১১ জুলাইয়ের সকালটি ছিল একদিকে বিদায়ের, অন্যদিকে নতুন এক যাত্রার সূচনা। কানাডার টরন্টো শহরের স্কারবরোতে কাটানো ছয়টি দিন আমাদের জীবনের স্মরণীয় সময়গুলোর একটি হয়ে থাকবে। আমার মামাতো শ্যালিকা জয়ন্তি দাস ও ভায়রা ভাই অরুন দত্ত যে আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দিয়ে আমাদের আপন করে রেখেছিলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও তারা আমাদের প্রতিটি মুহূর্তকে আনন্দ, গল্প, হাসি আর পারিবারিক উষ্ণতায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন। বিদায়ের ক্ষণটি তাই ছিল আবেগময়। মনে হচ্ছিল, একটি সুন্দর অধ্যায় শেষ করে আরেকটি নতুন অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে চলেছি।
Advertisement
সকাল ঠিক নয়টায় আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ক্লিফটন সিটির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রভাতী দাস এবং তার স্বামী দেবাশীষ দাস ৮ জুলাই টরন্টোতে এসে পৌঁছেছিলেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে ভার্জিনিয়ার ক্লিফটন সিটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। কর্মজীবনে দুজনেই অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রভাতী দাস একজন স্বনামধন্য কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং দেবাশীষ দাস একজন খ্যাতিমান সফটওয়্যার প্রকৌশলী। কঠোর পরিশ্রম, মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তারা আমেরিকায় নিজেদের একটি সম্মানজনক অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তাদের সুপরিকল্পিত জীবনযাপন, পরিশীলিত রুচি এবং নান্দনিক বিশাল বাসভবনের কথা আমার অজানা ছিল না। এর আগেও একবার সেখানে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। তবু প্রতিটি সফরেরই নিজস্ব আবেদন থাকে। তাই আবারও সেই পরিচিত ঠিকানায় ফিরে যাওয়ার অপেক্ষা আমার মনে অন্যরকম আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের জন্ম দিয়েছিল।
কালো রঙের মার্সিডিজ গাড়িটির স্টিয়ারিংয়ে ছিলেন দেবাশীষ। তার পাশের আসনে বসেছিলাম আমি। পেছনের আসনে ছিলেন নীলা মামনি, আমার শ্যালিকা প্রভাতী দাস এবং সহধর্মিণী প্রণতি দাস। সকালবেলার টরন্টো তখন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। দিনটি ছিল রবিবার এবং সরকারি ছুটির দিন। তাই স্বাভাবিকভাবেই ধারণা ছিল, সড়কে যানবাহনের চাপ তুলনামূলক কম থাকবে। শহরের সুউচ্চ অট্টালিকার সারি, পরিচ্ছন্ন সড়ক এবং আধুনিক নগরজীবনের শান্ত ছন্দ উপভোগ করতে করতেই আমরা এগিয়ে চলছিলাম।
আরও পড়ুন টরন্টোর সিএন টাওয়ারের চূড়ায় এক অবিস্মরণীয় সন্ধ্যাকিন্তু ডাউনটাউন এলাকা অতিক্রম করতেই সেই ধারণা মুহূর্তেই বদলে গেল। সামনে দেখা দিলো দীর্ঘ যানজট। সারি সারি গাড়ি অত্যন্ত ধীরগতিতে এগিয়ে চলছে। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, নেই অস্থিরতা বা হর্নের কর্কশ শব্দ। সবাই নিজ নিজ লেনে ধৈর্য ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে অপেক্ষা করছে। পরে অনুমান করা হলো, সরকারি ছুটির সুযোগে বিপুলসংখ্যক মানুষ নায়াগ্রা ও আশপাশের দর্শনীয় এলাকায় বেড়াতে বের হওয়ায় এই অস্বাভাবিক যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। উন্নত দেশের সড়ক ব্যবস্থায় এমন যানজটের মধ্যেও চালকদের শৃঙ্খলা, সহনশীলতা এবং নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়।
Advertisement
