বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার উদ্দেশ্যে দীর্ঘযাত্রা শুরু করার সকালটি আজও মনে পড়লে মনে হয়, আমরা কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করতে যাচ্ছিলাম না বরং পা বাড়াচ্ছিলাম অজানা অভিজ্ঞতার ভেতর। সেখানে সময়, আকাশ আর অপেক্ষা মিলেমিশে রচনা করছিল নতুন অধ্যায়। ১ মে দিবাগত রাত ৩টায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করার মুহূর্তে বিমানবন্দরের আলো আর অন্ধকার মিলে অদ্ভুত নীরব আবহ তৈরি করেছিল। মানুষের ব্যস্ততা, দূরযাত্রার তাড়া এবং শেষ মুহূর্তের নীরব বিদায় মিলিয়ে পরিবেশটি ছিল আবেগে ভারী। আমার পাশে ছিলেন স্ত্রী, ছোট কন্যা এবং বেয়াইন বিউটি দিদি। তার চোখেমুখে প্রথম আমেরিকা যাত্রার উচ্ছ্বাস স্পষ্ট। আমাদের সবার ভেতরে একই অনুভূতি কাজ করছিল। আমাদের নাতনি বাঁশরীকে দেখার প্রতীক্ষা।
Advertisement
বিমান যখন ধীরে ধীরে আকাশে উঠলো, নিচের শহরের আলো ক্ষুদ্র হতে হতে একসময় বিন্দুর মতো হারিয়ে গেল। জানালার বাইরে মেঘের সাদা ভেলায় ভেসে চলার ভেতর অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো মনে। যেন পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে এবং শুরু হচ্ছে নীরব ভ্রমণ। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার উড়াল শেষে আমরা পৌঁছালাম কাতারের দোহা হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। যাত্রাপথটি কেবল সময়ের হিসাব ছিল না। ছিল অনুভূতির প্রবাহ; যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে মিশে ছিল আপনজনের অপেক্ষার উষ্ণতা।
দোহায় নামার পরই মনে হলো, আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে প্রবেশ করেছি। পারস্য উপসাগরের তীরে গড়ে ওঠা এই আধুনিক বিমানবন্দর যেন চলমান শহর, যেখানে অবিরাম গতি, প্রযুক্তির নিখুঁত ব্যবহার এবং শৃঙ্খলিত মানবপ্রবাহ বিস্ময়কর সমন্বয় সৃষ্টি করেছে। আমাদের হাতে সময় ছিল মাত্র তিন ঘণ্টা। সংক্ষিপ্ত বিরতিটিই যেন পুরো যাত্রার ধৈর্য পরীক্ষা। সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে বিশেষ সহায়তায় আমরা এগিয়ে চললাম কানেক্টিং ফ্লাইটসের দিকে। করিডোরের পর করিডোর, চলন্ত সিঁড়ি, ট্রানজিট গাড়ি, সবকিছু মিলিয়ে পথ যেন শেষ হতে চায় না। কোথাও বিস্ময়, কোথাও তাড়া, আবার কোথাও নিঃশব্দ ক্লান্তি। মনে হচ্ছিল, এ বিশালতার ভেতর মানুষ যতটা না স্বাধীন, তার চেয়ে বেশি সময়ের নিয়মে বাঁধা।
আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্রের লেক মিশিগানের তীরে বিকেলের উপাখ্যাননিরাপত্তা তল্লাশির আরেকটি ধাপ পার হতে হলো। সারিতে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে দেখা গেল বিভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি এবং ভিন্ন মুখের মানুষ, কিন্তু সবার চোখে একই লক্ষ্য, নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছানো। এই মুহূর্তে বিশ্বায়ন যেন কোনো বইয়ের ধারণা নয় বরং চোখের সামনে জীবন্ত বাস্তবতা। আমার পরবর্তী ফ্লাইট কাতার এয়ারওয়েজের কিউআর ৭২৫। গেট খুঁজে পাওয়ার পর মনে হলো যেন দীর্ঘ দৌড়ের শেষে এসে দাঁড়িয়েছি। বোর্ডিং শুরু হওয়ার আগে কিছুটা সময় পাওয়া গেল। আর সেই মুহূর্তেই প্রথমবার ধীর দৃষ্টিতে চারপাশ দেখার সুযোগ মিললো। দূরে ঝলমলে ডিউটি ফ্রি শপ, কাচের দেওয়ালে আলোর প্রতিফলন এবং কফির গন্ধে ভরা আধুনিক পরিবেশ মিলিয়ে ক্ষণিক নগরীর অনুভূতি তৈরি করেছিল। তবু সময়ের দায়বদ্ধতা আমাদের আবার গন্তব্যের দিকে টেনে নিলো।
