ভ্রমণ

রাঙ্গামাটি জাদুঘরে যা দেখবেন, মনে হবে পাহাড়ি জীবনের প্রতিচ্ছবি

ফাত্তাহ তানভীর রানা

Advertisement

যত দূরে দৃষ্টি যায় পাহাড় আর পাহাড়। সবুজে ঘেরা পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মানুষের ঘর। পাহাড়ের কোলে মানুষ গড়েছে বসতি, পেতেছে সংসার। এই বসতি আদি আমল থেকেই। সেখানে বসবাস করছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। বাংলাদেশের প্রধান জনগোষ্ঠীর বাইরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বসবাসরত জাতিগোষ্ঠীগুলোকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা হয়। তারা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় বাস করেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। এই ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে হলে রাঙ্গামাটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করার বিকল্প নেই।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের আসামবস্তি এলাকার ভেদভেদী নামক স্থানে সেনাবাহিনীর ক্যান্টেনমেন্ট পাশ্ববর্তী সাড়ে ৩ একর জায়গাজুড়ে পাহাড়ি টিলার ওপর অবস্থিত। রাঙ্গামাটি ভ্রমণের সময় পার্বত্য অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা ও ইতিহাস সম্পর্কে জানতে এটি চমৎকার একটি সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইনস্টিটিউটের প্রথম ফটকে প্রবেশ করলে দর্শনার্থীদের স্ব-সংস্কৃতিতে স্বাগত জানান একদল তরুণ। যা শুধু পাহাড়ি নয়, বাঙালি সংস্কৃতিরও অংশ বটে। রাঙ্গামাটি শহরের কেন্দ্রস্থল বা প্রবেশমুখ থেকে রিকশা, অটোরিকশা বা স্থানীয় পরিবহনে সহজেই এখানকার ভেদভেদী এলাকায় পৌঁছানো যায়।

আরও পড়ুন প্রজাদের পেটানো হতো জুতা দিয়ে, ২০০ বছরের পুরোনো কুঠিবাড়ি ধ্বংসের মুখে

রাঙ্গামাটি জাদুঘর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী ও সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা। বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বর্ণাঢ্য ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশ সাধন করে দেশের জাতীয় সংস্কৃতির মূল স্রোতধারার সাথে সম্পৃক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাঙ্গামাটি জাদুঘর পাহাড়ি যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। এই জাদুঘরে পাহাড়ি জনজীবন ও সংস্কৃতির বিভিন্ন জিনিসপত্র দেখতে পাওয়া যায়। জাদুঘরে পাহাড়ি তাঁত, পাহাড়ি হুক্কা, পাহাড়ি অস্ত্র, পাহাড়ি বংশী ও বাদ্যযন্ত্র, পাহাড়ি পোশাক, পাহাড়ি আদি পোশাক, পাহাড়ি হস্তলিপি, পাহাড়ি সাপের চামড়া, পাহাড়ি মাথাল, পাহাড়ি ব্যাগ, পাহাড়ি অলংকার, পাহাড়ি শাড়ি, পাহাড়ি নাকের নথ, গলার মালা, বর্ম, পুতুল, পাহাড়ি ঝুড়ি, বিভিন্ন সময়ের পাহাড়ি ছবি, পাহাড়ি পানির পাত্রসহ দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র সংরক্ষিত আছে। বিভিন্ন সংগ্রহ ও গবেষণা জাদুঘরকে অনন্য রূপ দিয়েছে।

Advertisement

১৯৭৮ সালে রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৮১ সালে ইনস্টিটিউটটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৯৩ সালে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটটি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বতন্ত্র সংস্থা হিসেবে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করে ইনস্টিটিউটটিকে প্রধান কার্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। ২০১০ সালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ পাস হলে ইনস্টিটিউট একটি সংবিধিবদ্ধ স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। এরপর ইনস্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট রাঙ্গামাটি রাখা হয়। বর্তমানে এটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত দপ্তর হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন ঘুরে আসুন সামরাজ ঘাটের মাছের রাজ্য থেকে

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট কমপ্লেক্সে একটি দোতলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন আছে। আরও একটি তিনতলা বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন জাদুঘর ভবন আছে। এ ছাড়াও ট্রেনিং সেন্টার, আর্টিস্ট হোস্টেল ভবন এবং ২৫০ আসন বিশিষ্ট একটি অডিটরিয়াম আছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে সাধারণ সংগীত, উপজাতীয় সংগীত, তাঁত বুনন, পোশাক তৈরি প্রশিক্ষণ, নাট্য, নৃত্য, চিত্রাঙ্কন, কবিতা আবৃত্তি ও প্রমিত উচ্চারণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা শিক্ষা কোর্স, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর দুষ্প্রাপ্য সামগ্রী ও প্রত্নবস্তু সংগ্রহ করে প্রদর্শন করা হয়। বেশ কিছু প্রকাশনাও দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে। সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের তৃতীয় তলায় লাইব্রেরি আছে। সেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি বিষয়ক বই ও বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন বই পাওয়া যায়। লাইব্রেরিতে বসে বইপড়ার সুযোগ আছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ও জাদুঘর বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় ভাষা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণও এর লক্ষ্য। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করার মাধ্যমে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির বিকাশ ও তুলে ধরার নিরন্তর প্রচেষ্টা সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ও জাদুঘরকে অনন্য রূপ দিয়েছে।

লেখক: গল্পকার ও সংগঠক।

Advertisement

এসইউ