

ফুটবলের নতুন যুগের প্রতীক

একসময় বিশ্বকাপের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতেন শুধু খেলোয়াড়, কোচ বা ধারাভাষ্যকাররা। এখন সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন ডিজিটাল নির্মাতারাও। আইশোস্পিড তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছেন, আজকের ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের ম্যাচে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লাইভস্ট্রিম, ছোট ভিডিও এবং বৈশ্বিক অনলাইন সংস্কৃতিরও অংশ।

তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে আইশোস্পিডকে ঘিরে যে উন্মাদনা দেখা গেছে, তা শুধু একজন ইউটিউবারের জনপ্রিয়তা নয় এটি ফুটবল ও ডিজিটাল যুগের নতুন সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। মাঠে গোলের নায়ক যেমন দর্শকদের আনন্দ দেন, তেমনি মাঠের বাইরে আইশোস্পিড তার উচ্ছ্বাস, হাস্যরস আর সীমাহীন শক্তি দিয়ে বিশ্বকাপকে নতুন এক বিনোদনের মাত্রা যোগ করেছেন।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, থের্ডস

কেএসকে