বিনোদন

ভিউ তো বেশিদিন থাকে না, এই সময়ের পোলাপান এগুলো ভাবে না: শামীম জামান

পুবাইলে চলছে পারিবারিক ধারাবাহিক নাটক ‘এক পাতিলের সংসার’-এর শুটিং। সেই ব্যস্ত শুটিং সেটেই জাগো নিউজের মুখোমুখি হন অভিনেতা ও নির্মাতা শামীম জামান। আলাপচারিতায় উঠে আসে স্ত্রী আমিনা লাবিবের অভিনয়ে অভিষেক, ক্যামেরার সামনে তার প্রথম অভিজ্ঞতা, পরিচালকের আসনে বসে স্ত্রীকে নির্দেশনা দেওয়ার চ্যালেঞ্জ এবং নতুন অভিনেত্রী হিসেবে আমিনার সম্ভাবনা নিয়ে নানা কথা। লিখেছেন মইনুল ইসলাম

Advertisement

জাগো নিউজ : ‘এক পাতিলের সংসার’ অলরেডি কয়েক পর্ব প্রচার হয়ে গেছে, রেসপন্স কেমন পাচ্ছেন?শামীম জামান : সব মিলিয়ে এই নাটকটার রেসপন্স খুবই ভালো পাচ্ছি। আমরা একসময় যেসব নাটক করতাম, সেগুলো অনেক দর্শক দেখেছেন এবং সবাই ভালোবাসে এখনো। বেশ কিছুদিন পরে আমি দেখলাম যে আবারও দর্শক নাটক দেখছেন। বিশেষ করে ধারাবাহিক। তারা পারিবারিক গল্পগুলো মিস করে। এ নাটকটাও অনেক দর্শক দেখছেন। রেসপন্সটা অনেক ভালো। রাস্তাঘাটে গেলে বলে, এক পাতিলের সংসার কিন্তু দেখতেছি, ভালো হচ্ছে। এটা কিন্তু অনেকদিন পরে আমি এই রেসপন্সটা পাচ্ছি। খুব ভালো লাগছে এটা।

আরও পড়ুন ‘শাকিবকে পেয়েও অনুষ্ঠান জমাতে পারেননি পূর্ণিমা’, সমালোচনায় অ্যাডলফ খান

জাগো নিউজ : গল্পের শুরুটাই বেশ জমজমাট। মনে হচ্ছে ব্যতিক্রমী কিছু পরিকল্পনা ছিলো?শামীম জামান : হ্যাঁ। আমি ‘এক পাতিলের সংসার’ গল্পের মাঝখান থেকে ধরছি। ওইটা করলে হয় কী, আমি গল্প যে বলতে চাই আস্তে আস্তে দর্শক প্রথমেই বুঝতে পারে না। এখন ভূমিকা... এখন যে সময়টা আসছে, এই সময়টার মধ্যে ভূমিকা দেয়ার কোনো প্রয়োজন নাই, ভূমিকা দিলে মানুষ দেখে না। নাটকটা একদম ক্রাইসিস থেকে শুরু করছি। এটার একটা রেজাল্ট আমি পাইছি এবং এটার চমৎকার দর্শক, সবাই খুব ভালো কমেন্টস করছে। 

জাগো নিউজ : ঠিক কোন ভাবনা থেকে নাটকের গল্পটি বাছাই করেছেন?শামীম জামান : ছয়-সাত বছর আগে ‘এক পাতিলের সংসার' নামে একটা সিঙ্গেল নাটক করছিলাম। তো ওই সময়ে এই নামটা আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছিলো। আমি ভাবলাম যে এটা দিয়ে একটা সিরিজ বানাবো। তো সুযোগ পাচ্ছিলাম না। মাঝখানে তো আমি দুইটা-তিনটা সিরিজ বানিয়েছি। ‘গোলকধাঁধা’ করেছি, ‘চাটাম ঘর’ করেছি, ‘প্রিয়জন’ করেছি। লাস্ট ‘শাদী মোবারক’ করলাম। কিন্তু এবার মনে হলো যে একটু ফ্যামিলি ওরিয়েন্টেড গল্পগুলো দেখতে চাচ্ছে দর্শক যেহেতু তেমন কিছু করি। সেই ভাবনা থেকেই নামটাকে কেন্দ্র করে গল্প বুনেছি। কনসেপ্টটা আমার নিজেরই। লিখছেন নাট্যকার। 

