মতামত

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি: প্রভাব পড়বে ভাতের পাতে

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু মাসিক বিলের বাড়তি চাপ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন একটি ব্যয়, যা ঘর থেকে কৃষি, দোকান থেকে কারখানা, সেচ থেকে খাদ্য সংরক্ষণ, উৎপাদন থেকে পরিবহন—সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। তাই বিদ্যুতের দাম বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার চাপ এসে পড়ে বাজারে, কৃষকের উৎপাদন খরচে, শ্রমজীবী মানুষের আয়-ব্যয়ে এবং দরিদ্র পরিবারের খাবারের থালায়।

Advertisement

সাম্প্রতিক খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বা প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৩৯ পয়সা। পাইকারি পর্যায়েও মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি এ পর্যন্ত একবারে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। সরকার সমালোচনার মুখে লাইফলাইন গ্রাহক, অর্থাৎ ০ থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী এবং আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত আগের দাম বহাল রাখার কথা বলেছে। আপেক্ষিকভাবে বিষয়টি নিম্নবিত্তের জন্য স্বস্তির মনে হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। সেই ব্যয় বাজারদরের মাধ্যমে আবার নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরই ফিরে আসে।

এই বছরই জ্বালানি তেলের মূল্য দুই ধাপে বেড়েছে। এলপিজি ও এলএনজির দামও বেড়েছে। জ্বালানি তেল, রান্নার গ্যাস, ভোজ্যতেল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মাঝেই বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধি এসেছে। সাধারণ মানুষকে নির্দিষ্ট কোনো পণ্য বা সেবার নয়, বরং বড় ধরনের সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি আগামী এক বছরে মূল্যস্ফীতি ১০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়াতে পারে।’ এই সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনীতির একটি সূচক নয়। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতি মানে কম খাবার, কম পুষ্টি, বেশি ঋণ এবং মাসের শেষ সপ্তাহে ধার করে বেঁচে থাকা।

Advertisement

বাংলাদেশে আয় সাধারণত মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে না। কখনো কখনো আয় কিছুটা বাড়লেও মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার মানে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে না। সীমিত আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। একসময় যে টাকা দিয়ে একটি পরিবার চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, সবজি ও শিশুদের খাবার কিনতে পারত, এখন সেই টাকা দিয়ে একই পরিমাণ খাবার কেনা যায় না।

এই পরিস্থিতিতে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো প্রথমে বাজেট কাটছাঁট শুরু করে। বাজেট কাটছাঁটের প্রথম আঘাত পড়ে খাদ্য ব্যয়ে। শুরুতে পুষ্টিকর খাবার কমে যায়। ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ফল ও সবজি বাদ পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে খাবারের পরিমাণ কমে। অনেক পরিবার তিন বেলার জায়গায় দুই বেলায় নেমে আসে। কেউ কেউ শিশু ও প্রবীণদের খাবার ঠিক রাখার চেষ্টা করে নিজেরা কম খায়। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এভাবেই সরাসরি না হলেও মানুষের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে।

কৃষি খাতে এই প্রভাব আরও গভীর। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। সেচ, চালকল, কোল্ড স্টোরেজ, মুরগি ও মাছের খামার, দুধ সংরক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিপণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ ব্যয় বাড়বে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে, কিন্তু শস্যের দাম কৃষক পর্যায়ে তেমন বাড়ে না। দাম বাড়লেও মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারদের কারণে কৃষক লাভের ন্যায্য ভাগ পায় না।

মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ, নারীপ্রধান পরিবার এবং জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। তাদের আয় কম, সঞ্চয় কম, সম্পদ কম এবং বাজারের ওপর নির্ভরতা বেশি। খাবারের খরচ কমলে পরিবারে নারীরা অনেক সময় নিজের অংশ কমিয়ে সন্তানদের খাওয়ান। শিশুদের পুষ্টি কমলে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি, শিক্ষা ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব পড়ে। প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষকে অনেক সময় ওষুধ ও খাবারের মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়।

Advertisement

‘ঋণের চক্রে পড়ে নিঃস্ব জীবন’ শিরোনামে রাজশাহীর ২৪টি পরিবারকে নিয়ে প্রথম আলো এ বছরের জানুয়ারিতে একটি সংবাদ প্রকাশ করে, যেখানে ঋণগ্রস্ত পরিবারের দুর্দশার কথা উঠে এসেছে। ঋণ শোধ করতে না পেরে কেউ গ্রাম ছেড়েছেন, কেউ আত্মগোপনে গেছেন, কেউ আবার আর কোনো পথ না দেখে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন।

পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (প্রান) সাম্প্রতিক হাওরের বন্যা নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, বন্যার ১০ দিনে জাগো নিউজসহ প্রথম সারির ৫টি পত্রিকায় ৭৭টি সংবাদ প্রকাশিত হয়, যার মধ্যে ৪১টি সংবাদে (মোট প্রকাশিত সংবাদের ৫৩ শতাংশ) ৭৭ জন ঋণগ্রস্ত কৃষকের কথা উল্লেখ রয়েছে। বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়ার হতাশায় এক কৃষকের মৃত্যুর ঘটনাও সেখানে উঠে এসেছে।

মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ, নারীপ্রধান পরিবার এবং জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। তাদের আয় কম, সঞ্চয় কম, সম্পদ কম এবং বাজারের ওপর নির্ভরতা বেশি। খাবারের খরচ কমলে পরিবারে নারীরা অনেক সময় নিজের অংশ কমিয়ে সন্তানদের খাওয়ান। শিশুদের পুষ্টি কমলে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি, শিক্ষা ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব পড়ে। প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষকে অনেক সময় ওষুধ ও খাবারের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয়।

গ্রামে কৃষি ও ক্ষুদ্র জীবিকার ব্যয় বাড়লে মানুষ কাজের খোঁজে শহরে পাড়ি জমায়। শহরে অল্প জায়গায় বেশি মানুষ বাস করতে বাধ্য হয়। এতে বাসস্থান, পানি, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ে। ঢাকা ইতোমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর একটি হিসেবে বারবার তালিকায় উঠে এসেছে।

সরকার যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তবে শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে রাজস্ব ঘাটতি সামলানো যথেষ্ট নয়। বাজার ব্যবস্থাপনা, মুদ্রানীতি, বিনিময় হার, ব্যাংকিং খাতের দুর্দশা এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থাকে একসঙ্গে ঠিক করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের বরাদ্দ বাড়াতে হবে, যাতে সীমিত আয়ের মানুষের বাজার থেকে খাবার কেনার সক্ষমতা কিছুটা হলেও টিকে থাকে।

লেখক:  গবেষণা ও মিল কর্মকর্তা, বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক–খানি

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম