ফিচার

লিপস্টিক পরীক্ষার মডেল হতেন টাক মাথার পুরুষ

নারীদের প্রসাধনী সামগ্রীর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে লিপস্টিক। নারীদের লিপস্টিক ব্যবহারের প্রচলন কিন্তু নতুন নয়, বহু পুরোনো। আচ্ছা সেই গল্প না হয় আরেকদিন করব। আজ বলব লিপস্টিপ নিয়ে মজার এক ইতিহাস।

Advertisement

কয়েকদিন ধরে ফেসবুকে একটি ছবি বেশ ভাইরাল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে একজন নারী একজন পুরুষের টাকে চুমু খাচ্ছেন একের পর এক। আসলে এর পেছনের গল্প কী? চলুন একটু ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যাক-

অনেকের কাছে বিষয়টি নিছক রসিকতা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার মতো কোনো গল্প বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসাধনী শিল্পে নতুন লিপস্টিকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে সত্যিই টাক মাথার পুরুষদের ব্যবহার করা হয়েছিল। তাদের মসৃণ মাথায় লিপস্টিকের দাগ রেখে গবেষকরা রঙের স্থায়িত্ব, ছড়িয়ে পড়ার ধরন এবং পণ্যের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করতেন।

টাক মাথার পুরুষদের মাথায় সেখানে লিপস্টিকের দাগ পরিষ্কারভাবে দেখা যেত। ছবি ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

Advertisement

এই অদ্ভুত পরীক্ষার ছবিগুলো তোলেন মার্কিন আলোকচিত্রী ইয়েল জোয়েল, যিনি সে সময় লাইফ ম্যাগাজিনের জন্য কাজ করতেন। তার তোলা ছবিগুলো পরবর্তীসময়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক আর্কাইভ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং আজও সেগুলো অতীতের সবচেয়ে অদ্ভুত গবেষণা পদ্ধতিগুলোর একটি হিসেবে আলোচিত।

কিন্তু কেন টাকমাথার পুরুষ?

১৯৫০-এর দশক ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী ভোক্তাবাজারের দ্রুত বিকাশের সময়। নতুন নতুন প্রসাধনী বাজারে আসছিল, আর নির্মাতারা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পণ্যের গুণগত মান উন্নত করার চেষ্টা করছিলেন। লিপস্টিকের ক্ষেত্রে শুধু রং আকর্ষণীয় হলেই চলত না। গবেষকদের জানার দরকার ছিল- লিপিস্টিকের রং কতটা স্পষ্ট থাকে, সহজে ছড়িয়ে যায় কি না, কতক্ষণ স্থায়ী হয়, ত্বকে কেমন দাগ ফেলে এবং সহজে মুছে যায় কি না।

এসব মূল্যায়নের জন্য একটি মসৃণ, সমতল ত্বক প্রয়োজন ছিল। টাকমাথার পুরুষদের মাথার ত্বক চুলমুক্ত হওয়ায় সেখানে লিপস্টিকের দাগ পরিষ্কারভাবে দেখা যেত। ফলে গবেষকরা সহজে বিভিন্ন ফর্মুলার পার্থক্য তুলনা করতে পারতেন। পরীক্ষার সময় নারী স্বেচ্ছাসেবী বা মডেলরা নতুন তৈরি লিপস্টিক পরে ওই ব্যক্তিদের মাথা বা মুখে চুমু দিতেন। এরপর গবেষকরা দাগের আকৃতি, রঙের ঘনত্ব এবং স্থায়িত্ব পর্যবেক্ষণ করতেন। এটি ছিল মূলত একটি বাস্তব ব্যবহারভিত্তিক পরীক্ষা।

আরও পড়ুন বিশ্বকাপ জিতে দেশে ফিরে টমেটো উপহার পেলেন রুইজ-গাভি, কিন্তু কেন? সব কোম্পানি কিন্তু এমন পরীক্ষা করত না

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়, যেন সে সময় সব প্রসাধনী কোম্পানিই নিয়মিত টাকমাথার পুরুষ নিয়োগ করত। ইতিহাস কিন্তু তা বলে না। গবেষণা থেকে জানা যায়, এটি ছিল কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত একটি বিশেষ পরীক্ষামূলক পদ্ধতি। শিল্পের সর্বজনীন বা বাধ্যতামূলক কোনো মানদণ্ড ছিল না।

