ভ্রমণ

যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ: এক বিকেল, এক শহর, এক ইতিহাস

মে মাসের উজ্জ্বল রৌদ্রস্নাত দুপুরে, যখন ঘড়ির কাঁটা বারোটার সীমায় এসে থমকে দাঁড়াতে চাইছে, তখন ইন্ডিয়ানার শান্ত, সুশৃঙ্খল ও শিক্ষানগরী ওয়েস্ট লাফায়েত-এর নীরবতা ভেঙে আমরা স্বপরিবারে রওনা দিলাম ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যোর রাজধানী ইন্ডিয়ানপলিস-এর উদ্দেশে। সময়ের হিসেবে দূরত্ব খুব বেশি নয়, মাত্র এক ঘণ্টার কিছু বেশি পথ। তবে এই যাত্রা আমাদের কাছে শুধু এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়া ছিল না। মনে হচ্ছিল, আমরা ধীরে ধীরে ইতিহাসের পথে এগিয়ে চলেছি, সংস্কৃতির স্পন্দন অনুভব করছি এবং নতুন এক নগর অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কৌতূহল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি।

Advertisement

গাড়ি এগিয়ে চলল ইন্টেরস্ট্যেট ৬৫ ধরে। জানালার দুপাশে বিস্তৃত ইন্ডিয়ানার গ্রামীণ জীবন যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক সজীব ক্যানভাস হয়ে ধরা দিচ্ছিল। কোথাও সোনালি ফসলি মাঠ, কোথাও সবুজে ঢেউ তোলা ভুট্টাক্ষেত, আবার কোথাও দিগন্তজোড়া সয়াবিনের বিস্তীর্ণ ক্ষেত। মাঝেমধ্যে চোখে পড়ছিল পুরোনো লাল খামারবাড়ি, শস্যাগার এবং আকাশছোঁয়া সাইলো। এই চলমান দৃশ্যপটের ভেতর দিয়ে সময় যেন ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছিল।

গাড়ির ভেতরের নীরবতা আর বাইরের ছুটে চলা প্রকৃতি মিলে তৈরি করছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তিময় আবহ। ধীরে ধীরে গ্রামের শান্ত বিস্তার পেছনে পড়ে রইল, আর সামনে উন্মোচিত হতে লাগল নগর জীবনের স্পন্দিত রূপ। দূরে ভেসে উঠল ইন্ডিয়ানপলিস শহরের সীমারেখা, যেখানে কাচে মোড়া উঁচু ভবন, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং আধুনিক নগর উন্নয়নের অপূর্ব সমন্বয় যেন দূর থেকেই আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল।

শহরের কেন্দ্রের দিকে এগোতেই ইন্ডিয়ানাপলিসের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক আমাদের সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে শুরু করল। দূর থেকেই চোখে পড়ছিল আকাশছোঁয়া সাদা চুনাপাথরের বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ। শহরের আধুনিক ভবনগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহিমান্বিত স্থাপনাটি যেন অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক সেতুবন্ধন রচনা করেছে। যতই কাছে এগোচ্ছিলাম, ততই এর বিশালতা ও সৌন্দর্য আমাদের গভীরভাবে মুগ্ধ করছিল।

Advertisement

মনুমেন্ট সার্কেলের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা সোলজার্স অ্যান্ড সোলজার্স মনুমেন্ট ইন্ডিয়ানাপলিসের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক এবং ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গর্ব। ১৯০২ সালে উন্মুক্ত এই স্মৃতিস্তম্ভটি মার্কিন গৃহযুদ্ধসহ উনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ইন্ডিয়ানার সৈনিক ও নাবিকদের স্মরণে নির্মিত। প্রায় ২৮৪ ফুট উচ্চতার এই স্থাপনাটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সুন্দর যুদ্ধস্মারক হিসেবে বিবেচিত। ইউরোপীয় ধ্রুপদি স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে নির্মিত এই কাঠামোতে বিশাল স্তম্ভ, সূক্ষ্ম খোদাই এবং অসংখ্য ভাস্কর্য একে দিয়েছে রাজকীয় মর্যাদা।