Advertisement
তিন ঘণ্টার ট্রানজিট আমাকে একটি শিক্ষা দিয়ে গেল। ভ্রমণ কেবল স্থান পরিবর্তন নয়, এটি সময় ব্যবস্থাপনার সূক্ষ্ম শিল্প। এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত যখন বিমানে উঠলাম, মনে হলো এই ছোট বিরতিটিই পুরো যাত্রার একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি; যেখানে গতি, শৃঙ্খলা এবং সতর্কতা অনন্য জীবনপাঠ হয়ে ধরা দিয়েছে। সামনে তখন অপেক্ষা করছিল চৌদ্দ ঘণ্টার দীর্ঘ আকাশযাত্রা। যার প্রতিটি ক্ষণ নতুন অভিজ্ঞতা ও নতুন অনুভূতির সম্ভাবনায় ভরপুর।
০৩ মে ২০২৬। দোহার আলোকময়তা পেছনে ফেলে আবার আকাশে উঠল কাতার এয়ারওয়েজের কিউআর ৭২৫ ফ্লাইট। জানালার বাইরে বিস্তৃত আকাশ আর সামনে অজানা দীর্ঘপথ। তবে সেই যাত্রার শুরুতেই আমাদের মনে ছিল অদৃশ্য অস্থিরতা। তার আগের দিনই একটি অপ্রত্যাশিত খবর আমাদের ভাবিয়ে তুলেছিল। এক পরিচিত ভাই শিকাগোর ও’হারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে ইমিগ্রেশনে তাদের থাকার মেয়াদ মাত্র একমাসে সীমিত হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন। খবরটি আমাদের পরিকল্পনার ওপর নীরব অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছিল। আমাদের ইচ্ছা ছিল তিন মাস থাকার, কিন্তু সেই স্বপ্নের ভেতর হঠাৎই দুশ্চিন্তার একটি রেখা এসে পড়ে। আমার মেয়ের চোখ থেকে যেন ঘুম উধাও হয়ে গিয়েছিল। তার মুখেও স্পষ্ট ছিল মানসিক চাপের ছাপ। সেই অদৃশ্য ভার এবং নানা প্রশ্নের অনিশ্চয়তা নিয়েই আমরা বিমানে উঠে বসেছিলাম।
আরও পড়ুন লাফায়েতে স্ট্রবেরি পিকিং: যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পর্যটনের অনন্য অভিজ্ঞতাএটি আর কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর যাত্রা নয়; এটি সময়ের সঙ্গে নীরব সহাবস্থান, চৌদ্দ ঘণ্টার দীর্ঘ স্তব্ধতা; যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের জগতে প্রবেশ করে। বিমানের ভেতরের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এলে যেন অদৃশ্য রাত নেমে আসে। জানালার বাইরে আকাশ স্বচ্ছ কাচের মতো, তার নিচে ভেসে চলেছে তুলোর মতো সাদা মেঘমালা। কোথাও তারা পাহাড়ের ঢালের মতো উঁচু হয়ে উঠেছে, কোথাও নরম স্তূপের মতো ছড়িয়ে আছে। আবার কোথাও বিস্তৃত শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করেছে। এ যেন বাস্তব নয় বরং স্বপ্নময় নীরব পৃথিবী। জানালার পাশে বসা বিউটি মন্ডল দিদি কখনো ঘুমিয়ে পড়েন, আবার কখনো ফ্লাইটের ওয়াইফাই ব্যবহার করে আপনজনের সঙ্গে ভ্রমণের অনুভূতি ভাগ করে নেন। আমার স্ত্রী ময়না সিনেমা ও ইনফ্লাইট স্ক্রিনে সময় কাটান। আমি যেন সময়ের প্রবাহকে অনুভব করার চেষ্টা করি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই আসনে বসে থেকেও মনে হয়, ভেতরে ভেতরে আমি অতিক্রম করে চলেছি হাজার মাইল পথ।
