দর্শনা হল্টে নেমে যাওয়া সিংহভাগ যাত্রীর গন্তব্যই কলকাতা। ভোরের অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি। দিনের প্রথম আলো ফোটার অপেক্ষায় স্টেশনেই থেমে থাকলেন যাত্রীরা। বড় হাই তুলে কেউ ঘুমের বার্তা দিচ্ছেন; কেউ দুই হাত সটান আর সিনাটা চওড়া করে শরীরের অলসতা ভাঙছেন।
Advertisement
স্টেশনের পাশেই ছোট্ট একতলা মসজিদ। প্ল্যাটফর্ম থেকে কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেই মসজিদের আঙিনা। সর্বোচ্চ ৩০ জন নামাজ আদায় করতে পারেন। মুসল্লিরা সেখানে ছুটলেন। ওজুখানায় মুসলিমদের বাইরেও ভিড় জমেছে। গোটা রাত যাত্রা করে শৌচালয়ের কাজ সারবেন অনেকেই। ব্রাশে পেস্ট মাখিয়ে দাঁতের যত্নেও মজেছেন কেউ কেউ।
আধঘণ্টার মধ্যেই সূর্যের আলো দর্শনাকে আলোকিত করলো। ব্যাকপ্যাক নিয়ে স্টেশন ছাড়তে শুরু করেছে সবাই। ধনী পর্যটকদের ল্যাগেজ টানতে আগে থেকেই হাজির কিছু যুবক। খোঁজ করে জানলাম, এটাই তাদের পেশা। দূর থেকে আসা দর্শনার্থীদের ব্যাগ টানা শুরু করে ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে পাসপোর্ট-ভিসা চেক সবই তাদের মাধ্যমে হবে। বিনিময়ে ভিআইপি পর্যটকদের কাছে একটা পারিশ্রমিক আদায় করবে সহযোগী দলগুলো। ঝামেলা এড়াতে পর্যটকরাও তেমন কোনো সাড়াশব্দ করেন না।
যারা আপনাআপনি পথ চিনে কলকাতায় ঢুকবেন তাদের বেলায় দৃশ্যটা সম্পূর্ণ বিপরীত। এজন্য কখনো কখনো ছোট ভুলে বড় মাশুল গুনতে হয় অনেক যাত্রীকে। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার কঠিন জালে আটকে ভ্রমণের ইচ্ছাও হারিয়ে ফেলেন কেউ কেউ। আমার মতো সাধারণ যাত্রীরা প্ল্যাটফর্ম থেকে সড়কের দিকে পা বাড়িয়েছে। স্টেশনের ডানপাশটা দর্শনা লোকালয়, আর বাম দিকের পিচঢালা পথটা চলে গেছে স্থলবন্দর চেকপোস্টের দিকে। সবার গন্তব্য সেদিকেই।
Advertisement
যাত্রীদের অপেক্ষায় ছিল স্থানীয় ভ্যানচালকরা। তাদের পরনে লুঙ্গি, ফতুয়া কিংবা টি-শার্ট। কারো কোমরে গামছা বাঁধা, কারো কপালে। প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে পৌঁছতেই যাত্রীদের নিয়ে রীতিমতো তাড়াহুড়ো শুরু করলেন ভ্যানচালকরা। একেকজন একেক দলের সঙ্গে কথা বলা বলছে।
স্টেশন থেকে দর্শনা-গেদে স্থলবন্দর চেকপয়েন্টের ভাড়া জনপ্রতি ২০ টাকা। প্রতি ভ্যানে ৪-৬ জন বসতে পারেন। সঙ্গে ওঠানো যায় ব্যাগ-ল্যাগেজ। তাতেই ভ্যান পরিপূর্ণ। এ সুযোগে শুরুতেই ৪০-৫০ টাকা চেয়ে বসেন ভ্যানচালকরা। ইন্টারনেটের যুগে ভাড়া ২০ টাকার বেশি দিতে কোনো যাত্রীই রাজি হলেন না। অবশেষে নিরুপায় হয়ে যাত্রী নিয়ে স্থলবন্দর অভিমুখে ছুটলো ব্যাটারিচালিত ভ্যানগুলো। রাস্তার দুধারে নানান ফসল ফলিয়েছেন কৃষকেরা। তার মধ্যে আখের জমিটা বেশি মনে হচ্ছে। এগুলো চিনি তৈরির আখ। এখন সেগুলো কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে পৌঁছে যায়। এ কারণেই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয় আখগুলো। এসব দেখতে দেখতে মিনিট ১০-১২ পরেই জয়নগর বাজারে পৌঁছলাম।
হুন্ডি আর স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের কাজ সহজের অজুহাতে এ বাজার ঘিরে কয়েকশ মানুষের জীবিকার সন্ধান হয়েছে। যাত্রীদের পাসপোর্ট ভিসায় সিল-ছাপ্পড় নিতে তারাই সহযোগিতা করে। যোগাযোগ আর খাতিরের ওপর নির্ভর করে কোন পর্যটকের সেবা কেমন হবে?