Advertisement

জাগো নিউজ : দুই যুগ আপনারা সংসার করছেন। এতদিন পর এসে আপনার স্ত্রীও অভিনয়ে এলেন। আরও আগে কেন দেখা যায়নি?শামীম জামান : আমি আগেও অনেকবার বলেছি তাকে অভিনয়ে আসতে। কিন্তু সে অনেক সংসারী মানুষ। বাসায় গেলে হয়তো বোঝা যাবে যে সে কত পরিপাটি থাকে। তার বিছানা থেকে শুরু করে বাসায় সবকিছুই... এত চকচকা-ঝকঝকা রাখে! সংসারের সমস্ত দায়িত্বই তার কাছে আসলে। আমি ফিন্যান্সিয়ালি বলি, যেটাই বলি, এটা আমি নিজে খুব দেখাশোনা করি না, এটা পারি না, আমি তো আবার একটু হাতখোলা। তো ওর হাতেই সব। ওই কারণেই সংসারের এত চাপ ছিলো। আর আমার একটা ছেলে, তার পড়াশোনা ওকেই দেখতে হয়েছে। এবারে ও লেভেল দিলো ছেলে। আর পাশাপাশি সে ক্রিকেট খেলারও ট্রাই করছে। তাকে নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করার কারণেও কিন্তু মিডিয়াতে সে আসেনি। এবারও এসেছে কিন্তু মোশাররফ (মোশাররফ করিম) আর জুঁই বলার কারণে। তবে ওর আগ্রহ তেমন নেই। এই যে অভিনয় করবে ঠিক করে এসেও বলে যে, ‘না, আমি করব না।’ কাজ কিন্তু সে ভালোই করছে। আমিও চাই সে করুক যদি তার আগ্রহ থাকে। প্রতিভা সবার মধ্যেই থাকে। কখন-কীভাবে প্রকাশ হয় সেটা বলা মুশকিল।

জাগো নিউজ : আমরা সবাই আপনাকে অভিনেতা হিসেবে চিনি। নির্মাণে কীভাবে আসলেন?শামীম জামান : আসলে হয় কী, ওই... আমি বোধহয় নির্মাণে আসছি ১০ সালে বা ১১ সালের দিকে। আমি তো আসলে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে প্রডিউস করেছি, অভিনয় করেছি একতালে। একটা পর্যায়ে আমাদের একটা টিম তৈরি হলো। সেখানে নাটকগুলো লাভলু ভাই ডিরেকশন দিতেন। আমি প্রডিউস করতাম, অভিনয় করতাম। পাশাপাশি চঞ্চল, মোশাররফ, আ খ ম হাসানরাও কাজ করতো। প্রচুর হিট নাটক আমরা করেছি। একটা পর্যায়ে টিমটা অফ হয়ে গেল। তখন আমার মনে হলো যে আমার নিজের তো কিছু করা উচিত। সেই ভাবনা থেকে নিজেই নির্মাণ শুরু করলাম।

জাগো নিউজ : অফ হয়েছিল কেন?শামীম জামান : একটা কিছু স্টোরি তো আছেই। থার্ড পার্টি আছে না? এর কানে ওর কানে বিষ ঢালে। তেমন কিছু লোক এখানেও ভিড়েছিলো। খেয়াল করতে পারিনি। বাঙালির রক্তে যেটা আরকি। কেউ ভালো করছে তো তাকে টেনে ধরো। ওটা অন্য স্টোরি, সেটা না-ই বলি। যখন ভেঙে গেল, আমার আবার একটা বাজে স্বভাব যেটা হচ্ছে যে আমি কাউকে কিছু বলতে পারি না। যেমন একটা অভিনয় করব, কাউকে বলতে পারব না যে আমারে অভিনয়ে নিয়েন। প্লাস হচ্ছে আরও কিছু ব্যাপার আছে যেটা মেইনটেইন করা। যেমন অনেকেই ধরেন এখন নিকেতন পাড়ায় পড়ে থাকে। অনেকেই মিডিয়া পাড়ায় যাচ্ছে, এখানে সেখানে যাচ্ছে। কিন্তু আমি তো খুব ঘরকুনো! আমি কাউকে বলতে পারি না যে আমাকে নেন। আমার অভিনয়ের দক্ষতা যদি থাকে তবে কাজ তো আসার কথা। তাই আমি এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করি না। যে টাইমে আমি ডিরেকশনে আসছি, তখন কিন্তু মিডিয়াতে এত নাটকের ছড়াছড়ি ছিলো না। তখন স্যাটেলাইট মাত্র শুরু হইছে। তখন আমাদের এটা পেশা। যখন পেশা হিসেবে নিয়েছি, তখন তো আমাদের বাঁচতে হবে। সেই বাঁচার তাগিদেই নির্মাতা হওয়া।

