জাতীয়

‘যুদ্ধ যেন বাংলাদেশেই চলছে’

‌‘বয়স তো আর কম হলো না। আগামী মাসে ৬০ বছর পূর্ণ হবে। তেলের জন্য এত বড় লাইন জীবনে দেখিনি। আজ রোদে পুড়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে একটু তেলের জন্য। এই চোখ দিয়ে এদেশের অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছি। অনেক আকাল দেখেছি, দুর্যোগ দেখেছি। কিন্তু মানুষের ভেতরে এমন হাহাকার আর অস্থিরতা আগে কখনো অনুভব করিনি। মনে হচ্ছে যুদ্ধ বাংলাদেশেই চলছে।’

Advertisement

বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাজধানীর আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে পলাশীগামী সড়কে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন হাজারীবাগের বাসিন্দা মুক্তার হোসেন। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য অকটেন সংগ্রহ করতে সকাল ৯টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে তিনি নীলক্ষেতে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ‘পথের বন্ধু ফিলিং স্টেশন’-এ এসে দীর্ঘ লাইনের মুখে পড়েন।

চোখের সামনে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে গাড়ির সারি দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান। গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সামনে থেকে শুরু হওয়া প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের লাইন আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড, পলাশী বাজার পেরিয়ে নীলক্ষেত পর্যন্ত বিস্তৃত।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে মুক্তার হোসেন বলেন, ‘জানি না সামনে কী অপেক্ষা করছে। ফিলিং স্টেশনে এত যানবাহনের ভিড় দেখে মনে হয় ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ যেন বাংলাদেশেই চলছে। এই বয়সে এসে এমন দৃশ্য দেখা মানে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাওয়া।’

Advertisement

আরও পড়ুনদেশে জ্বালানি তেলের মজুত-সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে, উদ্বেগের কারণ নেই জ্বালানি সংকটে আয়-রোজগারে টান, বিপাকে রাইড শেয়ারিং চালকরা 

শুধু মুক্তার হোসেন নন, লাইনে অপেক্ষমাণ অনেকেই একই ধরনের হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি পাম্পেই শত শত মানুষ দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছেন। সকাল ৮টা থেকে তেল সরবরাহ শুরু হলেও অনেকে ফজরের নামাজ শেষে ভোরেই লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন।

যারা খুব ভোরে এসেছেন, তারা তুলনামূলক দ্রুত জ্বালানি তেল পেলেও একটু দেরিতে আসা ব্যক্তিদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে থেকে অনেকেই ক্লান্ত ও বিরক্ত। কেউ ছাতা ব্যবহার করে কিছুটা স্বস্তি পেলেও অধিকাংশ মানুষ রাস্তার পাশে বা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছেন।

Advertisement

লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে কোথাও কোথাও বাগ্‌বিতণ্ডাও দেখা যাচ্ছে। নীলক্ষেতে এক মোটরসাইকেল আরোহীকে ঘিরে এমনই একটি ঘটনা ঘটে। কয়েকজন অভিযোগ করেন, তিনি লাইনের নিয়ম ভেঙে সামনে ঢুকে পড়েছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি দাবি করেন, ভোর ৬টায় তিনি সিরিয়াল দিয়েছিলেন এবং ক্লান্ত হয়ে সাময়িকভাবে সরে গিয়ে পরে ফিরে আসেন। এ নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসেন।

জ্বালানি তেল বণ্টনে কোনো ঝামেলা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে এক পাম্প মালিক বলেন, আমরা পাম্প মালিকরা চরম অসহায়ত্বের মধ্যে আছি। ডিপো থেকে আমাদের চাহিদামতো তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। আগে যেখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার লিটার তেল পেতাম, এখন তার অর্ধেকও মিলছে না। ক্রেতারা এসে ভিড় করছেন, কিন্তু তেল না থাকায় আমরা পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছি। এতে করে সাধারণ মানুষের সাথে আমাদের ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে, অথচ সংকটের মূল কারণ আমাদের হাতে নেই।

তিনি বলেন, ডিপো পর্যায়ে তেলের লোডিংয়ে দীর্ঘ সময় লাগছে। আমাদের গাড়িগুলো দিনের পর দিন ডিপোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকছে। সময়মতো তেল না আসায় পাম্পে নোটিশ ঝোলাতে হচ্ছে ‘তেল নেই’। এর ফলে আমাদের নিয়মিত গ্রাহকরা ফিরে যাচ্ছেন এবং পাম্পের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। সরকারের উচিত আমদানিকৃত তেলের খালাস ও বণ্টন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এবং স্বচ্ছ করা।

আরও পড়ুনগ্যাস নেই, তেলের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বাড়ছে লোডশেডিং সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান 

মাঠপর্যায়ে এমন চিত্র দেখা গেলেও সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। বুধবার (১৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘চলতি এপ্রিল মাস তো বটেই, আগামী দুই মাসেও দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট তৈরি হবে না।

তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ডিজেল মজুত রয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন, পেট্রোল ১৮ হাজার ২১১ মেট্রিক টন এবং ফার্নেস অয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ মেট্রিক টন। এছাড়া জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে ১৮ হাজার ২২৩ মেট্রিক টন।

তবে সরেজমিনে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা সরকারি আশ্বাসের সঙ্গে মিলছে না। দীর্ঘ লাইন, অপেক্ষা, বিশৃঙ্খলা ও জনভোগান্তি—সব মিলিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মজুত থাকলেও যদি সঠিকভাবে সরবরাহ ও বণ্টন নিশ্চিত না হয়, তাহলে এই সংকট আরও তীব্র হতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।

সরকার বলছে সংকট নেই, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা—এই দ্বৈত চিত্রেই এখন জ্বালানির জন্য হাহাকার করছে রাজধানী।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পরিচালক (বিপণন) ও সরকারের যুগ্ম সচিব মো. সাবেত আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী। তারপরও আমরা সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রেখেছি। গত বছর এই সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের সরবরাহ ছিল এখনো একই রয়েছে। অনেকে প্যানিক বায়িং করছেন। আর অবৈধ তেলের মজুতদারদের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান চলমান।’

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস এবং পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি মনিটরিং না থাকতো তাহলে আরও বিশৃঙ্খলা ঘটতো। গত মাসে যারা অবৈধভাবে মজুত করেছিল সেই তেল এখন বের হয়ে আসছে, অভিযানে ধরা পড়ছে। মনিটরিং শুরু হওয়ার পর খোলাবাজারে আর তেল যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

আরও পড়ুনদেশে জ্বালানি তেলের মজুত-সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে, উদ্বেগের কারণ নেই জ্বালানি সংকটে আয়-রোজগারে টান, বিপাকে রাইড শেয়ারিং চালকরা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারের পদক্ষেপ সঠিক ছিল, কিন্তু সেগুলো দিয়েও কাজ হয়নি। মানুষের মাথায় যখন একটি বিষয় ঢুকে গেছে যে, শর্টেজ হতে পারে, তারা একটা প্যানিকে চলে গেছে। অনেকেই বাসায় রেখেছে যে যদি আমি তেল না পাই তাহলে এটা দিয়ে চালাবো। স্পেশালি রাইডাররা। এজন্য রাইডারদের জন্য স্পেশালি কোনো একটা ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ তাদের তো এটা জীবিকা। অন্য কেউ যেমন না পেলে হাঁটলো কিন্তু তাদের তো এটা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘সংকটের এই সময় পুরো প্রক্রিয়াটা নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। প্রতিদিন নতুন নতুন গাড়ি বিক্রি হচ্ছে, চাহিদা তো বাড়ছে। কিন্তু পেট্রোল পাম্পের সংখ্যা তো বাড়ছে না, এজন্য এগুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। যুদ্ধ নিয়ে যেহেতু নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না, সেহেতু আমাদের জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপগুলো নিতে হবে।’

সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এক লাখ টন মারবান ক্রুড আসে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হলে বাংলাদেশে ক্রুড আমদানি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বিশেষ করে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশে ক্রুড আসা।

মার্চ মাসে দুই লাখ টন ক্রুড আসার কথা ছিল। এরমধ্যে ‘নর্ডিক পোলাক্স’ নামের একটি জাহাজ এক লাখ টন ক্রুড অয়েল লোড নিয়ে ৫ মার্চ থেকে সৌদি আরবের রাসতানুরা বন্দরে আটকা পড়েছে।

আরও পড়ুনগ্যাস নেই, তেলের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বাড়ছে লোডশেডিং জ্বালানি তেল সংকটে সেচ বন্ধের শঙ্কা 

অন্য পার্সেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবলদানা বন্দর থেকে ২১-২২ মার্চ, পরবর্তীতে সূচি পাল্টে ৩১ মার্চ তারিখে এক লাখ টন ক্রুড লোড নেওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই যুদ্ধ এলাকায় মালিকপক্ষের জাহাজ পাঠানোর অনীহার কারণে ‘ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের ট্যাংকার ভ্যাসেলের যাত্রা বাতিল হয়। ফলে ক্রুড অয়েল সংকট তৈরি হয় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে।

পরে বিকল্প উপায়ে সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন ক্রুড আনার পদক্ষেপ নেয় বিপিসি। রাসতানুরা থেকে পাইপলাইন দিয়ে আসা ক্রুড অয়েল লোড নিতে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরের পথে রয়েছে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি ট্যাংকার জাহাজ।

বৈশ্বিক জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থার তথ্য বলছে, ‘এমটি নিনেমিয়া’ জাহাজটি চায়নার জোশাল বন্দর থেকে ৮ এপ্রিল ইয়ানবু বন্দরের দিকে রওয়ানা দিয়েছে। জাহাজটি ১৯ এপ্রিল সৌদি আরবের ইয়ানবু আল বাহর বন্দরে পৌঁছার কথা রয়েছে।

এমইউ/এমআরএম