খন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুল
Advertisement
হাতে হাতে ফলদ ও শোভাবর্ধক গাছ নিয়ে বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা। ওপরে সূর্য মামা খাড়াভাবে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বনের যে শীতল পরিবেশ থাকার কথা; সেটা পাচ্ছি না বরং গরমে আমাদের হাঁসফাঁস অবস্থা। মাঝে মাঝে বিশ্রাম না নিলে আমাদের পা চলছে না। তবুও বনের বিভিন্ন জায়গায় থেমে থেমে কোদালের আঘাতে লাল মাটি খুঁড়ে পরিবেশ বন্ধু গাছ রোপণ করছি। মসজিদ, মন্দির, চার্চ ও বসতবাড়িতে গিয়ে গাছ লাগিয়ে দিচ্ছি। বন রক্ষায় বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছি।
বনের ভেতরে গাছের সংখ্যা খুবই কম। সেখানে আনারস ও কলা বাগানের রাজত্ব। মধুপুর গড়ে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত শুনে আমি বলেছিলাম, ‘বনে তো গাছ আছেই। যেখানে গাছ নেই অর্থাৎ গাছের সংখ্যা কম; সেখানে লাগাই।’ আমার প্রশ্ন শুনে পরিবেশকর্মী রাতুল ভাই কিঞ্চিৎ হেসে বললেন, ‘বন আর বন নেই। মধুপুর গড়ে পুনরায় প্রাণ সঞ্চার করতে হলে গাছ লাগানোর বিকল্প নেই।’
বনের ভেতরে দগ্ধ পরিবেশ দেখে শালবনের প্রতি কিছুটা মায়া জন্মালো। মানুষের আগ্রাসী আস্ফালনে শালবন মৃত্যুশয্যায়। একসময় যে বন ছিল এ অঞ্চলের মানুষের অবলম্বন। সময়ের পরিক্রমায় আজ তা নেই। মধুপুর বনাঞ্চল দেশের তৃতীয় বৃহৎ বনাঞ্চল। একসময়ে সগৌরবে এ বনের অস্তিত্ব থাকলেও বর্তমানে মানুষের আগ্রাসী আচরণে বনের পরিধি ব্যাপকভাবে কমে আসছে। শালবনের জন্য বিখ্যাত এ বনে পুরোনো শালগাছ খুঁজে পাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
Advertisement
একরের পর একর শালবন উজাড় করে বিস্তীর্ণ জায়গায় আনারসের আবাদ করা হয়েছে। সাথি ফসল হিসেবে দেদার পেঁপে, হলুদ কিংবা অন্য কোনো ফসল আবাদ করা হচ্ছে। এসব ফসল উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত হরমোন, কীটনাশক ও অনিয়ন্ত্রিত সার। যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টের পাশাপাশি বিপন্ন করছে পরিবেশ। এ ছাড়া শাল গাছ ও সহযোগী গাছ উজাড় করে লাগানো হয়েছে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি। বনের বুক চিড়ে তৈরি করা হচ্ছে অট্টালিকা।
বনের ভেতরে প্রকৃত ক্ষত দেখে যে কোনো সচেতন মানুষ আঁতকে উঠবেন। প্রশাসনের নাকের ডগায় নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে শালবন, যেন দেখার কেউ নেই। কখনো কখনো আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আবার কখনো গাছের বাকল ছিঁড়ে সেখানে লবণ, সোডা বা কেমিক্যাল দিয়ে গাছকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এমন অভিনব কায়দায় ভূমি খেকোরা আরামে বন দখল করে নিচ্ছেন।
এ বন নিজের রূপ-জৌলুস হারিয়েছে অনেক আগেই। সেই সাথে হারিয়েছে মূল্যবান ও দামি সব গাছ ও বন্যপ্রাণী। মধুপুর বনে একসময় চিতা বাঘ, হাতি, বন্য মহিষ ও ময়ূর ছিল। তবে বর্তমানে সেগুলো আর দেখা যায় না। গাছপালা কমে যাওয়ায় সারাদেশের ন্যায় এ অঞ্চলেও আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব লক্ষণীয়। অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টির পাশাপাশি অসহ্য তাপ প্রবাহে জনজীবন অতিষ্ঠ।
আরও পড়ুনমাগুরায় হারিয়ে যাচ্ছে দেশি জাতের খেজুরআবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ও মধুপুর গড়ের শালবৃক্ষ ও শালবন রক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস। এ বন যেমন এ অঞ্চলের মানুষের যৌথ কর্মকাণ্ডে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে; ঠিক তেমনই বনকে আবারও চাঙা করতে তাদের জুড়ি নেই। যারা বন দখল করে ফসল আবাদ করছেন, তারা রাঘববোয়াল। তাদের শক্ত হাতে প্রতিহত করতে হবে। বনকে আমাদের ভালোবাসতে হবে।
Advertisement
বন প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বন শুধু আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করেই ক্ষান্ত হয় না বরং এ বন বন্যপ্রাণীদের আশ্রয় ও খাবার দেয়। প্রাকৃতিক ও বন্য ফল সরবরাহ করে আমাদের পুষ্টির চাহিদা ঠিক রাখে। বন রক্ষায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন। যেন কেউ অপরাধ করলে পার পেয়ে না যায়। সেই সাথে বন যেন আর বেদখল না হয়, এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। পাশাপাশি হারানো বন পুনরুদ্ধারে রাষ্ট্রের দৃষ্টি নিবন্ধ করা প্রয়োজন।
লেখক: শিক্ষার্থী, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ।
এসইউ