এখন যে অনেক নাটক, অনেক ওটিটি, অনেক ফিল্ম, অনেক বাজার বড়, ইউটিউব... তখন তো ওরকম ছিল না। তখন বাধ্য হয়ে মোশাররফকে বললাম। সেও বললো, ‘দোস্ত, তুই ডিরেকশন দে।’ তারপরে আরও একটা ঘটনা ছিলো। আমার প্রযোজিত একটি নাটক, ৭ পর্বের ছিলো- সেটা বানাতে গিয়ে এক পরিচালক দেড় লাখ টাকা লস করালো! অথচ বিগ বাজেটের নাটক ছিলো। সে হাইসা-খেলা বানাইতে বানাইতে আমাকে লস করালো। আমি পরে মনে করলাম যে নিজেই করতে হবে। আমার ওস্তাদ মামুনুর রশীদ, লাভলু ভাই তারা তো অভিনেতা থেকে নির্মাতা হয়ে সফল হয়েছেন। তারা প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন আমার বেলায়। হয়ে গেলাম। 

Advertisement

জাগো নিউজ : বড় পর্দায় আপনার দুই বন্ধু চঞ্চল চৌধুরী ও মোশাররফ করিম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আপনাকে কেন পাওয়া গেল না?শামীম জামান : এই জায়গাটা খুব মুশকিল! বড় পর্দায় আমাদেরকে ডাকে নাই, দুই বন্ধুকে ডেকেছে। আর এখানে কীভাবে কাকে ডাকবে, এটা বলা তো মুশকিল। হয়তো মোশাররফের অভিনয় পছন্দ করে বা চঞ্চলের অভিনয় পছন্দ করে। অথবা চরিত্রগুলো তাদের সঙ্গে যায়। তাছাড়া আমি একসময় নির্মাণে চলে এলাম। সবাই আমাকে মেকারই ভাবতে লাগলো। অভিনয়ের জন্য ডাক আসেনি আর ওইভাবে। তবে আমার অনেকদিনের ইচ্ছা একটা সিনেমা বানাবো। একবার প্রস্তুতিও নিলাম। শুট হয়ে যায় যায় এরকম একটা অবস্থা। কিন্তু সিনেমাটি আর বানানো হয়নি।

জাগো নিউজ : কারণ?শামীম জামান : আছে, কিছু কথা বলা যায় না।

জাগো নিউজ : আপনি আসলে কোন ধরনে সিনেমা নির্মাণ করছে চান?শামীম জামান : একেক সময় একেক ভাবনা আসে। একবার একটা কমেডি গল্পে বানাতে চাইলাম, তো পরে ভাবলাম যে না, অন্য ধরনের ছবি বানাই। ছবির গল্পও রেডি করলাম। সেটারও প্রডিউসারও ঠিক ছিল, একদম সব ঠিকঠাক, কিন্তু সামহাউ হলো না। আমি আসলে মোশাররফকে নিয়ে ছবি বানাবো। আরও আমাদের যারা আছেন লাভলু ভাই, আ খ ম হাসান, চঞ্চলও যদি থাকে। সবাই মিলে একসাথে ছবিটা করবো। এখন তো সবাই ব্যস্ত, সবাই বড় হয়ে গেছে। এতগুলো আর্টিস্ট নিয়ে অনেক বাজেট হবে। বাজেট তো একটা ব্যাপার। প্ল্যানিং আছে, গল্পও আছে আমার কাছে।

জাগো নিউজ : কবে সিনেমাটি শুরু করবেন?শামীম জামান : ওইটা তো আমি ডেইলি দুইবার বলি মোশাররফকে যে, ‘চল দোস্ত, ছবি বানাই!’ ও বলে যে, ‘চল করি।’ কিন্তু সামহাউ কেন জানি হচ্ছে না। মোশাররফ করিমকে নিয়ে ছবিটা আমি করবই। আমার ইচ্ছা আছে কমেডি ছবি করার। বাংলাদেশে এখনো ওইভাবে প্রপারলি কমেডি সিনেমা হয়নি। একটা হয়েছে। সেটা করেছেন লাভলু ভাই। ‘মোল্লা বাড়ির বউ’, একটাই! ওই প্রপার কমেডি ছবি ওটাই। এবার আমি রেডি হচ্ছি। আমার সিনেমার স্ক্রিপ্টেরও কাজ চলতেছে, দেখা যাক।