স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে আমরা একের পর এক ভাস্কর্য পর্যবেক্ষণ করছিলাম, যেখানে প্রতিটি মূর্তিই গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে। দক্ষিণ অংশে যুদ্ধের বিভীষিকা ও আত্মত্যাগের দৃশ্য, আর উত্তর দিকে বিজয়, সাহস ও জাতীয় গৌরবের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। কোথাও সৈনিকদের দৃঢ় পদচারণা, কোথাও বীরের গর্বিত মুখ, আবার কোথাও মাতৃভূমির প্রতি নিঃশব্দ নিবেদন পাথরে অমর হয়ে আছে।

স্মৃতিস্তম্ভের শীর্ষে থাকা বিজয়ের প্রতীকী মূর্তিটি সূর্যের আলোয় ঝলমল করে ওঠে, যেন শত বছরের ইতিহাস, সংগ্রাম ও স্বপ্নের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাদদেশের ফোয়ারা, পানির ধারা এবং চারপাশের সবুজ পরিবেশ পুরো এলাকাটিকে এক উন্মুক্ত শিল্পকলা প্রাঙ্গণে পরিণত করেছে, যেখানে পর্যটকদের পদচারণা, ছবি তোলা এবং বিশ্রামের মধ্য দিয়ে এক প্রাণবন্ত নগর জীবনের ছবি ফুটে ওঠে।

স্মৃতিস্তম্ভ ঘিরে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল ইন্ডিয়ানার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও অষ্টম গভর্নর জেমস হুইটকম্ব-এর ভাস্কর্য। ১৮৪৩ থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ইন্ডিয়ানার আর্থিক সংকট মোকাবিলা, রাজ্যের ঋণ পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার উদ্যোগে বধির, অন্ধ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়।

Advertisement

পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হিসেবেও ইন্ডিয়ানার প্রতিনিধিত্ব করেন। মেক্সিকান আমেরিকান যুদ্ধের সময় ইন্ডিয়ানা থেকে সৈন্য সংগঠনের ক্ষেত্রেও তার নেতৃত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য। স্মৃতিস্তম্ভের পাশেই তার ভাস্কর্য যেন স্মরণ করিয়ে দেয় যে একটি রাজ্যের ইতিহাস কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্বগাথায় নয়, দূরদর্শী নেতৃত্ব, সুশাসন এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েও গড়ে ওঠে। ইন্ডিয়ানার ইতিহাসে জেমস হুইটকম্ব আজও একজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণীয়।

মনুমেন্ট সার্কেল থেকে অল্প দূরেই আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ইন্ডিয়ানা স্টেট ক্যাপিট১। দূর থেকেই ভবনটির সবুজাভ তামার গম্বুজ চোখে পড়ে। ১৮৮৮ সালে নির্মিত এই আইনসভা ভবনটি ইন্ডিয়ানার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। রেনেসাঁ ও নব্য ধ্রুপদি স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে নির্মিত এই ভবনটি যেন ইউরোপীয় রাজপ্রাসাদের সৌন্দর্যকে আমেরিকার গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমেই বিস্মিত হতে হয় এর সামঞ্জস্যপূর্ণ নকশা দেখে। সুউচ্চ স্তম্ভ, অলংকৃত প্রবেশদ্বার এবং কেন্দ্রীয় গম্বুজ পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে এক রাজকীয় মর্যাদা। ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেল পালিশ করা মার্বেল, কারুকাজময় সিঁড়ি, ঐতিহাসিক প্রতিকৃতি এবং আইন প্রণয়নের দীর্ঘ ইতিহাস বহনকারী কক্ষসমূহ।

কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম ইন্ডিয়ানা ওয়ার মেমোরিয়ালের দিকে। যুদ্ধস্মারকটি দেখার অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। এটি কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং জাতীয় স্মৃতি ও শ্রদ্ধার এক বিশাল স্থাপত্যভুবন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মার্কিন সেনাদের সম্মানে নির্মিত এই স্মারক কমপ্লেক্সকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ যুদ্ধস্মারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মূল ভবনটির স্থাপত্যে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার প্রভাব স্পষ্ট।

