বিনোদন

সময় থামাতে পারেনি যাকে, মৃত্যুর পরও অমর সত্যজিৎ

সময়ের স্রোত অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তবে বাঙালির অনুভূতিতে আজও অমলিন এক নাম সত্যজিৎ রায়। মৃত্যু তাকে থামাতে পারেনি। তার সৃষ্টির ভেতর দিয়েই তিনি আজও জীবন্ত, প্রাসঙ্গিক এবং প্রেরণার উৎস। আজ এই মহান নির্মাতার মৃত্যুদিন।

Advertisement

১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তবে তার কাজ, চিন্তা ও শিল্পদর্শন সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও সমানভাবে আলো ছড়াচ্ছে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে আধুনিক ভাষা ও নন্দনতত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য, যা তাকে বিশ্ব চলচ্চিত্রেও অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদীর মসুয়া গ্রাম ছিল তার পূর্বপুরুষদের নিবাস। শিল্প-সাহিত্যসমৃদ্ধ এক পরিবারে জন্ম নেওয়া সত্যজিতের শিল্পবোধের ভিত গড়ে ওঠে ছোটবেলা থেকেই। তার দাদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন খ্যাতিমান লেখক ও চিত্রকর, আর বাবা সুকুমার রায় বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মায়ের স্নেহ ও প্রেরণায় অল্প বয়সেই জীবনের পথে এগিয়ে যেতে শেখেন তিনি।সৌমিত্র চ্যাটার্জির চুলের মেকাপ করে দিচ্ছেন সত্যজিৎ রায়

কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা শেষে শান্তিনিকেতনে চারুকলার শিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানেই তার দৃষ্টিভঙ্গিতে আসে গভীরতা ও শিল্পবোধের পরিপূর্ণতা। পরবর্তীতে বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা এবং বিদেশি চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ তার সৃজনশীলতাকে নতুন দিশা দেয়। তখনই তিনি চলচ্চিত্রকে নিজের প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন।

Advertisement

এই পথচলার প্রথম বড় মাইলফলক ‘পথের পাঁচালী’। গ্রামীণ জীবনের নিখাদ বাস্তবতা, মানবিক আবেগ ও নিসর্গের মেলবন্ধনে নির্মিত এই চলচ্চিত্র বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ায়। অপু-দুর্গার শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরেন, যা দর্শকের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে। পরবর্তীতে ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’- এই তিনটি চলচ্চিত্র মিলেই গড়ে ওঠে বিখ্যাত অপু ট্রিলজি।মহানায়ক উত্তমকুমারের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়

এরপর একের পর এক কালজয়ী চলচ্চিত্র উপহার দেন তিনি। ‘জলসাঘর’, ‘পরশ পাথর’, ‘দেবী’তে সমাজের নানা দিক তুলে ধরেন সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে। শহুরে জীবনের টানাপোড়েন উঠে আসে ‘মহানগর’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জনঅরণ্য’তে। আবার ‘চারুলতা’, ‘নায়ক’ কিংবা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য় ব্যক্তিমানুষের অন্তর্জগৎ ফুটে ওঠে গভীর সংবেদনশীলতায়। অন্যদিকে ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ও ‘হীরক রাজার দেশে’তে রসিকতার আড়ালে তিনি তুলে ধরেন সমাজ ও রাষ্ট্রের তীক্ষ্ণ বাস্তবতা।অবসরে সত্যজিৎ রায়

তার চলচ্চিত্রে আলো-ছায়ার ব্যবহার, নীরবতার গভীরতা এবং সংগীতের মেলবন্ধন তৈরি করেছে এক স্বতন্ত্র ভাষা। তিনি প্রমাণ করেছেন, চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি জীবনের প্রতিচ্ছবি, সময়ের দলিল এবং মানুষের অনুভূতির এক শক্তিশালী প্রকাশ।

আজও সত্যজিৎ রায় কেবল একজন নির্মাতা নন, তিনি এক দর্শন। একটি চেতনা। নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও দর্শকদের কাছে তিনি অনুপ্রেরণার এক অবিনাশী নাম। তার সৃষ্টি সময়ের সীমানা পেরিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।

Advertisement

 

এলআইএ