সারা পৃথিবীতেই আলেম-ওলামা, পীর-দরবেশসহ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের টুপি পরতে দেখা যায়। অনেকে সব সময় টুপি না পরলেও নামাজের সময় টুপি পরেন। অনেকে টুপি পরাকে ইবাদত মনে করেন, সওয়াবের কাজ মনে করেন। কিন্তু ইসলামে টুপি পরা কি আসলেই ইবাদত? কোরআনে বা নবীজির (সা.) কোনো হাদিসে কি টুপি পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?
Advertisement
সম্প্রতি এ রকম প্রশ্ন করা হয় দেশের সুপরিচিত আলেম ও ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহকে। তিনি বলেন, মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) টুপি পরেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামও টুপি পরতেন। আলেমসমাজ এটিকে অভ্যাসগত সুন্নত হিসেবে অভিহিত করেন, এটি ইবাদতগত সুন্নত নয়। শরীয়তে সুন্নত দুই প্রকার; একটি হলো অভ্যাসগত সুন্নত, আর অপরটি হলো ইবাদতগত সুন্নত। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) টুপি পরতেন, যা ছিল তাঁর অভ্যাসগত সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত, ইবাদতগত সুন্নত নয়।
মূলত আরবের তৎকালীন সংস্কৃতি ও পোশাকের রীতিতে টুপি পরার প্রচলন ছিল যা মহানবী (সা.) বহাল রেখেছেন। কোনো সংস্কৃতিকে যদি ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ না করে বহাল রাখা হয় এবং সেটি যদি বিশেষ কোনো ইবাদত হিসেবে সাব্যস্ত না হয়, তবে তা অভ্যাসগত সুন্নত হিসেবে গণ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ, নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লাউ খেতে পছন্দ করতেন। এটি তাঁর অভ্যাসগত সুন্নত, ইবাদতগত সুন্নত নয়। তবে কেউ যদি কেবল রাসুলুল্লাহর (সা.) পছন্দের খাবার হিসেবে ভালোবেসে লাউ খায়, তবে নবীজির প্রতি সেই মহব্বতের কারণে সে অবশ্যই আল্লাহর কাছে সওয়াব ও প্রতিদান লাভ করবে।
একইভাবে, টুপি পরাের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা বা নির্দেশ দেননি এবং এর জন্য আলাদা কোনো বিশেষ ফজিলতের কথাও বর্ণনা করেননি। কেবল তিনি নিজে পরেছেন—এই ধারণায় যদি কেউ তাঁর সুগভীর ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে টুপি পরে, তবে সে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর কাছে সওয়াব ও প্রতিদানের আশা করতে পারে।
Advertisement
তা ছাড়া বর্তমানে টুপি গোটা বিশ্বে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান সামাজিক প্রথা, নিদর্শন বা ‘শিয়ার’-এ পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, টুপি পরিহিত কাউকে দেখলেই সহজে চেনা যায় যে তিনি একজন মুসলমান। ঠিক যেমন মা-বোনদের হিজাব বা নেকাব দেখলে বোঝা যায় তিনি একজন মুসলিম নারী। কোনো বিষয় যখন কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচিতি, প্রতীক বা পোশাকী নিদর্শনে রূপান্তরিত হয়, তখন স্বভাবতই সেটির একটি পৃথক গুরুত্ব ও তাৎপর্য তৈরি হয়।
সুতরাং টুপি পরা কোনো ফরজ বা ওয়াজিব বিধান নয়, এমনকি এটিকে সরাসরি ইবাদতগত সুন্নতও বলা যায় না। কেউ যদি সারা জীবনে কখনো টুপি না-ও পরে, তবে আখেরাতে আল্লাহর কাছে এজন্য তাকে কোনো জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে না। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ভালোবাসা থেকে কেউ যদি এই অভ্যাসগত সুন্নতের অনুসরণ করে, তবে সে অবশ্যই আল্লাহর দরবারে প্রতিদান পাওয়ার যোগ্য হবে। আর বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি বা প্রতীক হিসেবেও টুপির নিজস্ব একটা মর্যাদা ও তাৎপর্য রয়েছে।
তবে টুপি না পরার কারণে আল্লাহর কাছে কোনো ধরনের শাস্তি বা কৈফিয়তের বিধান না থাকায় কোনো ভাই যদি টুপি না পরেন তবে তার প্রতি কোনো প্রকার কুধারণা বা কটূ মন্তব্য করার সামান্যতম সুযোগ শরিয়তে নেই। কারণ শরিয়ত এটি পরা বাধ্যতামূলক করেনি, এমনকি ইবাদতের অংশ হিসেবেও নির্ধারণ করেনি। ফলে কেউ এটি না পরলে তাকে নিয়ে অহেতুক সমালোচনা বা মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
আবার অন্যদিকে, যেহেতু এটি বর্তমানে ইসলামের ধর্মীয় নিদর্শনে পরিণত হয়েছে, সেহেতু এটাকে অবজ্ঞা, অসম্মান বা অশ্রদ্ধা করাও অত্যন্ত জঘন্য কাজ।
Advertisement
ওএফএফ