ধর্ম

মেসওয়াক করার গুরুত্ব ও ফজিলত

মহানবীর (সা.) একটি প্রিয় আমল ছিল মেসওয়াক করা। শুধু দাঁত ও মুখ পরিস্কার করার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একটি ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবেই মহানবী (সা.) মেসওয়াক করতেন এবং তাঁর সাহাবিদেরও মেসওয়াক করার নির্দেশ ও উৎসাহ দিতেন।

Advertisement

ইসলামে মেসওয়াক করার গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে বাংলাদেশের সুপরিচিত আলেম শায়খ আহমাদুল্লাহ এক বক্তব্যে বলেন:

মেসওয়াক করাকে অনেকেই শুধু দাঁত ও মুখ পরিষ্কার করার একটি সাধারণ মাধ্যম মনে করে। ফলে আজকাল অনেক মুসলমানই মেসওয়াক করা ছেড়ে দিয়েছে। যেহেতু দাঁত পরিষ্কারের জন্য আরও অনেক সুন্দর ও আধুনিক উপকরণ আমাদের হাতের নাগালে আছে। কিন্তু বিভিন্ন হাদিস পর্যালোচনা করলে আমরা বুঝতে পারি, মেসওয়াক শুধু দাঁত ও মুখ পরিষ্কার করার মাধ্যম নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে অনেকগুলো আধ্যাত্মিক উপকার। একজন ইমানদার নিয়মিত মেসওয়াক করার মাধ্যমে সেই আধ্যাত্মিক উপকারগুলোও পেতে পারেন।

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) আনহা থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘মেসওয়াক যেমন মুখ পরিষ্কার করার মাধ্যম, তেমনই তা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম উপায়।’ সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমসহ হাদিসের বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি প্রত্যেক অজুর সময় (কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে প্রত্যেক নামাজের সময়) মেসওয়াক করাকে তাদের জন্য বাধ্যতামূলক বা অবধারিত করে দিতাম।’

Advertisement

এ হাদিসগুলো থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, মেসওয়াক সুন্নাত আমল হলেও এর গুরুত্ব ফরজ বা ওয়াজিবের কাছাকাছি। শুধু উম্মতের কষ্টের কথা বিবেচনা করেই নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেটিকে ফরজ বা ওয়াজিব হিসেবে নির্ধারণ করেননি। সাধারণ অন্য কোনো সুন্নত বা নফল আমল সম্পর্কে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সচরাচর এ ধরনের কঠোর বার্তা দিতেন না। তাই একজন ইমানদারের কাছে মেসওয়াক কখনো অবহেলিত বা তুচ্ছ হতে পারে না।

আমাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ মুস্তফার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনের শেষ মুহূর্তের আকুতি ছিল মেসওয়াক করা। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবীর (সা.) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার ঠিক আগ মুহূর্তে যখন তিনি আম্মাজান আয়েশার (রা.) কোলে শায়িত ছিলেন, তখন সেখানে প্রবেশ করেন হযরত আয়েশার ভাই আব্দুর রহমান (রা.)। তার হাতে একটি মেসওয়াক ছিল। রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন কথা বলার মতো শারীরিক শক্তি ছিল না, তিনি মেসওয়াকের দিকে ইশারা করলেন। আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মেসওয়াক করতে চান? নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাথা নেড়ে সায় দিলেন। আয়েশা (রা.) মেসওয়াকটি হাতে নিলেন। তবে সেটি চিবানোর মতো সামর্থ্য তখন মহানবীর (সা.) শরীরে ছিল না। আয়েশা (রা.) নিজের দাঁত দিয়ে চিবিয়ে মেসওয়াকের মাথাটি নরম করে রাসুলুল্লাহর (সা.) হাতে দিলেন। নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেটি দিয়ে দাঁত ঘষলেন এবং এর কিছুক্ষণ পরই তিনি রফিকে আ’লার ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন।

জীবনের শেষ মুহূর্তেও মেসওয়াক করার জন্য নবীজির (সা.) এই গভীর আকুলতা থেকে বোঝা যায় ইমানদারের জীবনে মেসওয়াকের গুরুত্ব কত বেশি।

আমরা কখন কখন মেসওয়াক করতে পারি? নবী করীমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনী থেকে জানা যায়, তিনি অজুর সময় মেসওয়াক করতেন। অজুর সময় দুই হাতের কব্জি ধোয়ার পর এবং কুলি করার পূর্বে মেসওয়াক করা যেতে পারে। এ ছাড়া প্রতি ওয়াক্তে নামাজের পূর্বেও মেসওয়াক করারও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

Advertisement

বাইরে কাজকর্ম করে ঘরে ফিরলে তখনও মেসওয়াক করা যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বাইরে থেকে ঘরে ফিরে সর্বপ্রথম কোন কাজটি করতেন এ বিষয়ে আয়েশাকে (রা.) জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তিনি ঘরে প্রবেশ করেই প্রথম মেসওয়াক করতেন।

জুমার দিন বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মেসওয়াক করা সুন্নত। সাধারণ ওজু ও নামাজের বাইরেও জুমার দিনের স্বতন্ত্র আমল হিসেবে এটি পালন করা উচিত।

ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পরও রাসুলুল্লাহ (সা.) মেসওয়াক করতেন।  এ ছাড়া পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের পূর্বে মুখ পবিত্র করার জন্য মেসওয়াক করার নির্দেশ রয়েছে। একটি হাদিসে এসেছে, মেসওয়াক করে কোরআন তিলাওয়াত করলে ফেরেশতারা ওই তেলাওয়াত শোনেন ও অনুকরণ করেন।

রোজা অবস্থায় দিনের বেলা মেসওয়াক করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে যে,  রোজা রেখে মেসওয়াক করলে হয়তো রোজার ক্ষতি হয়। মূলত বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। আম্মাজান আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রোজা অবস্থায় এত বেশি মেসওয়াক করতেন যা গুনে শেষ করা যেত না। তাই রমজান বা নফল রোজার দিনগুলোতে দিনের বেলায় বেশি বেশি মেসওয়াক করা উচিত।

সংক্ষেপে একজন ইমানদারের কর্তব্য কয়েকটি সময়ে নিয়মিত মেসওয়াক করার চেষ্টা করা, অজুর সময়, নামাজের পূর্বে, কোরআন তিলাওয়াতের পূর্বে, রোজা অবস্থায়, ঘুম থেকে ওঠার পর, দাঁত বা মুখ অপরিষ্কার হলে এবং জুমার দিনে। যে কোনো ভালো কাজ যেমন ডান দিক থেকে শুরু করা সুন্নত, তেমনই মেসওয়াকও ডান দিক থেকে শুরু করা উচিত।

আসুন, মেসওয়াককে সাধারণ কোনো বিষয় মনে না করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করি। একে জীবনের স্থায়ী সঙ্গী বানিয়ে নিই এবং পরিবারের সকল সদস্যকেও এর গুরুত্ব বুঝিয়ে অভ্যস্ত করে তুলি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবীর (সা.) এই মোবারক সুন্নতটি সঠিকভাবে আঁকড়ে ধরার তাওফিক দান করুন! আমিন”

সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর ভেরিফায়েড ইউটিউব চ্যানেল

ওএফএফ