একাধারে অর্থ, জনবল আর অবকাঠামোগত সংকটে ভেঙে পড়েছে দেশের মানসিক চিকিৎসায় বিশেষায়িত একমাত্র প্রতিষ্ঠান ‘পাবনা মানসিক হাসপাতাল’র চিকিৎসাসেবা। হাসপাতালটিতে বিশেষায়িত ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে আধুনিক চিকিৎসার ছোঁয়া পাননি এখানকার রোগীরা। নেই প্রয়োজনীয় বিভিন্ন থেরাপি বা পুনর্বাসনমূলক চিকিৎসার ব্যবস্থা। চাইলেও নানা সংকটে রোগীদের পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পারছেন না চিকিৎসকরা।
Advertisement
ফলে বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে আবাসিক ওয়ার্ড- সবখানেই এখন জটিল মানসিক রোগীদের ভরসা শুধুই উচ্চ ক্ষমতার ওষুধ আর ঘুম। তবে সেসব ওষুধও মেলে না ঠিকমতো। নেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ। দালালদের হয়রানিতে অতিষ্ঠ দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা।
হাসপাতালের হালহকিকতমাত্র ৬০ শয্যা নিয়ে ১৯৫৭ সালে পাবনা শহরের ঐতিহ্যবাহী শীতলাই জমিদার বাড়িতে অস্থায়ীভাবে পাবনা মানসিক হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। এসময় ৮০ জন রোগী ভর্তি হন। পরে ১৯৫৯ সালে শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে হেমায়েতপুরে মানবতার সাধক শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের জমি ও সরকারি অধিগ্রহণকৃত মোট ১১১.২৫ একর জমির ওপর হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৬৬ সালে হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫০ ও পরে ২০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। সবশেষ ১৯৯৬ সালে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এরমধ্যে ৩৫০টি সাধারণ ও ১৫০টি পেয়িং বেড।
‘এখানে রোগীকে ভর্তি রাখলে শুধু সময়মতো ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। কোনো কাউন্সেলিং বা থেরাপি দেওয়া হয় না। এভাবে শুধু ওষুধ খাইয়ে একটা মানুষকে কতদিন ভালো রাখা যায়? আর এসব রোগীরা কীভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে?’
Advertisement
বর্তমানে এই হাসপাতালে বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১০০-১৫০ রোগী চিকিৎসা নেন। বছরে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার রোগী ভর্তি হন। হাসপাতালে ৫০০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে রোগী ভর্তি আছেন ৩৪৫ জন। এছাড়া প্রতিবছরই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সংকটে মুমূর্ষু হাসপাতালসরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, গুরুতর কিংবা সাধারণ মানসিক রোগীদের স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনে ফেরাতে ওষুধের পাশাপাশি বিহেভিয়ার থেরাপি, সাইকোথেরাপি, মিউজিক থেরাপি এবং নানামুখী বিনোদন ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ বা চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও এটি স্বীকৃত। কিন্তু প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রায় সাত দশক পেরিয়ে গেলেও ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে এসব কার্যকর চিকিৎসার তেমন সুযোগ নেই বললেই চলে। থেরাপি কিংবা কাউন্সেলিং দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও থেরাপিস্টও নেই। দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের বিনোদনের একমাত্র সিনেমা হলটিও অচল। এতে রোগীরা মাসের পর মাস শয্যায় শুয়ে শুধু উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওষুধ আর ইঞ্জেকশনে মানসিক অস্থিরতা কমানো ও ঘুমিয়ে দিন পার করছেন।
‘চিকিৎসক তাকে ৫টি ওষুধ লিখলেও হাসপাতাল থেকে মিলেছে মাত্র ১টি। এক্ষেত্রে তার প্রশ্ন, শিডিউল মিলিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে সরকারি এই হাসপাতালে এসে কী লাভ? ’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, সেবা ব্যাহত হওয়ার মূল কারণ তীব্র জনবল ও অর্থ সংকট। পুরোনো আমলের সেই কাঠামো ও ব্যবস্থাপনাতেই চলছে হাসপাতাল। সৃষ্টি হয়নি নতুন পদ বা অন্যান্য উপযোগ। বর্তমানে হাসপাতালে ৩১টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের মধ্যে ৯টিই শূন্য রয়েছে। একইসঙ্গে আয়া, নার্স থেকে শুরু করে প্রতিটি পদে লোকবলের চরম ঘাটতি রয়েছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা অতিরিক্ত রোগীর বিপরীতে চিকিৎসক সংকটের কারণে প্রত্যেক রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদেরও স্বল্প সময়ে কেবল ওষুধের নাম লিখে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকছে না।
Advertisement
এক মাস ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়া কুষ্টিয়ার আমিরুল ইসলাম জানান, মানসিক রোগের ক্ষেত্রে এখন তিনি পুরোপুরি সুস্থ। হঠাৎ শরীর ফুলে যাওয়ায় ডাক্তার দেখাতে এসেছেন।
ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেওয়ার অভিজ্ঞতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আবাসিক ওয়ার্ডের ভেতর তিনবেলা খাবার, ওষুধ আর ঘুম ছাড়া তেমন কিছুই দেখিনি। এসব ছাড়া ভেতরে তেমন কিছু হয়ও না।’
এদিকে বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়ার কথা থাকলেও হাসপাতাল থেকে সেটিও সঠিকভাবে মেলে না। নেই কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার সুযোগও। উল্টো রয়েছে দালালদের হয়রানি।
ওষুধনির্ভর হাসাপাতালে নেই থেরাপির ব্যবস্থাওষুধনির্ভর চিকিৎসায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভর্তি থাকা এক রোগীদের স্বজন বলেন, ‘এখানে রোগীকে ভর্তি রাখলে শুধু সময়মতো ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। কোনো কাউন্সেলিং বা থেরাপি দেওয়া হয় না। এভাবে শুধু ওষুধ খাইয়ে একটা মানুষকে কতদিন ভালো রাখা যায়? আর এসব রোগীরা কীভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে?’
