মতামত

একদিকে ক্ষুধার লড়াই, অন্যদিকে কোটিপতির উত্থান

অনেকের মনেই এখন একই প্রশ্ন—একই অঙ্কের বেতন পেয়েও গত কয়েক মাস ধরে কেন মাসের শুরুতেই টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে? বেতনের টাকায় অবশ্য মধ্যবিত্তের পুরো মাস কখনোই চলত না; চললেও অসম্ভব টানাটানি করে চালাতে হতো। দ্রব্যমূল্যসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এখন মাসের বেতনে দুই সপ্তাহ সংসার চালানোও অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

Advertisement

বেতন হাতে পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই অনেকের হাত প্রায় শূন্য হয়ে যাচ্ছে। মাসের শেষ সপ্তাহ পার করতে হচ্ছে ধার করে বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে। আর যাদের সেই সুযোগও নেই, তারা যে কীভাবে চলছেন, তা ধারণা করাও কঠিন।

সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষ। সব সময়ই তাই হয়—বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রথম ও সরাসরি প্রভাব এসে পড়ে এসব সাধারণ মানুষের ওপর। এছাড়া বন্যা, অতিবৃষ্টি, খরা, জ্বালানি সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, কর বৃদ্ধি ইত্যাদি নানা ধরনের সমস্যাও তো রয়েছেই। এসব সমস্যার যত ধরনের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়ে, তার দায়ও বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকেই। তাদেরই জীবনযাত্রার ব্যয় সংকুচিত হতেই থাকে, হতেই থাকে।

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির প্রভাব নতুন করে পড়েছে ঢাকার কাঁচাবাজারে। এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। বেশির ভাগ সবজির দাম কেজিতে ১০০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। মুরগি, মাছ—সবকিছুর দাম কেজিতে ৩০-৪০ টাকা বেড়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলে বাজারে জিনিসের দাম বাড়বেই, তাই বলে এতটা বাড়বে আর বাজারে কোনো মনিটরিং হবে না, সেটা কীভাবে হয়? বিক্রেতারা যে যার মতো করে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। কোনটার দাম কতটা বাড়বে, সেটা দেখার কেউ নেই। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। সাধারণ মানুষের ব্যয়ভার কমার পরিবর্তে আরও বাড়ছে।

Advertisement

জানি না, সরকার কীভাবে তার জনগণকে বর্তমান ও আগামী দিনের সংকট থেকে রক্ষা করবে। সাধারণ মানুষ অনেক কিছু চান না; শুধু দুবেলা পেটপুরে খেয়ে নিরাপদে থাকতে চান। আর প্রত্যাশা করেন, সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মনিটর করবে, যেন দ্রব্যমূল্য নাগালের অনেক বাইরে চলে না যায়।

জিনিসের দাম কেন বাড়ছে, অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তা ব্যাখ্যা করেন। তাঁরা বলছেন, শুধু মূল্যস্ফীতি নয়; বরং দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থার অদক্ষতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, উচ্চ সুদহার, স্থবির বিনিয়োগ এবং মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাব এজন্য দায়ী।

অর্থনীতিবিদরা যা-ই বলুন, মূল্যস্ফীতির হার বাড়ল, না কমল—এটা সাধারণ মানুষের জন্য কোনো বড় ব্যাপার নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাজারে জিনিসের দাম কমল কি না। কারণ কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি কমলেও যদি বাজারে গিয়ে মানুষ একই দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হন, তাহলে তাঁদের কাছে অর্থনীতির কোনো পরিসংখ্যানই স্বস্তিদায়ক হয় না।

খাদ্যবহির্ভূত খাতেও মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবহন খরচ। গত মে মাসে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা আগের মাস এপ্রিলের তুলনায় ০ দশমিক ৩৮ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো)

Advertisement

সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় সবকিছুর দামই অনেক বেশি। এখানেও অর্থনীতিবিদেরা বলেন, মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো—দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে আসা। এতেও সাধারণ মানুষের সমস্যার কোনো সমাধান হয় না। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে পরিবারের মাসিক বাজেট বলে আর কিছু থাকে না; মাসিক সঞ্চয় থাকার কথা তো ভাবাই যায় না।

অন্যদিকে একই সময়ে মানুষের বেতন বা মজুরি সেই হারে বাড়েনি। বরং বহু গার্মেন্টস, কলকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষ চাকরি বা কাজ হারিয়েছেন। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। বলা যায়, অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) গবেষণা অনুসারে, দেশের ৪০ শতাংশ পরিবারের প্রতি মাসের গড় আয় মাত্র ১৪ হাজার ৮৮১ টাকা, আর মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক গড় আয় ২৮ হাজার ৮১৮ টাকা। সংসার চালাতে এসব পরিবারের খরচ আয়ের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে বিভিন্ন কারণে দারিদ্র্যের পরিমাণ ও গভীরতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

