মক্কার সেই নির্জন, ধূসর ও তপ্ত মরুপ্রান্তর; প্রখর রৌদ্রের আকাশ আর দিগন্ত বিস্তৃত বালুকা ছাড়া যেখানে ছিল না কোনো জনমানব, না ছিল একফোঁটা পানি বা খাবারের অস্তিত্ব। এমন এক প্রতিকূল পরিবেশে শিশু সন্তান ইসমাইল, সামান্য কিছু খেজুর ও পানিসহ হজরত হাজেরাকে (আ.) রেখে যখন নবী ইবরাহিম (আ.) ফিরে যাচ্ছিলেন, স্ত্রী হাজেরা (আ.) পেছন থেকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ইবরাহিম! এই নির্জন উপত্যকায়, যেখানে কোনো মানুষ বা প্রাণের সাড়াশব্দ নেই, আমাদের রেখে আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ ইবরাহিম (আ.) কোনো উত্তর না দিয়ে এগোতে থাকলেন। হজরত হাজেরা (আ.) অনুধাবন করলেন এটি তার একক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আল্লাহ কি আপনাকে এই আদেশ দিয়েছেন?’ ইবরাহিম (আ.) উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ।’ এ কথা শোনামাত্রই হাজেরা (আ.) কোনো দ্বিধা বা দুশ্চিন্তা ছাড়া অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না।’
Advertisement
ইবরাহিম (আ.) চোখের আড়ালে গিয়ে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেছিলেন, যেন এই নির্জন মরুভূমিতে তাঁর পরিবারকে আল্লাহ হেফাজত করেন এবং মানুষের হৃদয়কে তাদের প্রতি অনুরাগী করে দেন। অন্যদিকে প্রখর রোদে পানি শুকিয়ে যায়, খাবারও ফুরিয়ে আসে। তৃষ্ণায় ছটফট করতে থাকা শিশু ইসমাইলের কান্না দেখে মা হাজেরা (আ.) স্থির থাকতে পারেননি। একটু পানির আশায় তিনি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে আকুল হয়ে বারবার দৌড়াদৌড়ি করেন।
সন্তানের প্রতি মাতৃস্নেহের এই চরম আকুলতাকে আল্লাহ তাআলা এতটাই কবুল করেছিলেন যে, পরবর্তীতে কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য হজ-ওমরাহর আমল হিসেবে 'সাঈ' করাকে ওয়াজিব করে দেন।
এক পর্যায়ে অলৌকিকভাবে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা জিবরাইলের (আ.) ডানার আঘাতে বা শিশু ইসমাইলের পায়ের স্পর্শে মুরুর বুক চিরে বেরিয়ে আসে পবিত্র পানির ধারা। হাজেরা (আ.) অতি আনন্দে পানি ধরে রাখার জন্য চারপাশে বাঁধ দিতে দিতে বললেন, ‘জমজম’ (অর্থাৎ থামো/জমা হও)। এই জমজম কূপই হাজার বছর ধরে কোটি কোটি তৃষ্ণার্ত মানুষকে তৃপ্ত করে আসছে।
Advertisement
কিছুদিন পর জমজম কূপের সন্ধান পেয়ে মরুভূমির যাযাবর জুরহুম গোত্র মক্কায় বসবাসের অনুমতি চায় হাজেরার (আ.) কাছে। তিনি তাদের বসবাসের অনুমতি দেন। ফলে জনমানবহীন মরু প্রান্তর এক প্রাণবন্ত জনপদে রূপ নেয়।
এই গোত্রের মানুষের সঙ্গে ইসমাইল (আ.) বেড়ে ওঠেন। তাদের কাছেই তিনি আরবি ভাষা শেখেন।
কোরবানির পরীক্ষা ও শয়তানের পরাভবহাজেরার (আ.) জীবনের দ্বিতীয় চরম পরীক্ষা আসে যখন ইসমাইল (আ.) কৈশোরে পদার্পণ করেন। ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে দেখেন, তিনি তার প্রিয় ছেলে ইসমাইলকে কোরবানি করছেন। তিনি এটাকে আল্লাহ তাআলার নির্দেশ ধরে নেন। তিনি যখন পুত্রকে নিয়ে কোরবানি করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, তখন শয়তান এক বৃদ্ধের বেশে হজরত হাজেরার (আ.) কাছে এসে মাতৃত্বের সংবেদনশীল জায়গায় আঘাত হানার অপচেষ্টা চালায়।
শয়তান বলে, ‘তুমি কি জানো ইবরাহিম তোমার ছেলেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? সে তাকে জবাই করতে নিয়ে যাচ্ছে!’ হাজেরা (আ.) প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে করলেও শয়তান যখন বলে, ‘ইবরাহিম দাবি করছে এটি তার রবের নির্দেশ,’ তখন হাজেরা (আ.) জবাব দেন, ‘যদি এটি তাঁর রবের আদেশ হয়ে থাকে, তবে তিনি সঠিক কাজ করছেন এবং রবের আদেশের সামনে আমাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে।’
Advertisement
এভাবে শয়তানের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়ে তিনি আল্লাহর নির্দেশের ওপর পূর্ণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
হজরত হাজেরার (আ.) পাশাপাশি ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইলও (আ.) আল্লাহ তাআলার নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আল্লাহ তাআলা জান্নাতি দুম্বা পাঠান, ইসমাইলের (আ.) বদলে দুম্বা কোরবানি করা হয়। (সুরা আস-সাফফাত: ১০৩-১০৭)
হযরত হাজেরা (আ.) একজন নবীর স্ত্রী, আরেকজন নবীর মা, তিনি নিজেও অনন্য ধৈর্য ও অটল ইমানের কারণে আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মুসলমানের জন্য আদর্শ বানিয়েছেন। তার অনুসরণে আমাদের সাঈ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের তার মতো ধৈর্য ও ইমানের অধিকারী হওয়ার তওফিক দান করুন!
ওএফএফ