‘নার্সের যে পদগুলো রয়েছে সেগুলো ১০০ শয্যার। এরপর হাসপাতাল ৫০০ শয্যা হলেও নার্স, সুপারভাইজার বা এ সংশ্লিষ্ট পদ বাড়ানো হয়নি। এতো কম জনবল নিয়ে এরকম একটি হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করা কঠিন।’
এ বিষয়ে পাবনা মানসিক হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাইম আক্তার আব্বাসি বলেন, সুস্থ হতে সাধারণ বা নিউরোসিস রোগীদের ক্ষেত্রে ওষুধের ভূমিকা ৩০-৪০ শতাংশ। এদের ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং, থেরাপি বা পুনর্বাসনমূলক চিকিৎসা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গুরুতর বা সাইকোসিস রোগীদের জন্য ওষুধই প্রধান চিকিৎসা। আর আমাদের হাসপাতালে এরকম রোগীই বেশি ভর্তি থাকে। তবে তাদেরও কাউন্সেলিং বা পুনর্বাসনমূলক চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও চিকিৎসক ও অন্যান্য সংকটে সেটি পর্যাপ্ত হারে দেওয়া সম্ভব হয় না। আর আউটডোরে তো একেবারেই সম্ভব হয় না।
আরও পড়ুন পীরগঞ্জ হাসপাতাল / হাসপাতালে স্যালাইন-ভ্যাকসিন সংকটে নাকাল রোগীরা ওষুধের জন্য হাহাকারবহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা পাবনার দড়িভাউডাঙ্গার বাসিন্দা আহম্মদ শেখ জানান, চিকিৎসক তাকে ৫টি ওষুধ লিখলেও হাসপাতাল থেকে মিলেছে মাত্র ১টি। এক্ষেত্রে তার প্রশ্ন, শিডিউল মিলিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে সরকারি এই হাসপাতালে এসে কী লাভ?
অপরদিকে কুষ্টিয়া থেকে ছেলেকে চিকিৎসা করাতে নিয়ে আসা নজরুল ইসলাম জানান, একাধিকবার এসেও হাসপাতাল থেকে সব ওষুধ পাননি তিনি। রক্তের ৪টি পরীক্ষার সবকটিই বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করাতে হয়েছে।
৫০০ শয্যার হাসপাতালে ১০০ শয্যার জনবলমানসিক হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার মো. রফিক বলেন, আমাদের নার্সের যে পদগুলো রয়েছে সেগুলো ১০০ শয্যার। এরপর হাসপাতাল ৫০০ শয্যা হলেও নার্স, সুপারভাইজার বা এ সংশ্লিষ্ট পদ বাড়ানো হয়নি। এতো কম জনবল নিয়ে এরকম একটি হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করা কঠিন।
তিনি বলেন, কখনো কখনো রোগীরা এতটা উগ্র হয়ে যান, কয়েকজন মিলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। অথচ সেই অর্থে আমাদের জনবলই নেই।
আরও পড়ুন সরকারি হাসপাতাল / চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের দেখা পান দুই মিনিট সক্রিয় দালাল চক্রএ প্রতিবেদক হাসপাতালের আউটডোরে প্রবেশ করতেই পৃথকভাবে কয়েকজন এসে কোনো সহযোগিতা লাগবে কি না জিজ্ঞাসা করতে থাকে। এরমধ্যে মাসুদ রানা নামের এক দালাল এসে দীর্ঘ আলাপ চালান। তিনি হাসপাতালের পাশেই গড়ে ওঠা প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী ভর্তি করতে প্ররোচিত করেন। এছাড়া কোনো সহযোগিতা লাগলে সেটিও করতে চান। মূলত এভাবেই দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীর স্বজনদের কবজা করে তাদের হয়রানি করেন এসব দালালরা। প্রতারণা করে হাতিয়ে নেন টাকা পয়সা।
হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার প্লাটুন কমান্ডার রেজাউল করিম বলেন, আউটডোরে আগে আমার আনসার সদস্য ছিল চারজন। আর এখন রয়েছে একজন। ওই একজন আউটডোরের চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, রোগীদের সিরিয়াল মেইনটেন বা শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে। ফলে চাইলেও বাইরে নজর দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে এরমধ্যেও যতটুকু সম্ভব চেষ্টা থাকে এদের দৌরাত্ম্য রোধ করতে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্যএ ব্যাপারে পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ ব্যাপক জনবল সংকট রয়েছে। ফলে সব ধরনের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা কঠিন। মামলা জটিলতায় টেন্ডার বন্ধ, ফলে ওষুধ সরবরাহ নেই। এজন্য বহির্বিভাগেও ওষুধ সরবরাহ নেই। তবে আবাসিক বিভাগে এ সংকট নেই।
আরও পড়ুন মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি / প্রয়োজন ট্রমা কাটিয়ে ওঠার দীর্ঘমেয়াদি আয়োজনহাসপাতালে পুনর্বাসন চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই জানিয়ে এ কর্মকর্তা জানান, সরকারি মানসিক হাসপাতালে পুনর্বাসন চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। বরাদ্দ ও জনবল সংকট থাকলেও সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি ১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি ‘আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট’ এ রূপ নেবে এবং বিদ্যমান জনবল, অবকাঠামো ও সেবার সংকট কেটে যাবে বলে আশা রাখছি।
এফএ/এএসএম