Advertisement

সে সময় লিপস্টিক পরীক্ষার আরও নানা উপায় ছিল। যেমন-স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ব্যবহার করে ফলাফল পর্যবেক্ষণ, কাপড় বা কাগজে দাগ পরীক্ষা, কাচ বা অন্যান্য মসৃণ পৃষ্ঠে রঙের স্থায়িত্ব দেখা এবং বিভিন্ন ত্বকের ধরনে ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন। অর্থাৎ টাকমাথার ওপর লিপস্টিক পরীক্ষা ছিল অনেকগুলোর মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী পদ্ধতি, যা মূলত ছবির কারণে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে।

পরীক্ষার সময় নারী স্বেচ্ছাসেবীরা নতুন তৈরি লিপস্টিক পরে ওই ব্যক্তিদের মাথা বা মুখে চুমু দিতেন। ছবি ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

ইয়েল জোয়েলের ছবিই ইতিহাসের সাক্ষী

এই পরীক্ষার সবচেয়ে পরিচিত আলোকচিত্রগুলোর কৃতিত্ব যায় লাইফ ম্যাগাজিনের আলোকচিত্রী ইয়েল জোয়েলের কাছে। তিনি ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরি করতেন।

লিপস্টিক পরীক্ষার সেই ছবিগুলো প্রকাশের পর পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তীসময়ে ডিজিটাল যুগে ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ভাইরাল হয়। অনেকেই এগুলোকে সম্পাদিত বা কৃত্রিম ছবি ভেবেছিলেন। কিন্তু পরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক আর্কাইভ ও লাইফ ম্যাগাজিনের সংগ্রহ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, ছবিগুলো বাস্তব ঘটনারই দলিল।

আরও পড়ুন আটার বস্তা থেকে পোশাক, মহামন্দায় যেভাবে বদলে যায় ফ্যাশন এখন কীভাবে পরীক্ষা হয়?

বর্তমান প্রসাধনী গবেষণা ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রিত। আজকের প্রসাধনী কোম্পানিগুলো সাধারণত ব্যবহার করে ডার্মাটোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা, কৃত্রিম ত্বক বা বিশেষ পরীক্ষামূলক উপাদান, উচ্চ-রেজোলিউশনের ডিজিটাল ইমেজ বিশ্লেষণ, ল্যাবভিত্তিক স্থায়িত্ব ও রাসায়নিক পরীক্ষা এবং ভোক্তা প্যানেলের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন। অনেক দেশে প্রসাধনী পরীক্ষায় কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও ভোক্তার স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নারীদের প্রসাধনী সামগ্রীর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে লিপস্টিক। ছবি ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

প্রসাধনী শিল্পের ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়

টাক মাথার পুরুষদের দিয়ে লিপস্টিক পরীক্ষা আজকের চোখে নিঃসন্দেহে অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে সে সময় এটি ছিল প্রসাধনী গবেষণার একটি বাস্তব ও ব্যবহারিক পরীক্ষামূলক পদ্ধতি। গবেষকরা এমন একটি সমতল ত্বক খুঁজছিলেন, যেখানে লিপস্টিকের দাগ স্পষ্টভাবে দেখা যাবে এবং বিভিন্ন ফর্মুলার তুলনা করা সহজ হবে।

এ ঘটনাটি একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান ও পণ্য উন্নয়নের ইতিহাসে এমন অনেক পরীক্ষার নজির রয়েছে, যেগুলো বর্তমান সময়ে অস্বাভাবিক মনে হলেও তখনকার প্রযুক্তি ও গবেষণার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ইয়েল জোয়েলের ক্যামেরায় বন্দি সেই মুহূর্তগুলো তাই শুধু কৌতূহলের বিষয় নয়, বরং প্রসাধনী শিল্পের বিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, মিডিয়াম

আরও পড়ুন বেলা ২টা থেকে ৫টা স্পেনের দোকান-অফিস কেন বন্ধ থাকে জানেন

কেএসকে