অনেক পুরোনো বাংলা উপন্যাস বা সিনেমায় একটা চিত্র খুব সাধারণ ছিল তা হচ্ছে একজন বিধবার ক্যারেক্টার। যে চরিত্র ফুটিয়ে তুলতো একজন রংহীন, স্বামীহারা, সমাজের সব ধরনের আনন্দ উৎসব থেকে দূরে থাকা এক নারীকে। যার কোনো সাজসজ্জা থাকতে নেই, নেই মাথার চুল, পরনে সাদা থান শাড়ি, যার রান্না হয় আলাদা চুলায়, শুধু সাদা ভাত আর সঙ্গে কোনো সবজি। নিশ্চয়ই আপনার কল্পনায় ধরা দিচ্ছে এমন কোনো নারীর মুখ। যে মুখখানা মলিন, চোখ উদাসীন।
Advertisement
একসময় স্বামীর মৃত্যুর পর একজন নারীর জীবন যেন সেখানেই থেমে যেত। রঙিন পোশাক, গয়না, হাসি সবকিছুর ওপর নেমে আসত অলিখিত নিষেধাজ্ঞা। নতুন করে সংসার করার কথা ভাবাও ছিল প্রায় অপরাধ। এর আগে তো ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল। স্বামীর চিতায় স্ত্রীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিং ‘সতীদাহ নিবারণ আইন’ পাসের মাধ্যমে এই প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করেন।
কিন্তু মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলেও বিধবা নারীদের জীবনে তেমন পরিবর্তন হয়নি। যে সময়ের কথা বলছি, সেসময় খুব অল্প বয়সে নারীদের বিয়ে হতো। তাও অনেক বেশি বয়সের পুরুষের সঙ্গে। যারা অসুখে কিংবা বার্ধক্যের কারণে মারা যেতেন। কিন্তু সেই অল্প বয়সী মেয়েরা জীবন কাটাতেন রংহীন এক পৃথিবীতে।
আরও পড়ুন ‘হাম লেকর রহেঙ্গে আজাদি’ স্লোগান, আজাদির ডাক নাকি প্রতিবাদ?একসময় ভারতীয় সমাজে একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি ছিল বিধবা হওয়া। স্বামীর মৃত্যুর পর শুধু সংসারের আশ্রয়ই হারাতে হতো না, হারাতে হতো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং নতুন করে জীবন শুরু করার অধিকারও। অল্প বয়সে স্বামী হারানো হাজার হাজার নারীকে বাকি জীবন কাটাতে হতো কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের মধ্যে। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১৭০ বছর আগে সেই অন্ধকার বাস্তবতায় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। ১৮৫৬ সালের হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন (হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন, ১৮৫৬) ভারতীয় সমাজে এক নতুন যুগের সূচনা করে। আর এই পরিবর্তনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন সমাজসংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
Advertisement
ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারত, বিশেষ করে বাংলায়, বাল্যবিবাহ ছিল অত্যন্ত প্রচলিত। অনেক মেয়ের বিয়ে হতো মাত্র ৮ থেকে ১২ বছর বয়সে। স্বামী মারা গেলে সেই শিশুকন্যাকেই সমাজ বিধবা হিসেবে চিহ্নিত করত। বিধবাদের জন্য জীবন ছিল কঠোর নিয়মে বাঁধা। সাদা পোশাক পরা, অলংকার ত্যাগ, নিরামিষ ও সীমিত খাবার খাওয়া, উৎসব-অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকা এসব ছিল দৈনন্দিন বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের ভেতরেও তারা অবহেলা ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতেন। নতুন করে বিয়ে করার সুযোগ তো দূরের কথা, এমন চিন্তাও সমাজে ছিল প্রায় নিষিদ্ধ। যদিও ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হয়েছিল, তবু বিধবাদের সামাজিক অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।
আরও পড়ুন জুলাই বাঙালিকে যেসব স্মৃতি মনে করায় বিদ্যাসাগরের সংগ্রামঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুধু শিক্ষাবিদই ছিলেন না, ছিলেন অসাধারণ মানবতাবাদী। সমাজের এই নির্মম চিত্র তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম কখনো মানুষের কষ্টকে স্থায়ী করার নির্দেশ দেয় না। বিধবা বিবাহের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে তিনি সংস্কৃত শাস্ত্র গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। বিরোধীদের অন্যতম যুক্তি ছিল হিন্দু ধর্মে বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ। বিদ্যাসাগর সেই দাবি খণ্ডন করতে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ, বিশেষ করে পরাশর স্মৃতিসহ একাধিক শাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি তুলে ধরেন এবং দেখান, বিশেষ পরিস্থিতিতে বিধবা পুনর্বিবাহের অনুমতি রয়েছে।
