জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ধামরাইয়ে পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থী আফিকুল ইসলাম সাদের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগের ৮২ নেতাকর্মীর নাম থাকলেও কোনো পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
Advertisement
জানা যায়, চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানে ছাত্র জনতার প্রতিরোধের মুখে ঢাকার ধামরাইয়ে জুলাই মাসেই মাঠ ছেড়ে পালায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। সেই সময় মাঠে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ৫ আগস্ট ‘মার্চ ফর ঢাকা’ মিছিলে ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় চলে পুলিশের তাণ্ডব।
আরও পড়ুন জামায়াত নেতা নজরুল ইসলাম / জুলাই গণঅভ্যুত্থান ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের ঐতিহাসিক অধ্যায়ওই দিন উপজেলার শরীফবাগ এলাকায় এক নারীর গুলিবিদ্ধের খবরে তৈরি হয় উস্কানি। ক্ষুব্ধ জনতা বিক্ষোভ করে থানার দিকে রওনা হয়। সেই মিছিল ধামরাই থানার অদূরে হার্ডিঞ্জ স্কুল এলাকা দিয়ে চলাকালে মিছিলের ওপর গুলি করতে থাকে পুলিশ। সেখানেই গুলিবিদ্ধ হন শিক্ষার্থী আফিকুল ইসলাম সাদ। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ধামরাই পৌরসভার শফিকুল ইসলামের ছেলে।
এ ঘটনায় তার নানা আজিম উদ্দিন বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকা-২০ ধামরাই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদসহ আওয়ামী লীগের ৮২ নেতাকর্মীর নামে হত্যা মামলা করেন। গুলি পুলিশ করলেও এতে নাম আসেনি জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের।
Advertisement
এতে ক্ষুব্ধ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা। তাদের দাবি, মূল অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করার।
গুলির ঘটনার সময় আফিকুল ইসলাম সাদের সঙ্গে ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাকিব। তিনি সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘সকাল বেলা শরীফবাগ সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ এক মহিলাকে গুলি করে। এই খবর পেয়ে আমরা বের হই। একপর্যায়ে থানার দিকে যাই। তখনই পুলিশ গুলি করতে শুরু করে। সাদ সঙ্গেই ছিল। একপর্যায়ে সে বললো, সাকিব নিচু হয়ে থাকো, নাহয় মাথায় গুলি লাগবে। এই কথা শোনার ২ মিনিটের মধ্যে আমি তার থেকে প্রায় ১০ ফিট দূরে আছি। তখন দেখি একজন পড়ে আছে। ভিড়ে খেয়াল করিনি। যখন দেখছি, দেখি সাদ। পুলিশ যখন গুলি বন্ধ করলো, সাদকে ধরে নিয়ে গেলাম। তখন ওর মাথা থেকে এত রক্ত বের হচ্ছিল, গামছা বা অন্য কিছু দিয়ে চাপ দিয়ে কুলাতে পারছি না। গুলি লাগছিল কপালের ওপর। পুলিশই গুলি করছে।’
আরও পড়ুন জুলাই গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসের অনন্য ঘটনা: নাহিদতিনি আরও বলেন, ‘গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথম তাকে নিয়ে ইসলামপুর হাসপাতালে গেলাম। এরপর গণস্বাস্থ্যে এরপর সাভার গেছি। তখন পুলিশ গাড়িতেও গুলি করে। প্রায় ৩ ঘণ্টা হয়রানি হই। পরে পরিবারের সদস্যদের ফোন করি। তারা ইসলামপুরে যায়। এরপর এনাম মেডিকেলে যাই। আমরা একসঙ্গে চলতাম। হুট করে এই মানুষটার এ অবস্থা কিছু করতে পারিনি।’
পুলিশের গুলির বিবরণ দিয়ে আফিকুল ইসলাম সাদের বাবা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘৫ আগস্ট সকালে মিছিলে অংশ নিয়ে যখন হার্ডিঞ্জ স্কুলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, এ সময় হার্ডিঞ্জের পাশেই থানা, থানা থেকে পুলিশ বেরিয়ে, সেই মিছিলে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। সেই গুলিতে আফিকুল ইসলাম সাদ কপালে গুলিবিদ্ধ হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে আফিকুল ইসলাম সাদ ৮ আগস্ট সকালে শাহাদাত বরণ করে ‘
Advertisement
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধামরাই উপজেলার আহ্বায়ক উজ্জ্বল ইসলাম বলেন, ‘লং মার্চ টু ঢাকা ঘোষণার পর শরীফবাগ এলাকায় পুলিশ গুলি করে। তারই প্রতিবাদ হিসেবে জনতা থানা ঘেরাও করে। হার্ডিঞ্জ স্কুলের মোড় থেকে যখন জনতা থানামুখী হয়, তখনই পুলিশ গুলি করতে থাকে। একপর্যায়ে সাদ নামে আমাদের একজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসারত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। আরও দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তৎকালীন থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের নামে কোনো মামলা হয়নি। আর এসবের নির্দেশদাতারা অর্থাৎ ওই ঘটনার আগে ১৬, ১৭, ১৮ জুলাই আওয়ামী লীগের যেসব নেতারা আমাদের আন্দোলন ধ্বংস করতে চেষ্টা করে, তাদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমরা চাই, এই হত্যাকাণ্ডের যারা মূল আসামি তাদের নথিভুক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হোক বিচার করা হোক। প্রশাসনের লোকজনেরও বিচার করা হোক। এটা অত্যন্ত জরুরি।’
ধামরাই থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিরাজুল ইসলামের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তিনি আত্মগোপনে যান। বর্তমানে তার অবস্থান সম্পর্কেও কোনো তথ্য জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশ বলছে, এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত এখনও চলমান। তদন্তের পর জড়িতদের নাম যুক্ত করে দেওয়া হবে প্রতিবেদন।
ঢাকা জেলার সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কাউকে যদি এজাহারনামীয় আসামি না করা হয়, আর তদন্তে যদি কোনো পর্যায়ে গিয়ে কোনো ব্যক্তির ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা তার নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে। মামলাটি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে। ইতোমধ্যে এ মামলায় এজাহারনামীয় ২৫ জনসহ মোট ৯৩ জনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মাহফুজুর রহমান নিপু/এসজেডএইচ/জেআইএম