দেশজুড়ে

সহকারীর ওপর প্রধান শিক্ষকের ভার, ব্যাহত পাঠদান

প্রধান শিক্ষক নেই ৮৯৪ বিদ্যালয়ে সহকারীরা বহন করছেন অতিরিক্ত চাপ মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা

কুমিল্লার প্রায় অর্ধেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। জেলার দুই হাজার ১০৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৯৪টিতে প্রধান শিক্ষক নেই, যা মোট বিদ্যালয়ের ৪২ দশমিক ৪২ শতাংশ। একইসঙ্গে সহকারী শিক্ষকের ৯৭০টি পদও শূন্য থাকায় পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংকট।

Advertisement

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সহকারী শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ। এর প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের শেখার মানে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ না দিলে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।

আরও পড়ুন আন্দোলন স্থগিত করে শাহবাগ ছাড়লেন প্রাথমিকের সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা

এই সংকটের বাস্তব চিত্র দেখা যায় কুমিল্লা সদর উপজেলার উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শতবর্ষী এই বিদ্যালয়ে গত ১০ বছর ধরে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এসময়ে পর্যায়ক্রমে পাঁচজন সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম।

‘নিয়মিত শ্রেণি পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, আর্থিক ও দাপ্তরিক সব কাজই আমাকে সামলাতে হয়। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই পাঠদানে সময় ও মনোযোগ কমে যায়। ফলে শিক্ষার্থীরাও প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে’—ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক

Advertisement

বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ২২৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ছয়জন শিক্ষক কর্মরত। ২০২৪ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন মঞ্জুরুল আলম।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘নিয়মিত শ্রেণি পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, আর্থিক ও দাপ্তরিক সব কাজই আমাকে সামলাতে হয়। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই পাঠদানে সময় ও মনোযোগ কমে যায়। ফলে শিক্ষার্থীরাও প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

আরও পড়ুন আগস্টেই যোগদান চান প্রাথমিকের নতুন শিক্ষকরা, কর্মসূচিতে অনড়

বিদ্যালয়ে দ্রুত একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় আরও একজন সহকারী শিক্ষক দেওয়ার দাবি জানান মঞ্জুরুল আলম।

উত্তর রসুলপুরের মতো একই চিত্র জেলার আরও ৮৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কোথাও সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, আবার কোথাও সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য থাকায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এতে শিক্ষকের দায়িত্ব বণ্টন, পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিখন কার্যক্রম তদারকি, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক প্রতিবেদন প্রস্তুত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

Advertisement

‘প্রাথমিক শিক্ষার সংকট দূর না করে দেশের উন্নয়ন সম্ভব না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক থাকা জরুরি। একই সঙ্গে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন হেড ক্লার্কও প্রয়োজন’—শিক্ষক নেতা

কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, জেলায় দুই হাজার ১০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের জন্য অনুমোদিত প্রধান শিক্ষকের পদের সংখ্যা দুই হাজার ১০৭টি হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র এক হাজার ২১৩ জন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ৮৯৪টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ জেলার ৪২ দশমিক ৪২শতাংশ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৩ হাজার ৩৮৯টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১২ হাজার ৪১৯ জন। অর্থাৎ ৯৭০টি সহকারী শিক্ষকের পদ এখনো শূন্য রয়েছে।

আরও পড়ুন অক্টোবরের মধ্যে প্রাথমিকের ১৪ হাজার শিক্ষকের যোগদান: মন্ত্রণালয়

শূন্যপদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৪১টি, সহকারী শিক্ষক ১১টি; লাকসামে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৩২টি, সহকারী শিক্ষক ৩৪টি; দেবিদ্বারে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৯৩টি, সহকারী শিক্ষক ১২৪টি; মুরাদনগরে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৯৪টি, সহকারী ৯৩টি; দাউদকান্দিতে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৬০টি, সহকারী ৯২টি; চৌদ্দগ্রামে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৬৭টি, সহকারী ৭৩টি; ব্রাহ্মণপাড়ায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৬০টি সহকারী ৩৯টি; বরুড়ায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৩৫টি, সহকারী ১২৭টি; বুড়িচংয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৪৩টি; চান্দিনায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৪৬টি, সহকারী ৬০টি; হোমনায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৫৪টি, সহকারী আটটি; নাঙ্গলকোটে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৯৫টি, সহকারী ৭৭টি; মেঘনায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ২৯টি, সহকারী ২৮টি; মনোহরগঞ্জে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৩৩টি, সহকারী ২৮টি; তিতাসে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৩৮টি, সহকারী ৫৫টি; সদর দক্ষিণে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৩৪টি, সহকারী ১৭টি এবং লামাই উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ২২টি এবং সহকারী শিক্ষক ৪২টি।