১৮৫৫ সালে তিনি বিধবা বিবাহের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে হাজারো মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন জানান। অন্যদিকে রক্ষণশীল সমাজও এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে পাল্টা আবেদন করে। ফলে বিষয়টি নিয়ে তীব্র সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়।
লর্ড ক্যানিং ও ১৮৫৬ সালের আইন১৮৫৬ সালে ভারতের গভর্নর-জেনারেল হন লর্ড ক্যানিং। তার প্রশাসনের সময়েই দীর্ঘ বিতর্ক ও আলোচনার পর ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন (১৮৫৬ সালের আইন ১৫) কার্যকর হয়। এই আইনের মাধ্যমে হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহ আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ সমাজের বিরোধিতা থাকলেও আইনের চোখে বিধবা নারীর নতুন করে সংসার করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও ছিল। পুনর্বিবাহ করলে স্বামীর পরিবারের উত্তরাধিকার সম্পত্তির অধিকারের ওপর বিধবার দাবি আর বহাল থাকত না। তা সত্ত্বেও সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় এই আইন ছিল যুগান্তকারী।
Advertisement
আইন পাস হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বিদ্যাসাগর নিজ উদ্যোগে কলকাতায় প্রথম আইনসম্মত হিন্দু বিধবা বিবাহের আয়োজন করেন। ১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর কালীমতী দেবীর সঙ্গে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের বিয়ে সম্পন্ন হয়। এই বিয়েকে কেন্দ্র করে কলকাতায় ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। রক্ষণশীল গোষ্ঠী নানা হুমকি দেয়, প্রতিবাদ মিছিল করে, এমনকি বিদ্যাসাগরকে ব্যক্তিগতভাবেও অপমান করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তিনি পিছু হটেননি। নিজের অর্থ ব্যয় করে পরবর্তী সময়েও বহু বিধবা বিবাহ সম্পন্ন করতে সহায়তা করেন।
সমাজ কি সহজে মেনে নিয়েছিল?একেবারেই না। আইন হওয়ার পরও বহু বছর পর্যন্ত অধিকাংশ পরিবার বিধবা বিবাহ মেনে নিতে চায়নি। সামাজিক বয়কট, কুসংস্কার এবং ধর্মীয় ভয় মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে ছিল। অনেকেই মনে করতেন, বিধবা বিবাহ সমাজ ও ধর্মের বিরুদ্ধে। ফলে আইন থাকলেও এর বাস্তব প্রয়োগ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। তবে শিক্ষার প্রসার, সমাজসংস্কার আন্দোলন এবং ব্রাহ্ম সমাজসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের উদ্যোগে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
আরও পড়ুন বাঙালির ভোজনবিলাস: একালের খাবারে নেই সেকালের স্বাদ ভারতীয় সমাজে এই আইনের গুরুত্ববিধবা পুনর্বিবাহ আইন শুধু একটি আইনি পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে নারীশিক্ষা, বাল্যবিবাহ রোধ এবং নারীর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে নতুন চিন্তার ভিত্তি তৈরি করে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দেখিয়ে দিয়েছিলেন, সমাজের প্রচলিত অন্যায়কে পরিবর্তন করতে হলে শুধু আবেগ নয়, যুক্তি, শিক্ষা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। তার সংগ্রাম প্রমাণ করে, একজন মানুষের দৃঢ় অবস্থানও ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
১৭০ বছর পরও কেন প্রাসঙ্গিক?আজ আইনগতভাবে বিধবা বিবাহ সামাজিকভাবে স্বীকৃত। তবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো বিধবা নারীরা বৈষম্য, কুসংস্কার এবং সামাজিক বঞ্চনার মুখোমুখি হন। তাই ১৮৫৬ সালের সেই আইন শুধু অতীতের ইতিহাস নয়; এটি সমতা, মানবাধিকার এবং নারীর স্বাধীনতার প্রতীক।
১৭০ বছর আগে যে সাহসী উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তা আজও মনে করিয়ে দেয় একটি সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন নারী-পুরুষ উভয়ের সমান মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়। আর সেই ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
কেএসকে