কৃষি ও প্রকৃতি

প্রকৃতি সংরক্ষণে নৈতিক দায়িত্ব সবার

প্রকৃতি সংরক্ষণ হলো আল্লাহ প্রদত্ত স্বাভাবিক ও নৈসর্গীক বস্তু সংরক্ষণ। প্রতিটি মানুষ নিজ ও পরিবারের উন্নয়নের জন্য দিন-রাত আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকেন। উন্নয়নের যত উপাদান-উপকরণ যেমন- জীবগত, মানবগত, আলো, পানি, বাতাস, গাছ-পালা, পাহাড়, তরুলতা সবই প্রকৃতির দান। অবারিত ফসলের মাঠ আর বৈচিত্র্যময় বনাঞ্চল, বৃক্ষের সজিবতা, সবুজ-শ্যামলে পূর্ণ আমাদের বাংলাদেশ। এ রকম প্রকৃতি পরিবেশের নিবিড় বন্ধনেই গড়ে ওঠে মানব সভ্যতা। গাছ-পালা, ফল-মূল, পাখির মিষ্টি সুরের গান, আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টি, মাঠভরা সোনালি ফসল, পাহাড়, আলো-বাতাসসহ আল্লাহর সৃষ্টি সবই প্রাকৃতিক সম্পদ। গাছ-পালা, বন-জঙ্গল, তরুলতা, উদ্ভিদ মানুষের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এগুলো ছাড়া মানুষের জীবন কল্পনাও করা যায় না। প্রাণিকূল অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না আর এই অক্সিজেনের পুরোটাই আসে গাছ-পালা থেকে।

Advertisement

দিনদিন মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন হচ্ছে, সেই সাথে বাড়ছে নানামুখী চাহিদা। শিল্প কলকারখানা নির্মাণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, উঁচু উঁচু দালান-কোঠা ক্রমবর্ধমান নগরায়ন আমাদের সবুজ প্রকৃতিকে প্রায় অম্লান করে দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক মনে হলেও আগ্রাসনের কারণে বনাঞ্চলের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি এদেশের পরিবেশকে ভারসাম্যহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বনাঞ্চল কমে আসার কারণে হারিয়ে ফেলছি অনেক জাতের পাখি ও প্রাণি। এতে করে প্রকৃতি সংরক্ষণের উপাদান ও গুণাগুণ নষ্ট হয়ে মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। তাই গাছ-পালা, পশু-পাখি, বন-জঙ্গল, পাহাড়-মাটি, পানি, আলো-বাতাসসহ সকল প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমিত ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

একটু খেয়াল করলেই আমরা দেখতে পাই, প্রতি বছরই নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে নানা রকম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাদের। ঝড়, বৃষ্টি, অগ্নিউৎপাত ও বন্যার শিকার হচ্ছি আমরা। যার ফলে পরিবেশে নেমে আসছে বিপর্যয়। এসব বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের কিছুটা রক্ষা করতে পারে বনভূমি কিন্তু দিনের পর দিন আমরা নির্বিচারে তাও নষ্ট করে ফেলছি। যা আমাদের জন্য ভয়ংকর বার্তা বয়ে আনতে পারে। বর্তমানে লক্ষ্য করা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বন্যায় কবলিত। যা প্রকৃতির ওপর অত্যাচার, অবিচার ও যথাযথভাবে সংরক্ষণ বা ব্যবস্থা না নেওয়ার ফল।

আরও পড়ুন মাটির স্বাস্থ্যরক্ষা ও মাটি পরীক্ষা কেন জরুরি?

সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত স্বাভাবিক ও নৈসর্গিক বস্তুকে সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। প্রকৃতির অনুকূল পরিবেশ মানুষের জীবন ও অস্তিত্বের পক্ষে সহায়ক। নির্মল বাতাস, বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত খাদ্য সুস্থ ও সুন্দর ভাবে মানুষকে বাঁচাতে সহায়তা করে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে ও মানুষের লাগামহীন দূষণমূলক কর্মের ফলে প্রতিনিয়তই ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি। যেই পরিবেশ মানুষকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে নিজের সবটুকু দিয়ে লালন পালন করছে এই সমাজের মানুষকে, অন্যদিকে সেই নির্মম মানুষগুলোই নির্বিচারে ধ্বংস করছে প্রকৃতি। যার ফলে প্রকৃতি দিন দিন ভয়ানক রূপ ধারণ করছে। বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে লাগামহীন ভাবে। ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে পৃথিবীর আবহাওয়া।

Advertisement

শুধু তাই নয়, পরিবেশ দূষণের ফলে জলজ প্রাণীদের জলে থাকতে কষ্ট হয়। কারণ তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন পায় না। উদ্ভিদরা সতেজ থাকতে পারছে না। বন-জঙ্গল অবাধে উজাড় হচ্ছে। ফলে বাসস্থান সংকটে পড়ছে বন্যপ্রাণীসমূহ। আর পরিমণ্ডলের এই সমস্ত কিছু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ। আর এইভাবে চললে প্রাণিজগৎ একদিন প্রায় শেষের পথে চলে যাবে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন। তাই সর্বস্তরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার সচেতনা বৃদ্ধির লক্ষেই বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস পালন করা হয়ে থাকে সব দেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে।

প্রকৃতি সংরক্ষণ বিপর্যয়ের প্রভাবে অনেক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, দাবানল, সুনামি, বন্যা, খরা প্রভৃতির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বেড়েই চলেছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। যে কারণে তলিয়ে যাচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো। এমনকি বাংলাদেশের উপকূলের ১৭ শতাংশ ভূমি চলে যাবে সমুদ্রগর্ভে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে বাড়ছে লবণাক্ততা ও বাড়ছে বন্যা। মাটির গভীরে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় দেখা দিচ্ছে সুপেয় পানির সংকট। ঋতু বৈচিত্র্যের ওপর পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে মারাত্মক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে সাম্প্রতিক কালে। একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রোধ করার জন্য প্রয়োজন মোট ভূমির শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশে মোট ভূমির মাত্র প্রায় ১৬ ভাগ বনভূমি আছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

আরও পড়ুন পরিবেশের বন্ধু লজ্জাবতী বানর হারিয়ে যাচ্ছে

তবে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৯ ভাগ এবং ওয়ার্ল্ড রিচার্স ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী ৫ ভাগ। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ৩.৫ ভাগ। যার ফলে পরিবেশে দেখা দিয়েছে বিরূপ প্রভাব। সময়মতো বৃষ্টি নেই, রোদ নেই। চলছে ঘূর্ণিঝড় বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বর্তমান জ্বালানি পরিবর্তন করে বাতাস, সৌর ও পানি বিদ্যুতের মতো পুনর্ব্যবহার যোগ্য জ্বালানির প্রচলন করতে হবে। শিল্প কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ পরিশোধের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে হবে। কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক সারের ব্যবহার কমাতে হবে। পরিবেশ দূষণ রোধের কাজকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দান করতে হবে।

প্রকৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব কেবল সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো সংস্থার নয়। এ দায়িত্ব প্রতিটি ব্যক্তির বা প্রতিটি নাগরিকের। কেননা প্রকৃতি আমাদের আশ্রয়দাতা, আমাদের অক্সিজেনের উৎস। তাই সময় থাকতেই আসুন সবাই নিজে সচেতন হই, অপরকে সচেতন করি, প্রকৃতিকে রক্ষা করি। সবাই একসাথে আওয়াজ তুলি, ‘প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করুন’। অন্তত এটা মনে রাখুন যে, আমরাই প্রকৃতি আর প্রকৃতির মাঝেই আমাদের বসবাস। তাই প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসে এটাই হোক সবার প্রত্যয়।

Advertisement

এসইউ