জাতীয়

সাম্য হত্যা থেকে রাজীব শাহর ‘মসজিদ’, ঢাকার ফুসফুসে ‘মাদকের ক্ষত’

হঠাৎ করেই আলোচনায় রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে বানানো ‘নামাজের জায়গা’সহ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ঘিরেই আলোচনার সূত্রপাত। বিষয়টিকে অনেকে সাধুবাদ জানালেও বিরোধিতা করছে একপক্ষ।

Advertisement

তবে এই বাদানুবাদের মধ্যে মূল বিষয়টি আড়ালে চলে যাচ্ছে বলে মনে করেন পরিবেশবাদীরা। রাজধানী ঢাকার ফুসফুস খ্যাত এ উদ্যান যে ভবঘুরে ও মাদকাসক্তদের স্থায়ী আস্তানায় পরিণত হয়েছে— সে বিষয়টিই এতে চাপা পড়ে গেছে বলে মনে করছেন তারা। মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় গত বছর ছাত্রদলের এক নেতাকে মাদকসেবীরা হত্যা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনেক জায়গায় দেখা যায় ময়লার স্তূপ/ ছবি- জাগো নিউজ

ছয় বছর আগে ২০২০ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সাতটি পয়েন্টে খাবারের রেস্তোরাঁর জন্য তৈরি করা হয় অবকাঠামো। পরিবেশবাদীদের বাধা ও মামলার কারণে সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। সেসব অবকাঠামো এখন হয়ে উঠেছে ভবঘুরে ও মাদকাসক্তদের স্থায়ী আস্তানা। এমনকি কেউ কেউ সেখানে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন।

Advertisement

আরও পড়ুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাজিব শাহের গড়ে তোলা ‘মসজিদ’ উচ্ছেদ

অভিযোগ রয়েছে, এসব ভবঘুরেই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রি এবং সেবন করে। এদের কেউ কেউ ছিনতাইয়ের সঙ্গেও জড়িত। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে একটু খোলামেলা পরিবেশে উদ্যানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা প্রায়ই এই ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খোয়াচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, উদ্যানে বিভিন্ন উন্নয়নকাজের জন্য ইট, বালু ও পাথরসহ যেসব মালামাল এনে মজুত রাখা হয়- সেগুলো চুরি করে বিক্রি করছেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন সময়ে একাধিক মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারী আটক ও গ্রেফতার হয়েছেন। গত বছরের ১৩ মে দিনগত রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে ঢাবি শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য (২৫) নিহত হন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাঁজা বিক্রি করতে নিষেধ করায় তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছুরিকাঘাতে ঢাবি শিক্ষার্থী নিহত

এরপরও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক বিক্রি-সেবন ও ভবঘুরেদের অবাধ বিচরণ কমেনি। এমনকি উদ্যানের কোথাও কোথাও অস্থায়ী স্থাপনা তৈরি করে দখলেও অভিযোগ রয়েছে।

ময়লা-আবর্জনার কারণে উদ্যানে ঘুরতে আসা মানুষদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়/ ছবি- জাগো নিউজ

Advertisement

সম্প্রতি উদ্যানের ভেতরে অবৈধভাবে গড়ে তোলা ‘নামাজের জায়গা’ উচ্ছেদ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, ‘নামাজের জায়গা’ নির্মাণের নামে রাজীব শাহ নামের এক মাদকাসক্ত যুবক উদ্যানের জমি দখলের পাঁয়তারা করছিলেন। উদ্যানে নাট্যশালা নির্মাণের জন্য যেসব ইট ও বালু মজুত রাখা হয়েছিল, সেগুলো এনেই তৈরি করা হচ্ছিল কথিত ওই ‘নামাজের জায়গা’। প্রশাসনিক উদ্যোগে স্থাপনাটি ভেঙে দেওয়া হলেও বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছে উদ্যানের ভেতরে শিকড় গেড়ে বসা ভবঘুরেদের আস্তানা।

গত বছরের ১৩ মে দিনগত রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে ঢাবি শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য নিহত হন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাঁজা বিক্রি করতে নিষেধ করায় তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

গত সোমবার (২৭ জুলাই) সরেজমিনে দেখা গেছে, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা স্থান ফাঁকা পড়ে থাকলেও চারপাশে মাদকাসক্ত ও ভবঘুরেদের অবাধ বিচরণ রয়েছে। তাদের অবাধ বিচরণ ও অসামাজিক কার্যকলাপ নষ্ট করছে উদ্যানের পরিবেশ। উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিকের বস্তা, ময়লা-আবর্জনা এবং পরিত্যক্ত জিনিসপত্রের স্তূপ রয়েছে, যা এ উদ্যানের সৌন্দর্য ম্লান করে দিচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর উদাসীনতার সুযোগে বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অবৈধ অস্থায়ী খুপরি ও আবর্জনার ডিপো।

