আন্তর্জাতিক

ইরান-ইউক্রেন-ইসরায়েল-ফিলিস্তিন-সৌদি: সব কি এক সূত্রে বাঁধা?

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এখন আর কোনো সংঘাতই একক বা বিচ্ছিন্ন নয়। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি থেকে শুরু করে কাস্পিয়ান সাগরের জলসীমা পর্যন্ত প্রতিটি রণক্ষেত্র এখন একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। ইরান, ইউক্রেন, ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, সৌদি আরব, ইরাক এবং যুক্তরাষ্ট্র—এই দেশগুলোর নাম এখন একই ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে উচ্চারিত হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন মনে হলেও, সাম্প্রতিক সামরিক ও কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করছে, এই সবগুলো সংকট আসলে একটি সুনির্দিষ্ট বৈশ্বিক সূত্রে গাঁথা।

Advertisement

কাস্পিয়ান সাগরে জাহাজে হামলা এবং ইরান-ইউক্রেন বিরোধ

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধ এখন আর কেবল ইউরোপের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি ইউক্রেনীয় ড্রোন কাস্পিয়ান সাগরে থাকা একটি ইরানি কার্গো জাহাজে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের দাবি, এই জাহাজগুলো রাশিয়ার জন্য সামরিক সরঞ্জাম বহন করছিল।

এই হামলার মাধ্যমে ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ সরাসরি এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। তেহরান এই ঘটনার পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং ইউক্রেনকে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইউক্রেনের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের যুদ্ধকে একটি একক বৈশ্বিক দ্বন্দ্বে রূপান্তর করেছে।

আরও পড়ুন ইরানের জাহাজে হামলা চালিয়ে নিজের পায়েই কুড়াল মারল ইউক্রেন? ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এখন এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি নেটওয়ার্কের কারণে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পারস্য উপসাগর এবং লোহিত সাগরে ইরানের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এই সংঘাতকে আরও উসকে দিয়েছে।

Advertisement

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ/ ফাইল ছবি: এপি-ইউএনবি

মার্কিন সামরিক বাহিনী এ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে। ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখায় পুরো পরিস্থিতি এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুন ট্রাম্পের কথা শুনলেই বিপদ! হরমুজে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেবে ইরান সৌদিতে হামলা এবং ইরাকে যৌথ অভিযান

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আরেকটি বড় ঝাঁকুনি এসেছে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো ড্রোন হামলার মাধ্যমে। রিয়াদ অভিযোগ করেছে, ইরানপন্থি ইরাকি মিলিশিয়ারা এই হামলার সঙ্গে জড়িত।

এই উসকানির জবাবে বসে থাকেনি সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে মার্কিন ও সৌদি বাহিনী যৌথভাবে পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিধ্বংসী বিমান হামলা চালিয়েছে।

Advertisement

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা কোনো যুদ্ধ চায় না, তবে নিজেদের সুরক্ষায় যে কোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রস্তুত। এই যৌথ হামলা সৌদি ও মার্কিন সামরিক অক্ষকে আরও দৃঢ় করেছে।

আরও পড়ুন ইরাকে ইরানপন্থি গোষ্ঠীর ওপর সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা, নিহত ৮ ইয়েমেনের হুথি ও সৌদির অমীমাংসিত বিরোধ

ইরাকের পাশাপাশি ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গেও সৌদি আরবের বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি শিপিং লাইনে অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে এবং সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা তীব্র করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান/ ফাইল ছবি: সেন্টকম

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করলেও গোষ্ঠীটির সাম্প্রতিক তৎপরতা রিয়াদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। রিয়াদ মনে করে, হুথিদের এসব কর্মকাণ্ড আসলে তেহরানের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই অংশ।

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক

মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে এবং রিয়াদকে সম্পূর্ণ নিজেদের বলয়ে রাখতে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক বেসামরিক পরমাণু চুক্তি এগিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই চুক্তির আওতায় ওয়াশিংটন সৌদিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি ও সহযোগিতা দেবে, যার বিনিময়ে সৌদি আরব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ না করার এবং মার্কিন জ্বালানি ব্যবহারের শর্তে রাজি হতে পারে।