বাজারে অসংখ্য ছোট ছোট টিনের ঘর। উত্তর-পূর্ব দিকে টিন কেটে কাঠের বাটামে বানানো হয়েছে জানালা সদৃশ আলো-বাতাসের প্রবেশপথ। সাদামাটা এসব ঘরে একটা-দুটা টেবিল আর বেঞ্চ বিছানো। টিনের চালের নিচে ঝোলানো বৈদ্যুতিক পাখা। এখানেই পর্যটকদের ইমিগ্রেশন সম্পন্নের কাজ নেওয়া হয়। বিনিময়ে দুইশ থেকে তিনশ টাকা চার্জ করা হয়। কারো আবেদন কিংবা জটিলতা দেখা দিলে সরকারি কর্মকর্তা গোস্বা করেন। তাদের মন গলাতে অতিরিক্ত কাগুজে নোট খরচ করতে হয় পর্যটকদের।
Advertisement
জয়নগর বাজারে হুন্ডি চক্রটা বেশ কৌশলে কাজ করে। সীমান্তে বাংলাদেশি মুদ্রা জমা করে ওপারে গিয়ে এজেন্সির থেকে ভারতীয় রুপি সংগ্রহ করেন পর্যটকেরা। এতে অবশ্য সামান্য লাভে থাকেন পর্যটকেরা। রুপির মূল্য দর কষাকষির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। বাজারমূল্য অনুযায়ী ক্রেতাদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে মানি এক্সেচেঞ্জাররা। কাজটা করে পরিবারের মুখে ডাল-ভাত তুলছেন মুদ্রা কারবারিরা।
স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বাংলাদেশ সীমান্তের শেষ ধাপে আছি। বিজিবি সদস্যরা ভিসা-পাসপোর্ট আর লাগেজ চেক করবেন। প্রথম বুথে ভিসা-পাসপোর্ট চেক করা হলো। এ প্রক্রিয়ায় কিছুটা ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলাম। কারণ নানা জায়গায় দেখেছি বিজিবি চেকপয়েন্ট পার হওয়া জটিল। একে তো প্রথমবার তার ওপর সীমান্তে তখন চলছে কড়াকড়ি। যাই হোক, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরার আগেই এ পর্ব শেষ।
দ্বিতীয় বুথে চেক হবে ব্যাগ আর লাগেজ। এ নিয়ে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা নেই। টেবিলের ওপর ল্যাগেজ উঠিয়ে ভালোভাবে চেকিং সম্পন্ন করলেন এক নারী বিজিবি সদস্য। ইশারায় সামনের দিকে এগোতে বললেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সীমান্ত অফিসিয়ালি অতিক্রম করে ফেললাম। সেই সঙ্গে বাংলাদেশি সিমের নেটওয়ার্ক থেকে বেরিয়ে গেলাম। সীমান্তের এপারে অবশ্য দুই-এক দাগ করে এখনো নেটওয়ার্কের সিগন্যাল মিলছে।
নো ম্যান্স ল্যান্ড ধরে সামনে দিকে এগোচ্ছি। সকালের স্নিগ্ধ বাতাসে স্মৃতিগুলো মুঠোফোনে বন্দি করছি। সঙ্গে আসিফ আর মাসুদ। বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করার পর থেকে দুজনেই কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছে। আক্ষেপ করার কারণ নেই। পথে পরিচয় পথেই সমাপ্তি!
কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে যেতেই ভ্যান পাওয়া গেল। ভ্যানে ভ্যানে ভারতের তিরাঙ্গা উড়ছে। গেদে পোর্টে পৌঁছে দিতে ৪০ রুপি দাবি করলেন চালকরা। পথ চিনি না। ভেবেছি পথের দূরত্ব আছে বোধহয়। দুই মিনিট পিকআপ টেনে চেকপোস্টে নামিয়ে দেওয়া হলো আমাদের।
সাত সকালেই গেদে পোর্টে লম্বা সিরিয়াল। সাপের লেজের মতো লাইনটা আধা কিলোমিটার ছুঁই ছুঁই হয়েছে। লাইনের একপ্রান্তে দাঁড়িয়েছি। কথায় কথায় পরিচয় হলো একদল পর্যটকের সঙ্গে। তাদের কেউ ব্যবসায়ী, কেউ চাকরিজীবী। তবে দলটির একজনের সঙ্গে অন্যজনের চেনাজানা বেশ পুরোনো। মুহূর্তেই আড্ডাটা জমে গেল। সিরিয়ালের লম্বা লাইন ছোট হতেই ডাক পড়লো একে একে সবার। লোহার গেট পেরিয়ে ব্যাগগুলো এক বিএসএফ সদস্যের কাছে জমা পড়লো। পর্যটকদের যেতে হলো অফিস কক্ষে। সেখানে স্ক্যানারে শরীর চেকের পাশাপাশি কাগজপত্রের বৈধতা পরখ করে দেখলো ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। প্রথম ধাপের প্রক্রিয়া সম্পন্ন।
রেলপথ অতিক্রম করে নদিয়া জেলার গেদে স্টেশনে পা রাখলাম। এটা মূলত পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার একেবারে পূর্ব প্রান্তে। যেখানে রেললাইন এসে থেমে গেছে। দিগন্তের ওপারে বাংলাদেশ, এপারে গড়ে উঠেছে গেদে। তার রেলস্টেশন থেকেই শুরু হয়েছে এ অঞ্চল।
প্রথম দেখায় গেদে হয়তো আর দশটি সীমান্ত গ্রামের মতোই মনে হবে। ছোট ছোট বাড়ি, সবুজ ধান ক্ষেত, মেঠোপথ আর নিস্তরঙ্গ জনজীবন। এ জনপদে রাজ্য সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। তার চেয়েও বড় অভিশাপ বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা। মঞ্চে দাঁড়িয়েই রাজনৈতিক নেতারা, মাঝেমধ্যেই বলেন ‘ওরা তো বাংলাদেশি’। এ অপবাদও তো এ জনপদের মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়!
উন্নয়নের মহাসড়কে চড়তে না পারলেও এ শান্ত জনপদের বুকের ভেতর লুকিয়ে আছে ইতিহাস, রাজনীতি, দেশভাগের স্মৃতি। সঙ্গে দুই দেশের সংযোগের অনন্য কাহিনি। সেই সাথে এ জেলাতেই তো জন্ম নিয়েছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও বাঘাযতীনদের মতো মহাপুরুষরা।
এ জেলারই সীমান্ত শহর গেদে। কয়েক শতক আগেও যেখানে ছিল না কোনো বিভাজন। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতা থেকে ট্রেনে চড়ে মানুষ সহজেই চলে যেত পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে। তখনকার রেলপথগুলো আজকের মতো কাঁটাতারের বেড়ায় বিভক্ত ছিল না। কলকাতা থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেন নদিয়া পেরিয়ে গেদে হয়ে ছুটে যেত গোয়ালন্দ, কুষ্টিয়া কিংবা আরও দূরের জনপদে।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে গেলে সবকিছু বদলে যায়। যে রেললাইন একসময় মানুষকে কাছে এনেছিল, সেই লাইনই দুই দেশের সীমান্তরেখায় পরিণত হয়। রাতারাতি গেদে হয়ে ওঠে ভারতের শেষ স্টেশন।
দেশভাগের পর গেদে শুধু রেলস্টেশন নয়, হাজারো বিচ্ছিন্ন পরিবারের বেদনার সাক্ষী হয়ে ওঠে। এমন অনেক পরিবার ছিল, যাদের একাংশ থেকে যায় ভারতের নদিয়ায়, আরেক অংশ চলে যায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। বর্তমানে যা স্বাধীন বাংলাদেশ। সীমান্তের দুপাশে দাঁড়িয়ে আত্মীয়দের দেখতে পাওয়া গেলেও সহজে কাছে যাওয়া যেত না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দূরত্ব আরও বাড়ে।