আরও পড়ুন ঢাবি শিক্ষার্থী সাম্য হত্যা: ৭ মাদক কারবারির বিরুদ্ধে চার্জশিট

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিভিন্ন চত্বর, গাছের তলা এবং কংক্রিটের বসার জায়গাগুলো ঘুরে দেখা যায় নৈরাজ্যকর পরিবেশ। উদ্যানের ভেতরের বিভিন্ন শেড ও উন্মুক্ত চত্বরে দিন-দুপুরেই ভবঘুরে ও মাদকাসক্তদের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ে।

উদ্যানের নিরাপত্তায় রয়েছে একটি আনসার ক্যাম্প। তবে তাদের কার্যক্রম সেভাবে চোখে পড়েনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আনসার ক্যাম্পের একাধিক সদস্য জানান, তারা প্রায়শই মাদক বিক্রেতাদের ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন। তবে মাদক কারবারিতে জড়িতদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষার্থীর সুসম্পর্ক থাকায় অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। তাছাড়া মাদকসেবীদের বেশিরভাগই প্রাণের মায়া করে না। তারা ছুরি ও লাঠি নিয়ে হামলা চালান।

আরও পড়ুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গান গেয়ে ৭ মাদকসেবীকে হাতেনাতে ধরল পুলিশ

সবমিলিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবেশ এখন এমন হয়েছে যে, সন্ধ্যা নামলে তো বটেই— দিন-দুপুরেও উদ্যানে বসে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের আসর। এসব চক্রের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থী, গবেষক ও পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষ ভুগছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়।

উদ্যানের অভ্যন্তরে গড়ে তোলা বেশকিছু অবৈধ স্থাপনা সম্প্রতি উচ্ছেদ করে প্রশাসন/ ছবি- জাগো নিউজ

কথা হয় লালবাগের লোকমান হোসেনের সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি জানান, একসময় নিয়মিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রাতঃভ্রমণে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে ভবঘুরে ও মাদকাসক্তদের অবাধ বিচরণের কারণে ভয়ে আর আসতে পারেন না।

হাতিরপুলের বাসিন্দা আতাউর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবেশ দিন দিন খারাপ হচ্ছে। উন্নয়নের নামে বিগত সরকারের আমলে কোটি কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। এখন উদ্যানের রাস্তায় হাঁটতে গেলে নাকে রুমাল চেপে চলতে হয়। ভবঘুরেরা যেখানে-সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করে। এদের কিছু বলতে গেলে জোটবদ্ধ হয়ে মারতে আসে।

আরও পড়ুন উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে ‘শ্রীহীন’ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান!

মগবাজারের প্রবীণ বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন, শুনেছি পরিবেশবাদীদের বাধা ও মামলার কারণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাতটি খাবারের রেস্তোরাঁ চালু হয়নি। বর্তমানে সেগুলোই ভবঘুরেদের নিরাপদ বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

যে কোনো স্থাপনা বা উদ্যান যে উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয়েছে, সেটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এটি নিশ্চিত করা গেলে নাগরিক সেবার পরিধি বাড়বে। এখন সোহরাওয়াদী উদ্যানে যা চলছে, তা উদ্যানের পরিবেশের জন্য মোটেও ভালো নয়।— বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উদ্যানের ভেতরে শত শত দোকানপাটের মেলা বসতো। অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে ভেতরের এসব দোকানপাট বসতে দেওয়া হচ্ছে না।

তার মতে, উদ্যানের ভেতরের রেস্তোরাঁর পরিত্যক্ত অবকাঠামো থেকে ভবঘুরেদের সরিয়ে দিতে পারলেই উদ্যানে মাদক কেনাবেচা কমবে এবং পরিবেশের উন্নতি হবে।

আরও পড়ুন দিনে মাদকসেবীদের আড্ডা, রাতে যৌনকর্মীদের দখলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান জাগো নিউজকে বলেন, যে কোনো স্থাপনা বা উদ্যান যে উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয়েছে— সেটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এটি নিশ্চিত করা গেলে নাগরিক সেবার পরিধি বাড়বে। এখন সোহরাওয়াদী উদ্যানে যা চলছে, তা উদ্যানের পরিবেশের জন্য মোটেও ভালো নয়।

তিনি বলেন, এই বিশাল উদ্যানকে জনসাধারণের উপযোগী করতে হবে। জনসাধারণের জন্য যেখানে যে স্থাপনা তথা মসজিদ, রেস্তোরাঁ বা অন্যান্য স্থাপনা করা দরকার— সেটি যাতে সেভাবেই করা হয়। এটা করা গেলে উদ্যানের পরিবেশ আরও সুন্দর হবে।

এমইউ/কেএসআর