কড়া নিরাপত্তা, দীর্ঘ প্রটোকল আর জনসাধারণ থেকে দূরত্ব- ক্ষমতার সঙ্গে সাধারণত জড়িয়ে থাকে এমন ছবি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড সেই চিরাচরিত ধারণার বাইরে দিচ্ছে ভিন্ন এক রাজনৈতিক বার্তা।
Advertisement
ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই নিরাপত্তা প্রটোকলের গাড়িবহর কমান। অফিস থেকে ফেরার সময় প্রায়ই দেখা যায় স্টিয়ারিং নিজের হাতে। পাশে থাকছেন কখনো স্ত্রী-কন্যা, কখনো এমপি-মন্ত্রী। ব্যাগ নিজের কাঁধে নিয়েই অংশ নিচ্ছেন সরকারি কর্মসূচিতে।
সরকারি কার্যক্রমেও অংশ নিচ্ছেন সাধারণ প্যান্ট-শার্ট পরে। তার সাদা শার্ট এরই মধ্যে আইকনিক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। জিন্স-পলো টি-শার্ট আর কেডস পরে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরছেন অহরহ। প্রবল বর্ষণের মধ্যেও ছাতা নিজেই ধরে হাঁটছেন। স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে হুটহাট চলে যাচ্ছেন সিনেমা হলে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশি উদ্যোক্তার আবিষ্কার গো-কার্ট কিংবা কাভার্ডভ্যানও চালাতে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীকে।
প্লেন থেকে নেমে নিজের ব্যাগ কাঁধে নিয়েই হাঁটছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
Advertisement
এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও তৈরি করেছে নতুন আলোচনা।
আরও পড়ুন সচিবালয় থেকে হেঁটে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গেলেন প্রধানমন্ত্রীপ্রধানমন্ত্রী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি কক্সবাজার সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই প্রায় ১৯৭ কিলোমিটার পথ গাড়ি চালিয়েছেন। গাড়ির সামনের আসনে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পেছনের আসনে ছিলেন ডা. জুবাইদা রহমান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন দৃশ্য সচরাচার দেখা যায় না।
একজন নাগরিক হিসেবে তিনি নিজে গাড়ি চালাচ্ছেন নাকি তার চালক তাকে অফিসে নিয়ে যাচ্ছেন, সেটি মূল বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তিনি জনগণের জন্য কী কাজ করছেন। তার এই স্বাভাবিক আচরণ সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়।-রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন
এর আগে গত ৭ মে প্রশাসন ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সচিবালয় থেকে নিজেই গাড়ি চালিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে যান প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন সময়ে তার ব্যক্তিগত ও সরকারি সফরের ছবিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। সচিবালয় থেকে ওসমানী উদ্যানের সব অনুষ্ঠানে তারেক রহমানকে হেঁটেই যেতে দেখা যায়। এমনকি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে তিনি হাজির হন সাধারণ পোশাকে।
Advertisement
জনসভা মঞ্চে সাধারণ পোশাকে তারেক রহমান
তবে মানুষের বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে অন্য একটি বিষয়, সেটা হলো নিজের ব্যাগ নিজে বহন করা। সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানদের ব্যক্তিগত সামগ্রী বহনের জন্য আলাদা কর্মকর্তা বা সহকারী থাকেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে দেখা অনেকের কাছেই ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে।
এসব বিষয় প্রধানমন্ত্রীর শো-অফ, উদারতা, সাশ্রয়ী মানসিকতা নাকি দীর্ঘদিন প্রবাস জীবনের প্রাত্যহিক অভ্যাস তা নিয়ে আছে বিস্তর আলোচনা। তবে আলোচনা-সমালোচনা যাই থাক, বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে এমনটা আগে খুব দেখা যায়নি।
আরও পড়ুন কলেজছাত্রের বানানো গো-কার্ট চালিয়ে উৎসাহ দিলেন প্রধানমন্ত্রীরাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব বিষয় কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, নেতৃত্বের প্রতিটি আচরণই এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে যখন সেই ব্যক্তি রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকেন।