ইতিহাসের চাকা কখনো থেমে থাকে না। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন পথে এগোতে থাকে। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও এই রেলপথ গুরুত্ব ফিরে পায়। মালবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। ২০০৮ সালে চালু হয় মৈত্রী এক্সপ্রেস। কয়েক দশক পর কলকাতা থেকে ঢাকাগামী ট্রেনের চাকা ঘোরে।
গেদে স্টেশনে দাঁড়ালে সেই ইতিহাসের ছাপ এখনো চোখে পড়ে। প্ল্যাটফর্মে হয়তো সাধারণ যাত্রীদের ভিড় খুব বেশি নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক ট্রেন এলে পরিবেশ বদলে যায়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ে, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। অবশ্য কোভিড মহামারির সময় প্রায় দু’বছর থমকে ছিল এ ট্রেনের ইঞ্চিন। ২২ সালের মে মাসে চালু হলেও উত্তাল জুলাই থেকে একেবারে থমকে আছে যাত্রীসেবা।
গেদের চারপাশের জনপদ মূলত কৃষিনির্ভর। ধান, পাট, শাক-সবজি এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের চাষ এখানকার মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। ভোরের গেদে বিশেষভাবে মন কাড়ে। কুয়াশার চাদরে মোড়া রেললাইন দূরে গিয়ে যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। দিনের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত চৌকিগুলো ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা নামলে জনপদটি আবার ফিরে যায় তার চিরচেনা শান্ত রূপে।
রেললাইনের পাশ দিয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে সরু পথ চলে গেছে। সেই পথ ধরেই হাঁটছি। প্ল্যাটফর্মে পৌঁছেই ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সারতে হবে। এখানে বিশাল লম্বা লাইন। নতুনদের অনেকেই ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া ঠাওর করতে পারছেন না। কেউ কেউ রিজেক্ট হচ্ছেন। দিনের শুরুতে কর্তারা কিছুটা কঠোর আচরণ করেন, এ ভাবনা থেকেও কেউ কেউ সামনে এগোনোর সাহস করছেন না।
গেদে সীমান্তের এপাশেও মানি এক্সচেঞ্জের কারবারিদের ছোট্ট জগৎ গড়ে উঠেছে। স্টেশন আর ইমিগ্রেশন ভবনের আশপাশে ঘুরলেই তাদের দেখা মেলে। কেউ হাতে ছোট্ট ডায়েরি, কেউবা পকেটে ক্যালকুলেটর নিয়ে পর্যটকদের খুঁজছেন। বাংলাদেশ থেকে আসা যাত্রীদের বেশিরভাগই ভারতীয় রুপি সংগ্রহের জন্য তাদের ওপর নির্ভর করেন।
সীমান্তের ওপারে জমা রাখা টাকার হিসাব মিলিয়ে এজেন্টরা মুহূর্তেই হাতে ধরিয়ে দেন রুপি। দরদাম নিয়েও চলে খানিক আলোচনা। কেউ ভালো রেটের আশায় একাধিক কারবারির সঙ্গে কথা বলেন, কেউ আবার পরিচিত সূত্রের ওপর ভরসা রাখেন। সীমান্তের এই ক্ষুদ্র অর্থনীতি ঘিরেই বহু পরিবারের সংসার চলছে। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাত্রীদের পদচারণাই তাদের আয়ের প্রধান উৎস।
মানি এক্সচেঞ্জ করে দেওয়ার আগে হাতে একটা করে ফর্ম ধরিয়ে দিয়ে ৫০ রুপি করে দাবি করে এজেন্ট চক্রের সদস্যরা। আহামরি কিছুই না। এই ফর্ম বিনা মূল্যে ইমিগ্রেশন কর্তার সহযোগী বিতরণ করেন। তবু নিরুপায়। হাতে ভারতীয় রুপি আসার আগমুহূর্তে এজেন্টদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ফর্মটা মূলত ইমিগ্রেশন অফিসারের মুখোমুখি হওয়ার একটি মাধ্যম। নির্ধারিত ফরমে ব্যক্তিগত তথ্য, গন্তব্য ও ভারতে অবস্থানের ঠিকানা লিখতে হবে। এরপর