দীর্ঘযাত্রায় শরীর ক্লান্ত হয়, মনও ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসে। মাঝেমধ্যে উঠে কেবিনের সরু পথে হাঁটা যেন শুধু শরীর নয়, মনকেও একটু হালকা করে। কেবিন ক্রুরা নিখুঁত শৃঙ্খলায় কাজ করে চলে। খাবার পরিবেশন, পানীয় পরিবেশন এবং যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান, সবকিছুতেই এক ধরনের প্রশান্ত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। জানালার বাইরে কখনো রাত নেই বরং অবিরাম দিনের আলো। আমরা এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে অতিক্রম করছি। সমুদ্র, মরুভূমি এবং বরফঢাকা বিস্তৃত অঞ্চল পেরিয়ে। তখন মনে হয়, এই যাত্রা শুধু ভ্রমণ নয়; এটি মানবসভ্যতার বিস্ময়কর অগ্রযাত্রার নীরব সাক্ষ্য।
Advertisement
শেষদিকে যখন অবতরণের ঘোষণা এলো, মনে হলো দীর্ঘ আকাশযাত্রা হঠাৎই শেষ হয়ে গেল। ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে আবার সেই পুরোনো দুশ্চিন্তা মাথা তুলল। প্রতিটি মুহূর্ত ভারী হয়ে উঠছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবকিছু সহজভাবে সম্পন্ন হলো। কোনো জটিলতা ছাড়াই আমরা ইমিগ্রেশন পার হলাম। মনে হলো বুকের ভেতর জমে থাকা অদৃশ্য ভার হঠাৎই হালকা হয়ে গেছে। বাইরে বের হতেই অপেক্ষা করছিল সেই মুহূর্ত, যার জন্য পুরো যাত্রা। আমাদের নাতনি ছোট্ট বাঁশরী হাতে ছোট্ট ফুলের তোড়া নিয়ে মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে দুষ্টুমি মাখা হাসি, চোখে অপরিসীম কৌতূহল ও আনন্দের দীপ্তি। আমাদের দেখেই সে ছুটে এলো। সেই এক মুহূর্তে পুরো দীর্ঘযাত্রা, ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা এবং সব ধরনের মানসিক ভার মিলিয়ে গেল অনির্বচনীয় উষ্ণতায়।
আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ: এক বিকেল, এক শহর, এক ইতিহাসগাড়িতে লাগেজ তোলা হলো। এরপর শুরু হলো নতুন অধ্যায়, বাঁশরীর জগৎ। সে কখনো হাসে, কখনো মুখ লুকায়, আবার কখনো অকারণে খিলখিল করে ওঠে। তার ছোট ছোট শব্দ, অদ্ভুত ভঙ্গি এবং নির্ভেজাল আনন্দ সব মিলিয়ে আড়াই ঘণ্টার পথ যেন নিখুঁত সুখযাত্রা হয়ে উঠল। বাড়িতে পৌঁছানোর পর বাঁশরীর আনন্দ যেন আর ধরে না। কখনো দাদু, কখনো মাম্মা, কখনো দিদু, কখনো ঠাম্মি, প্রতিটি ডাকেই মিশে থাকে অপার মাধুর্য। তার ছোট পায়ের দৌড়, হঠাৎ থেমে তাকানো এবং নিঃশব্দ হাসি সব মিলিয়ে পুরো বাড়িটিকে সে জীবন্ত করে তুললো। শেষে ক্লান্ত হয়ে সে সোফায় শুয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে যায়। আমরাও দিনের ক্লান্তি আর আনন্দ একসঙ্গে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ি। সামনে অপেক্ষা করছে নতুন সকাল, বাঁশরীর হাসিতে ভরা আরও অনেক অনাবিল মুহূর্ত।
আরও পড়ুন আমেরিকার মাটিতে বাংলাদেশের ছোঁয়া: জর্জিয়ার এক সবুজ সকাল আটলান্টিকের ঢেউয়ে ভেসে থাকা এক স্মরণীয় বিকেল ইন্ডিয়ানার বিকেল পেরিয়ে আটলান্টার আলোকিত নিশীথেএসইউ