বিশাল স্তম্ভঘেরা কাঠামোটি দূর থেকেই দর্শনার্থীর মনে গাম্ভীর্য সৃষ্টি করে। ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেল সামরিক ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী, যুদ্ধকালীন স্মারক, পুরোনো সামরিক সরঞ্জাম এবং অসংখ্য বীর সেনার স্মৃতি বহনকারী নিদর্শন। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের পেছনে কত অজানা ত্যাগ, কত অশ্রু আর কত আত্মদান লুকিয়ে আছে। পুরো পরিবেশে এক ধরনের নীরব শ্রদ্ধাবোধ কাজ করছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

এরপর আমরা শহরের সবচেয়ে মনোরম ও প্রশান্তিময় স্থানগুলোর একটি ক্যানাল ওয়াক-এর দিকে রওনা হলাম। দিনের ব্যস্ততা শেষে এই স্থানটি যেন শহরের হৃদয়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক শান্ত সবুজ স্বর্গ। হোয়াইট রিভার স্টেট পার্কের অংশ হিসেবে গড়ে ওঠা ক্যানাল ওয়াক মূলত উনবিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক খালের আধুনিক রূপ। খালের স্বচ্ছ জলে বিকেলের আলো ঝিকমিক করছিল। পানির উপর ভেসে বেড়ানো হাঁস, ধীরগতির প্যাডেল বোট, দুই তীরের ফুলে ভরা বাগান এবং ছায়াঘেরা পথ পুরো পরিবেশকে স্বপ্নময় করে তুলেছিল।

আমরা ধীরে ধীরে হাঁটছিলাম, আর খালের জলে প্রতিফলিত আকাশের রং বদলাতে দেখছিলাম। এখানে শহরের কোলাহল যেন হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে যায়। কেবল হালকা বাতাস, পানির ঢেউয়ের মৃদু শব্দ এবং পথচারীদের হাসিমাখা মুখ। নগরজীবনের মধ্যে এমন প্রশান্তির স্থান সত্যিই বিরল। বিকেলের শেষ আলো যখন ধীরে ধীরে সোনালি থেকে কমলা রং ধারণ করছিল, তখন ক্যানাল ওয়াক-এর সৌন্দর্য যেন আরও গভীর হয়ে উঠল। জলের উপর প্রতিফলিত আকাশ, দূরের ভবনগুলোর আলো এবং হাঁটতে থাকা মানুষের ছায়া মিলিয়ে দৃশ্যটি এক অপূর্ব চিত্রকর্মের রূপ নিল।

সময় তখন সন্ধ্যার দিকে গড়িয়েছে। শহরের আলো একে একে জ্বলে উঠছে। আমরাও ফেরার প্রস্তুতি নিলাম। সন্ধ্যা ৮ টার দিকে ইন্ডিয়ানাপোলস ছেড়ে ওয়েস্ট লাফায়েত-এর পথে যাত্রা শুরু করলাম। ফেরার পথে আকাশজুড়ে ছড়িয়ে ছিল গোধূলির শেষ আলো। পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের বিদায়ী আভা, দূরের কৃষিজমির নীরবতা এবং দিনের স্মৃতিগুলো মিলে মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে তুলেছিল। গাড়ি যখন অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল, তখন মনে হচ্ছিল আমরা শুধু একটি শহর ঘুরে ফিরছি না; আমরা ফিরে নিয়ে যাচ্ছি ইতিহাসের স্পর্শ, স্থাপত্যের সৌন্দর্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির স্মৃতি এবং এক বিকেলের অসংখ্য অনির্বচনীয় অনুভূতি। ইন্ডিয়ানাপলিসের সেই বিকেল তাই কেবল একটি ভ্রমণ নয়, বরং সময়, স্মৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ সংলাপ হয়ে রয়ে গেল।

আরও পড়ুনওয়েস্ট লাফায়েতে দশ দিন, যুক্তরাষ্ট্রকে কাছ থেকে দেখাইন্ডিয়ানার বিকেল পেরিয়ে আটলান্টার আলোকিত নিশীথে

কেএসকে