প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পথ অতিক্রম করে আমরা পৌঁছে গেলাম কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে। সীমান্ত পারাপারের আনুষ্ঠানিকতা ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে কয়েকটি সাধারণ প্রশ্নের পর দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেন। বেলা তখন প্রায় একটা। এরপর আবার শুরু হলো আমাদের দীর্ঘ সড়কযাত্রা। বাফেলো শহর পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তঃরাজ্য মহাসড়কে প্রবেশ করতেই প্রকৃতি যেন ধীরে ধীরে তার সৌন্দর্যের ভান্ডার মেলে ধরল। বহু লেনের প্রশস্ত মহাসড়ক যেন এক অদৃশ্য সুতোয় আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যকে যুক্ত করেছে। রাস্তার দুই পাশে ঘন সবুজ অরণ্য, ম্যাপল, ওক ও পাইন গাছের সারি, বনভূমির ফাঁকে ছোট ছোট খামারবাড়ি, ভুট্টাক্ষেত, সয়াবিনের মাঠ এবং পরিচর্যায় ঝকঝকে কৃষিজমি অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। পেনসিলভানিয়ায় প্রবেশের পর সবুজে মোড়ানো পাহাড়, পাহাড় কেটে তৈরি রাস্তা, দীর্ঘ ঢালু পথ এবং সুউচ্চ সেতুর নিচে বয়ে চলা নদীর দৃশ্য প্রকৃতি ও প্রকৌশলের অনন্য সমন্বয় হিসেবে আমাদের মুগ্ধ করে তুলেছিল।
মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছিল শান্ত নদী, ছোট ছোট হ্রদ আর সবুজ উপত্যকার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। নদীর জলে সারি সারি গাছের প্রতিবিম্ব যেন কোনো শিল্পীর আঁকা জলরঙের ছবিকে জীবন্ত করে তুলেছে। পথজুড়ে পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত ছো-বড় শহর, আধুনিক আবাসিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল, বিশ্রামকেন্দ্র ও সেবাসুবিধা দীর্ঘ সড়কযাত্রাকে করেছে স্বাচ্ছন্দ্যময়। পুরো পথজুড়ে মনে হচ্ছিল, এটি শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার ভ্রমণ নয় বরং উত্তর আমেরিকার প্রকৃতি, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও কর্মনিষ্ঠ জীবনের চলমান পাঠশালা।
আরও পড়ুন ট্রেনের জানালায় কানাডার টরন্টো শহরস্কারবরোর আপনজনদের ভালোবাসা পেছনে রেখে আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি ভার্জিনিয়ার ক্লিফটনের নতুন অভিজ্ঞতার দিকে। দীর্ঘ প্রায় নয় ঘণ্টার সড়কযাত্রা শেষে বিকেল গড়িয়ে আমরা পৌঁছালাম যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার শান্ত শহর ক্লিফটনে। পথের সমস্ত ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। চারদিকে ঘন সবুজ বন, ঢেউ খেলানো পাহাড়, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর নিস্তব্ধ প্রকৃতি আমাদের আন্তরিক অভ্যর্থনা জানাল। মূল মহাসড়ক ছেড়ে ব্যক্তিগত সড়ক ধরে কিছুদূর এগোতেই চোখে পড়ল দেবাশীষ দাস ও ডা. প্রভাতী দাসের নান্দনিক বাসভবন। প্রায় পাঁচ একর সবুজে ঘেরা এই আবাসটি যেন পরিশ্রম, সাফল্য, সৌন্দর্যবোধ ও প্রকৃতিপ্রেমের অপূর্ব প্রতীক। বিস্তীর্ণ লন, পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ এবং প্রকৃতির সঙ্গে স্থাপত্যের সুষম মেলবন্ধন মুহূর্তেই মনকে মুগ্ধ করে দিলো।