এই পরমাণু সহযোগিতা আসলে রিয়াদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ, যা একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদির সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী পাল্টা প্রতিরোধ বলয় গড়ে তোলার মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

গাজার পর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের তাণ্ডব

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী ও নৃশংস সামরিক অভিযানের পর ইসরায়েলি বাহিনী এখন তাদের নজর ঘুরিয়েছে পশ্চিম তীরের দিকে। গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পর পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি সেনারা নতুন করে তাণ্ডব শুরু করেছে। সেখানে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর উচ্ছেদ, ব্যাপক গ্রেফতার এবং সামরিক অভিযান নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত মসজিদ/ ছবি: এপি-ইউএনবি

ইসরায়েলের এই আগ্রাসী নীতি কেবল ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকেই সংকটে ফেলেনি, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একজোট হতে বাধ্য করছে।

আরও পড়ুন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারদের তাণ্ডব, মসজিদ-কৃষিজমিতে আগুন ওয়াশিংটনে জেলেনস্কি ও নেতানিয়াহু: এক সুতোর শেষপ্রান্ত

বিশ্বের এই জটিল ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে সফর করছেন। প্রয়াত মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি দুই নেতাই হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পৃথক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন।

হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু/ ছবি: হোয়াইট হাউজ

নেতানিয়াহু এই বৈঠককে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি রুখতে এবং ইসরায়েলের সুরক্ষায় এক ‘পূর্ণ অংশীদারত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে, জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দ্রুত অস্ত্র সহায়তা নিশ্চিত করা এবং রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছেন। ওয়াশিংটনের এই কূটনৈতিক তৎপরতা প্রমাণ করে, ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে একই সঙ্গে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দুটি ভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রের সুতো নিজের হাতে ধরে রেখেছে।

দুই ফ্রন্টে ব্যস্ত ইরান এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি তাণ্ডবের কৌশল

কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি জাহাজে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা এবং কাছাকাছি সময়ে ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর মার্কিন-সৌদি যৌথ বিমান হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আসলে তেহরানকে একই সঙ্গে উত্তর ও পশ্চিমের দুই ফ্রন্টে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে ব্যস্ত রাখার একটি সুদূরপ্রসারী পশ্চিমা কৌশল।

আরও পড়ুন ইরান যুদ্ধে সেনা নিহতের প্রকৃত তথ্য গোপন করছে ট্রাম্প প্রশাসন!

ইরান যখন ইউক্রেন ও ইরাকের এই জোড়া ফ্রন্টে নিজের শক্তি ও মনোযোগ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক সেই মোক্ষম সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে ইসরায়েল। তেহরানের পক্ষ থেকে বড় কোনো সামরিক প্রতিরোধের আশঙ্কা না থাকায় ইসরায়েলি বাহিনী অনেকটা নিশ্চিন্তেই পশ্চিম তীরে নির্মম তাণ্ডব ও উচ্ছেদ অভিযান বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে, দুই ফ্রন্টে ইরানকে ব্যস্ত রাখার এই ভূরাজনৈতিক চাল ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের আগ্রাসনকে আরও সহজ ও নিষ্কণ্টক করে তুলেছে।

অর্থাৎ, কাস্পিয়ান সাগরের ড্রোন হামলা, ইরাক ও ইয়েমেনের প্রক্সি যুদ্ধ, ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলি নির্যাতন এবং ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণী বৈঠক—সবকিছু আসলে একই সুতোয় গাঁথা। একদিকে রয়েছে ইরান, রাশিয়া এবং তাদের সমর্থিত আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের অক্ষ। অন্যদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইউক্রেন এবং সৌদি আরবের মতো কৌশলগত মিত্রদের বলয়। এই দুই অক্ষের মধ্যকার লড়াই আজ পুরো বিশ্বকে এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি, ডয়েচে ভেলে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, সিএনএনকেএএ/