আন্তর্জাতিক

ইরান-মার্কিন সমঝোতার সুরক্ষা-কবচ ও বৈধতার চাবিকাঠি ১৪ নম্বর শর্ত

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ (MoU)-এর পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করেছে ইসলামিক রিপাব্লিক নিউজ এজেন্সি (ইরনা)। নথিতে যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি সচল এবং ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনসহ বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

Advertisement

ভিন্ন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ১৪ দফা শর্তের ভিত্তিতে এই সমঝোতা স্মারক ইলেক্ট্রনিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই ১৪ দফা শর্তের শেষ দফায় বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UN Security Council) একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাব দ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হবে।

এই ১৪ নম্বর শর্তটিকে সহজ ভাষায় বললে, এর অর্থ হলো : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে চূড়ান্ত চুক্তি হবে তা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে সেটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবে। ফলে চুক্তিটির আন্তর্জাতিক বৈধতা ও গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে এবং নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্যও এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হবে।

চুক্তি (Treaty) ও সমঝোতা স্মারক (MoU)

Advertisement

১৪ নম্বর শর্তটি এবারের যুদ্ধের সমাধানকে আলাদা গুরুত্ব এনে দিয়েছে। এর কারণ- নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলো এবং জাতিসংঘের অধীনে তা স্বাক্ষর হলে উভয় দেশের জন্য তা মেনে চলতে আইনগতভাবে বাধ্যবাধকতার সৃষ্টি করবে।

Treaty (চুক্তি) হলো দুই বা ততোধিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত একটি আনুষ্ঠানিক ও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি। এটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পরিচালিত হয় এবং স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোকে এর শর্তাবলি মেনে চলতে হয়।

এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে কোনো পক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করলে সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায় এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে অন্য পক্ষ।

এ চুক্তির (Treaty) কিছু বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বাধ্যতামূলক হয়, সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান/সরকার প্রধান স্বাক্ষর করেন, অনেক দেশে পার্লামেন্টের অনুমোদন লাগে এবং চুক্তি ভঙ্গ করলে কূটনৈতিক ও আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়। উদাহরণ-পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের জন্য ১৯৬৮ সালে এনপিটি চুক্তি।

Advertisement

সমঝোতা স্মারক (MoU)- এর উদ্দেশ্যে হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা যা অনেকটা নমনীয় এবং পরিবর্তন করা সহজ। এর মাধ্যমে উভয় পক্ষ ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরি করে এবং পরবর্তীতে চুক্তির (treaty) পথ প্রশস্ত করে।

তবে, এক্ষেত্রে সাধারণত আইনগত বাধ্যতাবাধকতা থাকে না এবং সমঝোতা ভঙ্গ করলে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করা যায় না। যেমন-বিদ্যুৎ আমদানি, গ্রিড সংযোগ ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ-ভারত একাধিক MoU স্বাক্ষর করেছে।

এক কথায় বললে, MoU সাধারণত ভবিষ্যতের চুক্তি করার ভিত্তি, আর Treaty হলো চূড়ান্ত ও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তি।

সমঝোতা স্মারক: ইরানের ১৪ দফা শর্ত

১) যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা সব ফ্রন্টে, বিশেষ করে লেবাননে, সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছে। উভয় পক্ষ ভবিষ্যতে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

২) লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা।

৩) উভয় দেশ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। পারস্পরিক সম্মতিতে আলোচনার সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।

৪) সমঝোতা স্বাক্ষরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ও সামুদ্রিক বাধা অপসারণ শুরু করবে। ৩০ দিনের মধ্যে অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

৫)ইরান ৬০ দিনের জন্য পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রনালি পরিচালনা নিয়ে ওমান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে তেহরান।

৬) যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত হবে।

৭) যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা এবং একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

৮) পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না বলে জানিয়েছে ইরান। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উভয় পক্ষ আলোচনা করবে।আন্তর্জাতিক International Atomic Energy Agency–এর তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই ইউরেনিয়াম নিম্ন মাত্রায় সমৃদ্ধকরণ করার বিষয়টি সম্ভাব্য ন্যূনতম পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৯) চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচির অবস্থা বজায় রাখবে। যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করবে না।

১০) মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দেবে।

১১) ইরানের জব্দ বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের সুযোগও উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

১২) এই সমঝোতা স্মারক (MoU)-এর সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতে চূড়ান্ত চুক্তির শর্তাবলি যথাযথভাবে মেনে চলা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নির্বাহী (কার্যকরী) তদারকি ব্যবস্থা গঠন করা হবে।

১৩) এই সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের পর এবং এর ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু হওয়া ও সেই বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকার শর্তে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র অন্যান্য অনুচ্ছেদসমূহ নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তি প্রণয়নের লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করবে।

সূত্র: ইরনা/আনাদোলু এজেন্সি/এনজিএম/ক্যামব্রিজ ডিকশনারি

কেএম