লাইনে দাঁড়িয়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সাক্ষাৎ নিতে হয়। কর্মকর্তা পাসপোর্ট, ভিসা এবং ফরমের তথ্য মিলিয়ে দেখেন। কখনো কখনো ভ্রমণের উদ্দেশ্য কিংবা অবস্থানের মেয়াদ নিয়েও দু-একটি প্রশ্ন করেন। সবকিছু ঠিক থাকলে পাসপোর্টে প্রবেশ সিল মেরে দেওয়া হয়। সেই সিল হাতে পাওয়ার মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের মাটিতে প্রবেশের অনুমতি মেলে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ছোট্ট সেই মুহূর্তটুকু আমাকে স্বস্তি দিলো।
সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ৩০ রুপিতে গেদে-শিয়ালদহ লোকালের টিকিট সংগ্রহ করলাম। টিকিট সংগ্রহের সময়ই জানানো হলো-ট্রেন আসবে ভারতীয় সময় সাড়ে ৮টায়। যাত্রী তুলে ৯টায় ট্রেনের ইঞ্চিন চালু হবে। ৩ ঘণ্টায় ১১৭ কিলোমিটার অতিক্রম করবে রেলগাড়িটি। দীর্ঘ এ পথে প্রায় ৪২টি স্টেশনে থামবে সাপের মতো লম্বা এ ট্রেন।
গেদে থেকে কয়েকটি স্টেশন অতিক্রম করতেই ট্রেনে ভিড় বাড়তে থাকলো। প্রতিটি স্টেশনেই যাত্রীদের তাড়াহুড়ো। কেউ ছুটবেন অফিসে, কেউ বিদ্যাপীঠে, কেউবা অন্য জীবিকার সন্ধানে। কাঁটায় কাঁটায় ৩ ঘণ্টা পেরোতেই শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনের ইঞ্জিন বন্ধ হলো।
ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে পা রাখার কিঞ্চিত সুযোগ নেই। বিশাল প্ল্যাটফর্মজুড়ে গমগম করছে মানুষ। কারো ন্যানো সেকেন্ড অপেক্ষার সুযোগ নেই। অনেকটা ভিড় ঠেলেই প্ল্যাটফর্মে নামতে হলো। ইউনিয়নের কুলির সাহায্যে স্টেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নিলাম। স্টেশনের ভেতরেই টিকিট বুথ। যাত্রীর অপেক্ষার শেড। আর রেলওয়ে এবং কুলি-মজুরদের ইউনিয়নের অফিস ঘর। স্টেশনের বাইরে পা রেখে পেছনে ঘুরে তাকালাম। লাল প্রাচীরের গায়ে বিশাল অক্ষরে বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি শব্দে লিখা ‘শিয়ালদহ’।
অন্য সবগুলোর চেয়ে শিয়ালদহ স্টেশনের আভিজাত্যটা বেশ। এর যাত্রা শুরু হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ব্রিটিশ শাসনামলে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে যাত্রীসেবা দিতে শুরু করে এ প্ল্যাটফর্ম। ইতিহাস তো বলছে, ১৮৬২ সালে ৪টি প্ল্যাটফর্ম নিয়ে শুরু হলেও ৭ বছর পর স্টেশনটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রী পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে এর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। সেই সময় কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী এবং পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার; অবশ্য সেসব এখন অতীত।
শিয়ালদহ স্টেশনে প্রতিদিন কয়েক লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন। অসংখ্য লোকাল, দূরপাল্লার ও উপনগরীয় ট্রেনের কেন্দ্রবিন্দু এ স্টেশন কলকাতার অর্থনীতি ও জনজীবনকে সচল রেখেছে। ইতিহাসের বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়ে আজও শিয়ালদহ একইভাবে মানুষ, স্মৃতি ও সময়কে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে।
অপলক দৃষ্টিতে ঐতিহ্যের সিটি অব জয়ের পানে তাকিয়ে...
চলবে...
আরও পড়ুনকলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১ কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ২এসইউ