অন্যদিকে আমাদের অর্থনীতি বা জীবনব্যবস্থার অসামঞ্জস্যতা চোখে পড়ার মতো। দেশের অধিকাংশ মানুষ যখন সংসার চালাতে গিয়ে খাবি খাচ্ছেন, ঠিক তখনই ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, তিন মাসের ব্যবধানে ২ হাজার ২০৯ জন কোটিপতি বেড়েছে।

ব্যাংক খাতের একটি সূত্র গণমাধ্যমকে বলেছেন, কোটি টাকার হিসাব মানেই কোটিপতি ব্যক্তির হিসাব নয়। কারণ ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ রাখার তালিকায় ব্যক্তি ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কেন, কীভাবে, কার টাকা বেড়েছে—এই হিসাবে না গেলেও বোঝা যাচ্ছে, কারও কারও টাকা বাড়ছে অর্থনীতির এই দুঃসময়েও।

দেশের অসংখ্য মানুষের যখন টানাটানিতে সংসার চলছে, ঠিক এরকম একটি পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ বলছে, ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ বাংলাদেশির ‘স্বাস্থ্যকর খাদ্য’ কেনার সামর্থ্য নেই, যা দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় দুজন মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই।

এই তথ্য আমাদের জন্য নিতান্ত প্রহসনের মতো। প্রতিদিন তিনবেলা পেট ভরানোর জন্য খাবার জোগাড় করাই যেখানে অনেক পরিবারের জন্য কঠিন, সেখানে এই প্রতিবেদনের ‘হেলদি ডায়েট বাস্কেট’ জোগাড় করা কতটা কঠিন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় এমন খাবারকে বোঝানো হয়েছে, যা প্রতিদিন মাথাপিছু ২ হাজার ৩৩০ কিলোক্যালরি শক্তি সরবরাহ করে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারের জন্যই এসব স্বাস্থ্যকর খাবার কেনা সাধ্যের বাইরে। মানুষের যখন আয় কমে যায়, তখন প্রথমেই তারা পুষ্টিকর খাবারকে খাদ্যতালিকা থেকে ছেঁটে ফেলেন। দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, ফল বাদ দেন। ভাত-ডাল, রুটি-সবজি বা শুঁটকি খেয়ে পেট ভরান। আমরা এখন পুষ্টিকর খাবার চাই না, চাই দুইবেলা পেটপুরে খেতে।

দারিদ্র্য যে বাড়ছে, সেই হিসাব ২০২৫ সালেই উঠে এসেছে পিপিআরসির গবেষণায়। গবেষণায় বলা হয়েছে, গত বছরের মে মাসে দেশের দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। দেশের অর্থনৈতিক ধারা এমনভাবে প্রবাহিত হচ্ছে, যা বিত্তশালীকে আরও বিত্তবান হতে সাহায্য করছে; কিন্তু সেই অর্থনীতি দারিদ্র্যপীড়িত জনগণের সামান্যতম সহায়তাও করছে না।

একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাদ্যগুণসম্পন্ন খাবার দরকার। এই খাবার কিনতে এবং খাদ্যবহির্ভূত খরচ মেটাতে যত টাকা প্রয়োজন হয়, সেই পরিমাণ আয় না থাকলে তাকে ‘দরিদ্র’ হিসেবে ধরা হয়। দেশের অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা দারিদ্র্যসীমার অনেক কাছাকাছি অবস্থান করছেন। দু-এক দিন কাজ না করলেই বা হঠাৎ কোনো দুর্যোগে তাঁরা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবেন। এই মানুষগুলোই এখন কাজ হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছেন।

তিন বছরে অতি বা চরম দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। মাথাপিছু আয় বাড়লেও দেশে দরিদ্র এবং চরম দরিদ্র—দুটিই বাড়ছে। দেশের ২৮ শতাংশ মানুষ দরিদ্র; অর্থাৎ দেশে এখন কমপক্ষে পৌনে পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। ফলে বৈষম্য প্রকট রূপ ধারণ করছে।এই অবস্থার মধ্যে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, দেশের এক কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। চলমান আন্তর্জাতিক সংকটের ফলে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে যাচ্ছেন।

জানি না, সরকার কীভাবে তার জনগণকে বর্তমান ও আগামী দিনের সংকট থেকে রক্ষা করবে। সাধারণ মানুষ অনেক কিছু চান না; শুধু দুবেলা পেটপুরে খেয়ে নিরাপদে থাকতে চান। আর প্রত্যাশা করেন, সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মনিটর করবে, যেন দ্রব্যমূল্য নাগালের অনেক বাইরে চলে না যায়।

২৬ জুলাই, ২০২৬

লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।

এইচআর/এএসএম