‘দেশের বিভিন্ন জেলার ৪০০টিরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কাজ করেছি। ৩০ শতাংশ বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য দেখেছি। সে হিসেবে শিক্ষকদের সুখ-দুঃখের অনেক গল্প শুনেছি। তার মধ্যে অন্যতম শিক্ষক সংকট’

উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০১৬ সালে একবার ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছি। এরপর ২০২৪ সালে আবারও দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত শ্রেণি পাঠদানও চালিয়ে যাচ্ছি। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের পাঠদানেও পড়ে। আমরা চেষ্টা করলেও তারা প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হয়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্রুত প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করা প্রয়োজন।’

বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মিয়া। আলাপকালে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক না থাকলে সহকারী শিক্ষকদের ওপর লোড পড়ে বেশি। যে কারণে তারা ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ঠিকভাবে পাঠদান করাতে পারেন না।’

তিনি মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষার সংকট দূর না করে দেশের উন্নয়ন সম্ভব না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক থাকা জরুরি। একই সঙ্গে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন হেড ক্লার্কও প্রয়োজন।

আরও পড়ুন পাবনায় ২৩ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে শোকজ

লাল-সবুজ উন্নয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি কাওসার আলম সোহেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলার ৪০০টিরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কাজ করেছি। ৩০ শতাংশ বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য দেখেছি। সে হিসেবে শিক্ষকদের সুখ-দুঃখের অনেক গল্প শুনেছি। তার মধ্যে অন্যতম শিক্ষক সংকট।’

‘প্রাথমিক শিক্ষা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেখানে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকা মানে সহকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া। এ কারণে শিক্ষকরা যখন ক্লাসে নিজের বিষয় শেষ করে অতিরিক্ত বিষয় পড়াতে যান, তখন ঠিকমতো মনোনিবেশ করতে না পারাটা স্বাভাবিক’

তিনি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক না থাকলে সহকারী শিক্ষকদের পরিশ্রম বেড়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে শ্রেণি পাঠদানে। অনকে সময় দেখা যায় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ফাঁকা। কমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়া-লেখার মান ঠিক রাখতে প্রর্যন্ত শিক্ষক প্রয়োজন।’

তবে শুধু কুমিল্লায় না, সারাদেশেই অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য রয়েছে বলে জানান কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মনছুর আলী চৌধুরী।

তিনি বলেন, ২০১৯ সালের পর থেকে সিনিয়র শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষাকার্যক্রমে আমরা কোনো ধরনের সমস্যা মনে করি না। কারণ এটা আমার কাছে বড় ধরনের সংকট মনে হয় না।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে শিক্ষা অফিসার বলেন, ‘১৯৯৭ সালে আমি যখন সিলেটে চাকরি করি, তখন একজন বা দুজন শিক্ষকের পদ ছিল বেশিরভাগ বিদ্যালয়েই। তখন আমরা দেখেছি পড়াশোনা এত খারাপ ছিল না। সে হিসেবে আমার কাছে মনে হয় কুমিল্লায় পর্যাপ্ত। এতে পড়ালেখার ক্ষতি হচ্ছে না বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে।’

আরও পড়ুন এমপিও শিক্ষকদের বদলি আবেদন শুরু কবে, কী করছে মাউশি

এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাৎ হোসেনের ভাষ্য, ‘প্রাথমিক শিক্ষা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেখানে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকা মানে সহকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া। এ কারণে শিক্ষকরা যখন ক্লাসে নিজের বিষয় শেষ করে অতিরিক্ত বিষয় পড়াতে যান, তখন ঠিকমতো মনোনিবেশ করতে না পারাটা স্বাভাবিক। এতে কমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।’

তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এনে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে হবে। এসআর/এএসএম