সংসদে উপস্থিতিও সাধারণ পোশাকে
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার আচরণের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার করছেন। তিনি সাধারণ মানুষের রাজনীতি করেন এবং সাধারণ মানুষের ভাবনা ধারণ করেন। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাংলাদেশে নতুন নয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মধ্যেও আমরা এর প্রতিফলন দেখেছি। মাওলানা ভাসানী কিংবা কমরেড মণি সিংহের জীবনাচরণেও সেই সরলতা ছিল।’
তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরেই গাড়ি চালাতে পছন্দ করেন জানিয়ে মোহন বলেন, ‘তবে একজন নাগরিক হিসেবে তিনি নিজে গাড়ি চালাচ্ছেন নাকি তার চালক তাকে অফিসে নিয়ে যাচ্ছেন, সেটি মূল বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তিনি জনগণের জন্য কী কাজ করছেন। তার এই স্বাভাবিক আচরণ সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গো-কার্ট চালাচ্ছেন তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রীর পোশাক-পরিচ্ছদেও অনেকেই একই ধরনের বার্তা খুঁজে পান। ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে বসার পরও তাকে প্রায়ই দেখা যায় সাধারণ শার্ট-প্যান্টে। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রকাশ অনেক সময় বাহ্যিক আয়োজনের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়, সেখানে তার সাদামাটা উপস্থিতি একটি আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। শার্টের রং সব সময় থাকে সাদা। ইন করতেও খুব কম দেখা যায় প্রধানমন্ত্রীকে। অধিকাংশ সময় শার্ট ছেড়েই পরেন। প্রধানমন্ত্রীর মতো শার্ট পরে মাঝে আলোচনায় আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা হামীম। হামীমের মতো অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর এ স্টাইল ফলো করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের দেশে অতীতে প্রধানমন্ত্রীদের ক্ষেত্রে যেভাবে কঠোর প্রোটোকল অনুসরণ করা হতো, যান চলাচল সীমিত বা বন্ধ রাখা হতো এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে রাখার প্রবণতা দেখা যেত, সেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন।’
আরও পড়ুন স্পোর্টস কার ও কাভার্ড ভ্যান চালিয়ে দেখলেন প্রধানমন্ত্রীবর্তমান প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের একজন সাধারণ দায়িত্বশীল ব্যক্তির মতো আচরণ করছেন জানিয়ে বলেন, ‘কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন। জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য কী প্রয়োজন তা তিনি সরাসরি খোঁজ নিচ্ছেন। নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকা ও প্রয়োজন হলে সময়ের পরও দায়িত্ব পালন করার বিষয়টিও তিনি অনুসরণ করছেন। এমনকি কখনো নিজেই গাড়ি চালানো এবং নিজের ব্যাগ নিজে বহন করার মতো কাজের মধ্য দিয়ে তিনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা বাংলাদেশে অনন্য।’
ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘অতীতে ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সাধারণত ভিন্ন চিত্র দেখা যেত, যেখানে তাদের অনেক কাজ অন্যরা করে দিত। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সে চর্চায় পরিবর্তন এনেছেন। তিনি পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ধারা বা ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির মতো নেতৃত্বের একটি রীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতাসীনদের অনেক সময় পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, সামাজিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয় ব্যস্ততার কারণে উপেক্ষিত হয়। কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রীও মানুষ, তিনিও স্বাভাবিক জীবনযাপন করবেন, এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন।’