আরও পড়ুন মঞ্চে আবেগে ভেসে কাকে ‘আই লাভ ইউ মা’ বলে কাঁদলেন পরীমনি

জাগো নিউজ : নাটক নির্মাণে সময় আপনার কাছে কী প্রাধান্য, ভিউ না মান?শামীম জামান : অবশ্যই মান। অবান্তর শিল্পচর্চা আমরা শিখি নাই। আমাদের ওস্তাদদের কাছে শিখেছি মান দিয়ে কাজ করা। আমরা যে নাটকগুলা বানাই পারিবারিক গল্প থাকে। পরিবার নিয়ে একসঙ্গে উপভোগ করা যায়। তাতেও কিন্তু ভিউ হয়। আর ওই সুড়সুড়ি দেওয়া নাটক ভিউ বানানোর জন্য, ওইটা আমরা করি না। ওইটা বেশিদিন থাকে না, ক্ষণস্থায়ী।

জাগো নিউজ : আপনি অভিনেতা থেকে নির্মাণে এসেছেন। আজকাল অনেক নির্মাতাই বলেন যে অভিনেতার সংকট চলছে। আপনার কাছেও তাই মনে হয়?শামীম জামান : অবশ্যই। অভিনেতার সংকট চলছে। মোশাররফের মতো তো আরও ৪-৫টা মোশাররফ থাকা দরকার ছিলো। সেরকম হয়নি তো।

জাগো নিউজ : এটা না হওয়ার কারণ কী?শামীম জামান : কারণ ওইভাবে তৈরিও করা হয়নি। অনেকে এসেছ। হারিয়ে গেছে। ভালো মেধা ছিলো। কিন্তু পারেনি। আমরা যে সারাউন্ডিংয়ে বেড়ে উঠেছি, আমরা যে সময় দিয়েছি তৈরি হওয়ার জন্য, মঞ্চ থেকে এসেও সেটা এখন দিতে চায় না তরুণরা। আমারই ক্যারিয়ার ৩৭ বছর! মোশাররফ, চঞ্চল বা হাসান, লাভলু ভাইয়ের ক্যারিয়ার আরও দীর্ঘ। দীর্ঘ সময় আমরা মঞ্চে কাজ করার পরে টিভিতে এসেছিলাম। এসে একটা ভালা চরিত্র করার জন্য, ভালো অভিনয় করার জন্য দিনের পর দিন বসে থাকতাম পুবাইলে। এখনকার জেনারেশনে এই জিনিসি তো নাই। তারা দ্রুত চায় সব। ভাইরাল হয়ে আজকে থাকলে পরশুদিন নেই! একজন যায়, আরেকজন আসে। এই জেনারেশনের তালিম নেই। ভালো অভিনয়, শিল্পবোধ, ধৈর্য সবকিছুরই তালিম লাগে। গুরুবিদ্যার একটা ব্যাপার আছে এখানে। শিক্ষারও ব্যাপার আছে, মঞ্চের ব্যাপার আছে, দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার আছে, বোঝার ব্যাপার আছে। দেখবেন এখনকার যারা অভিনয় করেন তাদের মধ্যে এসব নেই। এলাম, করলাম তারপর হারিয়ে গেলাম। আর একটু ভিউ হইলে মনে করে যে ‘আমরা তো হয়েই গেলাম সব!’ কিন্তু ভিউটা তো বেশিদিন থাকে না, এখনকার পোলাপান এসব বুঝতেই চায় না। তাই কেউ আর এখন মোশাররফ বা চঞ্চল হতে পারছে না।

জাগো নিউজ : শোবিজে সাম্প্রতিক সময়ে নানা ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা শোবিজকে সমালোচিত করছে। এই ব্যাপারগুলো আপনি কীভাবে দেখেন?শামীম জামান : এই জেনারেশনের ছেলেমেয়ে তো, এদের সম্পর্কে বলা খুব মুশকিল! এরা তো বোঝে না ব্যাপারটা। না বুঝে এগুলা করে। আর ফেসবুকে এমন একটা জিনিস, যা খুশি একজন লিখল, যা খুশি একটা ছবি দিয়ে দিলো... সেগুলো নিয়েই শুরু হয়ে যায় হইচই। অনেক কিছুই হচ্ছে এখন। এই করতে করতে ভালো শিল্পীও দাঁড়াবে না, ভালো কিছু দাঁড়াবে না। হয়তো কিছুই করার নেই। এভাবেই মানিয়ে নিতে হবে। অথবা দেয়ালে পিঠ ঠেকলে হয়তো এসব থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করবে সবাই।

জাগো নিউজ : শোবিজে কাজের দারুণ একটি প্লাটফর্ম এখন ওটিটি। সেখানে কবে আপনাকে দেখা যাবেশামীম জামান : ওটিটির কাজ তো করার ইচ্ছা আছে। সেখানে অনেক এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করা যায়। আমিও আগ্রহী। কিন্তু অভিনয় করতে চাইলে আমাকে তো ভালো চরিত্র পেতে হবে। আমাকে যদি অভিনয়ে নেয় আমি করবো। 

এমআই/এলআইএ