বাড়ির সামনের লনে পা রাখতেই চোখে পড়ল নানা রঙের ফুলের মনোমুগ্ধকর সমারোহ। গোলাপ, লিলি, হাইড্রেনজিয়া, ল্যাভেন্ডার, টিউলিপসহ মৌসুমি ফুল, জাপানি ম্যাপল, চিরসবুজ স্প্রুস এবং বিভিন্ন অলংকারিক গাছ পুরো পরিবেশকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য। তবে সবচেয়ে বিস্মিত করেছে বাড়ির সমৃদ্ধ পারিবারিক সবজি বাগান। মিষ্টি কুমড়া, লাউ, জুকিনি, করলা, শিম, ডাঁটা, শসা, ঢ্যাঁড়শ, বেগুন, মরিচ, চেরি টমেটো, বড় টমেটো, কচু, পুঁইশাক, বিন, বরবটি, কলমিশাক ও পাটশাকসহ অসংখ্য দেশীয় সবজি সযত্নে চাষ করা হয়েছে। কোথাও মাচাভর্তি লাউ, কোথাও দুলছে করলার লতা, কোথাও পাকা টমেটোর লাল আভা। মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল, যেন বাংলাদেশের কোনো গ্রামের উঠোনেই ফিরে এসেছি। পাশেই আপেল, নাশপাতি, পিচ, ডুমুর, পার্সিমন, ব্লুবেরি, রাস্পবেরি ও আঙুর ফলের গাছ প্রকৃতিপ্রেমের আরেকটি সুন্দর নিদর্শন। আর বাড়ির ভেতরে প্রশস্ত কক্ষ, উঁচু ছাদ, রুচিসম্মত আসবাব, নির্বাচিত শিল্পকর্ম, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও নিখুঁত পরিচ্ছন্নতা মিলিয়ে প্রতিটি কোণেই ফুটে উঠেছে পরিবারের সৌন্দর্যবোধ, পরিশ্রম এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের অনন্য পরিচয়।
Advertisement
এই বাড়ির আরেকটি আকর্ষণ তিনটি আদরের পোষ্য। ছোট্ট কুকুর জুনু কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনজনের মতো আমাদের সঙ্গে মিশে গেল, আর দুটি বিড়াল চাবি ও অরি কখনো জানালার ধারে, কখনো বাগানে, আবার কখনো আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। প্রাণীদের প্রতি পরিবারের স্নেহ ও মমত্ববোধ পুরো পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। ভার্জিনিয়ার বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে বাড়িটির বিশেষ সুনাম রয়েছে। শুধু বিশাল আয়তনের জন্য নয় বরং পরিকল্পিত পরিবেশ, কৃষিপ্রেম, পরিচ্ছন্নতা, অতিথিপরায়ণতা, সাংস্কৃতিমনা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের জন্যও এটি সুপরিচিত। আধুনিক আমেরিকান জীবনধারা ও বাঙালি সংস্কৃতির অনন্য সমন্বয়, আর বিদেশের মাটিতে থেকেও শেকড়কে ভালোবাসার যে দৃষ্টান্ত এই পরিবার গড়ে তুলেছে, তা সত্যিই অনুকরণীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক।
আরও পড়ুন টরন্টোর রোজেটা ম্যাকক্লেইন গার্ডেনে প্রশান্তির বিকেলসন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ক্লিফটনের পাহাড়ঘেরা প্রকৃতি যেন নতুন রূপে সেজে উঠল। পশ্চিম আকাশের লাল আভা, দূরের বনভূমি থেকে ভেসে আসা পাখির ডাক এবং চারপাশের নীরবতা মনকে গভীর প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিলো। রাতের খাবারের টেবিলে জমে উঠল পারিবারিক আড্ডা, স্মৃতিচারণ, হাসি ও প্রবাসজীবনের নানা গল্প। রাত ঠিক নয়টায় সবাই মিলে উপভোগ করলাম আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের টানটান উত্তেজনাপূর্ণ বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ। খেলার রোমাঞ্চ ও পারিবারিক মিলনের উষ্ণতা মিলেমিশে রাতটিকে স্মরণীয় করে রাখল।
দিনের শেষে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মনে হলো, মানুষ দেশ ও পরিবেশ বদলালেও ভালোবাসা, আত্মীয়তার বন্ধন ও শেকড়ের টান কখনো বদলায় না। ক্লিফটনের সবুজ নীরবতার মাঝে উপলব্ধি করলাম, প্রকৃত সমৃদ্ধি শুধু প্রাচুর্যে নয় বরং ভালোবাসায় গড়া পরিবার, পরিশ্রমে অর্জিত সাফল্য, প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ এবং নিজের সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে বেঁচে থাকার মধ্যেই নিহিত। তাই ক্লিফটনের সবুজ ঠিকানাটি আমার কাছে শুধু একটি বাড়ি নয়, প্রবাসে বাঙালিয়ানার উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে থাকবে।
এসইউ