দেশজুড়ে

পাবনায় ৫০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে শোকজ

পাবনার বেড়া উপজেলার ৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষককে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। শিক্ষার্থীদের মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান (এফএলএন) কর্মসূচির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে এই শোকজ করা হয়েছে।

Advertisement

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাতে বেড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম নোটিশ জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে ২৬ জুলাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত শোকজ নোটিশটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও শিক্ষা অঙ্গনে জানাজানি হলে উপজেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারের বিশেষ গুরুত্বপ্রাপ্ত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় গত ৩০ জুনের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা রিডিং, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের গণিতের চারটি মৌলিক নিয়ম (যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সাবলীল ইংরেজি রিডিং নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ভিত্তিমূলক মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের ফলাফল অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় শিক্ষা প্রশাসন এই পদক্ষেপ নেয়।

অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, একাধিক নির্দেশ প্রদান ও তদারকির পরও শিক্ষার্থীদের শেখার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছেন। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কেন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে না, তা নোটিশ প্রাপ্তির আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Advertisement

শোকজপ্রাপ্ত ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে- রূপগঞ্জ, আকনাই, কোমরপুর, শ্যামপুর, চর নতিবপুর, পুরান মাসুমদিয়া, মাশুমদিয়া মধ্যপাড়া, মাশুমদিয়া কাজীপাড়া, নতুন মীরপুর, রতনগঞ্জ, ভবানীপুর, রূপপুর, রূপপুর মধ্যপাড়া, রূপপুর পশ্চিমপাড়া, ঢালারচর, খাস ঢালারচর, খাস আমিনপুর, গোপিন্দা, ধর্মগঞ্জ, কাজীশরিফপুর, মহিষাখোলা, দুর্গাপুর, সিন্দুরিয়া ও বেড়া সান্যালপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।

এদিকে গণ-শোকজের এই ঘটনায় স্থানীয় শিক্ষা অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নোটিশ পাওয়া ৫০টি বিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবানীপুর ও ঢালারচর ক্লাস্টারের অন্তর্ভুক্ত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কৃষ্ণ চন্দ্র সরকার ও আব্দুর রাজ্জাকের অপর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে টানা দুই-তিন মাসেও পরিদর্শনে যাননি তারা। তদারকির অভাবে সামগ্রিক শিক্ষা পরিবেশে শ্লথগতি এসেছে।

পাশাপাশি উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে প্রকৃত শিক্ষার্থীর চেয়ে কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি দেখানোর মারাত্মক অভিযোগও উঠেছে। অনলাইন ও অফলাইন নথিতে বিপুল সংখ্যক ভুয়া শিক্ষার্থীর নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় মূল্যায়নের প্রকৃত চিত্রে অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি এফএলএন কার্যক্রমে পড়েছে।

Advertisement

আরও পড়ুন সিরাজদিখানে ক্লাসে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ

তবে শিক্ষা কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও ভুয়া শিক্ষার্থীর অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা কৃষ্ণ চন্দ্র সরকার বলেন, আমি আমার ক্লাস্টারের প্রতিটি স্কুলেই পরিদর্শন ও তদারকি করেছি। শিক্ষকদের এসব বিষয়ে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। নিজেদের দায় এড়াতে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাকও অভিযোগ অঙ্গীকার করে একই ধরনের মন্তব্য করেন।

সামগ্রিক বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিখন দক্ষতা নিশ্চিত করতে এফএলএন কর্মসূচিতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। শিক্ষকদের লিখিত ব্যাখ্যা পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

এদিকে কেবল শিক্ষকদের শোকজ করেই দায় এড়ানো যাবে না বলে মনে করছেন স্থানীয় অভিভাবকেরা।

তাদের মতে, বিদ্যালয়ভিত্তিক দুর্বলতার আসল কারণ চিহ্নিত করে নিয়মিত তদারকি ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

উপজেলার গোপিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের শিক্ষকদের চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই। তবে বেশিরভাগ অভিভাবক নিরক্ষর ও অসচেতন হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বাড়িতে পড়াশোনা করার সুযোগ পায় না। ফলে তারা পিছিয়ে পড়ে। তবে আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ইতোমধ্যে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশা করছি, আগামী তিন মাসের মধ্যে শিক্ষার্থীদের রিডিং ও গাণিতিক দক্ষতায় দৃশ্যমান উন্নতি হবে।

আলমগীর হোসাইন নাবিল/এনএইচআর/এএসএম