ভ্রমণ

আন্তর্জাতিক ট্রেইল রানে বাংলাদেশের নোশিনের স্বপ্নজয়

সমতল থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের বহু হাজার ফুট উঁচুতে, যেখানে বাতাসের প্রতিটি নিঃশ্বাসে অক্সিজেনের তীব্র অভাব, পদে পদে খাড়া পাহাড়ি ভাঙা পথ আর ভারসাম্য হারানোর ভয়; সেই পথগুলোকেই নিজের খেলার মঞ্চ বানিয়ে নিয়েছেন বাংলাদেশের নারী ম্যারাথনার নোশিন শারমিলি। সাধারণ রোড রান দিয়ে শুরু করলেও এখন তাকে সবচেয়ে বেশি টানে পাহাড়ের অ্যাডভেঞ্চার ও কঠিন ট্রেইল রান। আন্তর্জাতিক ট্রেইল ও হাই অল্টিটিউড দৌড়ে একের পর এক সাফল্য অর্জন করে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা ওড়াচ্ছেন এই অদম্য দৌড়বিদ।

Advertisement

সমতল থেকে পাহাড়ি ট্রেইলে যাত্রা শুরু

২০২৩ সালে ম্যারাথনের জগতে পা রাখেন নোশিন শারমিলি। শুরুতে নিজের সহনশীলতার পরিচয় দিলেও দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, সমতলের পাকা রাস্তার চেয়ে পাহাড়ের সরু আর আঁকাবাঁকা ট্রেইলই তার আসল ভালোবাসার জায়গা। ফলে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেন ট্রেইল ও মাউন্টেন রানিংয়ের কঠিন অনুশীলনে।

আরও পড়ুন সীতাকুণ্ডের কমলদহ ট্রেইলে একদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নোশিনের অর্জন

গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ট্রেইল ম্যারাথনে নোশিন শারমিলির পদচারণা ও অর্জন অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তার উল্লেখযোগ্য রানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

লাদাখ ম্যারাথন (২০২৪)

ভারতের লাদাখে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১,১৫০ ফুট উঁচুতে অত্যন্ত বিরূপ আবহাওয়ায় ৪২.১৯৫ কিলোমিটারের পূর্ণ ম্যারাথন সফলভাবে সম্পন্ন করেন।

Advertisement

বুদ্ধ ট্রেইল (২০২৪)

ভারতের দার্জিলিংয়ে অনুষ্ঠিত এই হিল রেসে ৩০ কিলোমিটার দৌড়ে নারী বিভাগে ১৩তম স্থান অর্জন করেন। প্রতিযোগিতাটিতে বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণকারী একমাত্র নারী ছিলেন তিনিই।

অ্যামেজিং থাইল্যান্ড ম্যারাথন (২০২৫)

নোশিন শারমিলি ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে হাফ ম্যারাথন সাফল্যের সঙ্গে শেষ করেন।

ইউটিএমবি হোকা চিয়াং মাই (২০২৫)

ব্যাংকক ম্যারাথনের পরপরই চিয়াং মাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়া মেজর ‘Hmong 50’ ট্রেইল রেসে অংশ নেন। প্রায় ৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ট্র্যাকের মোট এলিভেশন (উচ্চতা বৃদ্ধি) ছিল ২,৫০০ মিটারেরও বেশি। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এই কঠিনতম ফিনিশার মেডেল জয়ের অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করেন নোশিন।

মঞ্জুশ্রী ট্রেইল রেস (২০২৬)

নেপালের কঠিন পাহাড়ি পথে ৫০ কিলোমিটারের এই চ্যালেঞ্জিং কোর্সটি সফলভাবে শেষ করে আন্তর্জাতিক ট্রেইলে নিজের ধারাবাহিক সাফল্যের খাতা আরও সমৃদ্ধ করেন।

Advertisement

আরও পড়ুন সমুদ্রসৈকতে অন্যরকম গ্ল্যাম্পিংয়ের গল্প প্রতিটি পদক্ষেপেই চ্যালেঞ্জ

পাহাড়ে দৌড়ানোর অভিজ্ঞতা মোটেও সহজ নয়। উচ্চতাজনিত কারণে তীব্র শ্বাসকষ্ট, অসমতল পাথরঘেরা রাস্তা এবং প্রতি মুহূর্তে ভারসাম্য ধরে রাখার মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠতে হয়। পাহাড়ি রান সম্পর্কে নোশিন বলেন, ‘উচ্চতায় অক্সিজেনের স্বল্পতা, অসমতল ট্র্যাক এবং প্রতিটি পদক্ষেপে ভারসাম্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ, সব মিলিয়ে পাহাড়ে দৌড়ানো অনেক কঠিন। তবে অ্যাডভেঞ্চারের অনুভূতি আর পাহাড়ের পরিবেশই আমাকে বারবার সেখানে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।’

লক্ষ্য এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ

ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে নোশিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ট্রেইল ও মাউন্টেন রানিংকেই তিনি নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে এগিয়ে নিতে চান। বর্তমানে তার মূল দৃষ্টি বিশ্ব ট্রেইল রানিংয়ের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ ‘ইউটিএমবি ওয়ার্ল্ড সিরিজ ফাইনালস’ (বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ)।

আরও পড়ুন এভারেস্ট বিজয়ী বাংলাদেশি নিম্নির পতাকা প্রত্যার্পণ

এই স্বপ্নের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হলে নির্দিষ্ট কিছু কোয়ালিফাইং রেস শেষ করতে হয়, যা তিনি এরই মধ্যে সফলভাবে করে চলেছেন। লটারিতে সুযোগ পেলে নেবেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। আর যদি এ বছর সুযোগ না-ও মেলে; তবু দমে যাওয়ার পাত্রী নন তিনি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্রেইল রানিং মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না করা পর্যন্ত ছুটে চলাই এ অদম্য কন্যার একমাত্র লক্ষ্য।

এসইউ