সম্প্রতি কক্সবাজার সফরের আরেকটি মুহূর্তও আলোচনায় আসে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে উড়োজাহাজ থেকে নামার সময় দেখা যায়, একজন কর্মকর্তা ছাতা ধরে থাকলেও প্রধানমন্ত্রী নিজেই ছাতার হাতল ধরে হাঁটছেন। দৃশ্যটি ছিল একেবারেই সাধারণ। কিন্তু সেই সাধারণত্বই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা কুড়ায়। এ ঘটনা আগেও দেখা গেছে। স্ত্রীর মাথায় ছাতা ধরেও কর্মসূচিতে যোগ দিতে যেতে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীকে।
দেশে তৈরি কাভার্ডভ্যানে চালকের আসনে প্রধানমন্ত্রী
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক বিশ্বে নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মানুষের সঙ্গে আবেগগত সংযোগ তৈরি করা। নাগরিকরা এখন শুধু একজন প্রশাসককে দেখতে চান না, তারা জানতে চান নেতা হিসেবে তিনি কতটা মানবিক, কতটা স্বাভাবিক এবং কতটা তাদের মতো।
আরও পড়ুন স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চালালেন প্রধানমন্ত্রীবিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এমন উদাহরণও রয়েছে। উরুগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসে মুজিকা রাষ্ট্রপতির প্রাসাদে না থেকে নিজের খামারবাড়িতে বসবাস করতেন এবং নিজেই পুরোনো গাড়ি চালিয়ে চলাফেরা করতেন। সেই জীবনধারাই তাকে বিশ্বজুড়ে ‘জনতার রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে পরিচিতি দেয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাধারণ দেশি চরকার বোনায় কাপড় জড়িয়ে পরতে দেখা যায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির স্টাইলিশ টি-শার্ট-জ্যাকেটও অনেকটা স্রোতের বিপরীতের পোশাক বলা যায়। ইউরোপ কিংবা পশ্চিমা সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে এ ধরনের পোশাক সাধারণত দেখা যায় না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক দৃশ্যগুলোও অনেকের কাছে একই ধরনের রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। নিজে গাড়ি চালানো, নিজের ব্যাগ নিজে বহন করা, সাধারণ পোশাকে জনসম্মুখে আসা কিংবা প্রটোকলের চেয়ে স্বাভাবিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া—এসব আচরণকে অনেকেই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
কারণ রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি ছবি, একটি মুহূর্ত কিংবা একটি সাধারণ আচরণই হাজারো বক্তব্যের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ক্ষমতার প্রচলিত প্রতীকের বিপরীতে এই চিত্র অনেকের কাছে এক নতুন বার্তা বহন করছে। নেতৃত্ব মানে শুধু কর্তৃত্ব নয়, নেতৃত্ব মানে মানুষের কাছাকাছি থাকা।
সাধারণ মানুষ কীভাবে দেখছেনরাজধানীর ইস্কাটনের ফার্মেসি ব্যবসায়ী হাসিবুল ইসলাম সোহাগ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সরল জীবনযাপন একটি ইতিবাচক ও গ্রহণযোগ্য গুণ। তবে আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী যদি দেশে সুশাসন, স্বচ্ছতা, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিতামূলক একটি শাসনব্যবস্থা উপহার দিতে পারেন তবেই তার এ সরলতা সত্যিকার অর্থেই ইতিবাচক হিসেবে প্রমাণিত হবে।
ঢাকার সড়কে স্ত্রীকে পাশে বসিয়ে স্টিয়ারিং হাতে তারেক রহমান
প্রেসক্লাবের সামনে চায়ের দোকানি মো. সবুজ বলেন, আমার কাছে ভালো লাগে। প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি নিজে গাড়ি চালান, নিজের ব্যাগ নিজে বহন করেন।
ঢাকা শহরের রিকশাচালক গফুর মোল্লা বলেন, ঢাকার শহরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গাড়ি চালায়, আমিও রিকশা চালাই। আমার মনে হয় তিনি আমাদের কষ্ট বোঝার জন্য এগুলো করেন। ব্যাগ কাঁধে ঘুরে বেড়ায় এখনো এমন কোনো প্রধানমন্ত্রীকে আমি দেখিনি।
কবি আকাশমনি বলেন, প্রথমে অনেকেই মনে করেছিলেন, এটি হয়তো ভাইরাল হওয়ার একটি চেষ্টা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিজে গাড়ি চালানো, নিজের ব্যাগ নিজে বহন করা এবং সাধারণ জীবনযাপন তার নিয়মিত অভ্যাসেরই অংশ। ফলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হয়েছে।
তবে শুধু সরল জীবনযাপন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমেও তিনি জনগণের আস্থা ধরে রাখবেন বলে প্রত্যাশা।
কেএইচ/এএসএ/এসএফএ