মাসুমুর রহমান মাসুদ
Advertisement
উত্তর উপনিবেশবাদ তত্ত্বের উদ্ভব ও যাত্রা সাধারণ রাজনৈতিক পরিবেশের বিরোধিতা থেকে যাকে সর্বপ্রথম কেতাবি রূপ দেন ফ্রঁৎস ফ্যানন (১৯২৫-১৯৬১)। তাঁর ‘ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্কস’ ১৯৫২ সালে এবং ‘দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ’ ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়। দুটি বই প্রকাশের মাধ্যমে তিনি দেখান, উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রাম তিনটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে এগোয়। প্রথম পর্যায়: উপনিবেশিক জাতি রাজনৈতিক চেতনা লাভ করে। দ্বিতীয় পর্যায়: জাতি তার আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে চায় নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পুনরাবিষ্কার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তৃতীয় পর্যায়: সরাসরি সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে।
ভারতবর্ষে সাঁওতাল ও মুন্ডা আন্দোলনকে বৃটিশরা ‘বিদ্রোহ’ বলে আখ্যায়িত করলেও তা মূলত ছিল একধরনের স্বাধীনতা আন্দোলন। কেবল অরণ্যের অধিকার ফিরে পাওয়া প্রতিবাদ নয়, তাদের আদি সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার লাড়াইও ছিল ওই আন্দোলন। আত্ম ঐতিহ্য চেতনা উদ্ভাবন ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এই বুদ্ধিবৃত্তিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অনন্য ভূমিকা রাখেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, এডওয়ার্ড উইলিয়াম সাঈদ, হোমি ভাবা, স্টুয়ার্ট হল, অনিয়া লুম্বা, জ্ঞান প্রকাশসহ আরও অনেকে।
অস্তিত্বের সংকট আরও প্রকটভাবে ধরা পড়ে নাইজেরিয়ান লেখক আলবার্ট চিনুয়ালুমোগু আচিবের কাছে। তিনি পশ্চিমা লেখকদের সান্নিধ্যে থেকে বুঝতে পারেন এসব লেখক আফ্রিকাকে ‘অন্ধকার মহাদেশ’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। যেখানে মানুষকে চিহ্নিত করা হচ্ছে অসভ্য, বর্বর ও নির্বোধ। পশ্চিমা সাহিত্যে আফ্রিকার মানুষকে ‘অমানবিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার গভীর সাংস্কৃতিক রাজনীতি চালাচ্ছে। এ উপলব্ধি থেকে জন্ম নেয় তাঁর প্রথম ও শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘থিঙ্কস ফল অ্যাপার্ট’ (১৯৫৮); যা শুধু সাহিত্যিক নয়, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রতিরোধের দলিল।
Advertisement
দুই.ফিলিস্তিনিরাও নিজেদের স্বাধীনতা হারিয়েছে। নিজ দেশে তারা এখন বন্দিদশায়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির অস্তিত্ব চরম সংকটে পড়ে। ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিন নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করলেও দেশটিতে ইসরায়েলের দখলদারত্ব বলবৎ আছে। সেই থেকে অদ্যাবধি দফায় দফায় যুদ্ধবিরতী ঘোষণা করা হলেও কিছুদিন পরপর দেশটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইসরায়েল। গাজা উপত্যকার শিশু, যুবক-যুবতি, বৃদ্ধ এমনকি কবি ও সাহিত্যিকরাও বোমা হামলায় অহরহ নিহত হচ্ছেন। ফলে দেশটিতে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
এরই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ হিসেবে কবি, লেখক ও সাহিত্যিকরা লেখনির মধ্য দিয়ে এসব ঘটনার প্রতিবাদ ও নিজেদের অতীত ঐতিহ্য নিয়ে গর্ববোধ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। মাহমুদ দারবিশ তার ‘তদন্ত’ কবিতায় তুলে ধরেন নিজেদের অস্তিত্বের সংগ্রামের কথা—‘হ্যাঁ, লেখোআমি একজন আরবআমার কার্ড নম্বর হল পঞ্চাশ হাজারআমার আটটি সন্তাননবমটি পরবর্তী গ্রীষ্মে জন্মাবেতুমি কি রাগ করলে?’ঐতিহ্য সচেতন কবি তার আরবীয় রীতিনীতির উল্লেখ করে তাদের সততার কথাও তুলে ধরেছেন। একই সাথে অস্তিত্ব রক্ষায় নিজেদের সংগ্রাম এর বিষয়টিও তুলে ধরেছেন বর্ণনার সূক্ষ্মতার মধ্য দিয়ে—‘সাথি শ্রমিকের সাথে আমি পাথর ভাঙিঅমানুষিক পরিশ্রমে আমি পাথুরে পাহাড় ভেঙে নুড়ি করিএক টুকরো রুটির জন্যআমার আট সন্তানের একখানি বইয়ের জন্যকিন্তু আমি দয়া দক্ষিণা চাই নাআর তেহামার কর্তৃত্বের কাছে মাথা নোয়াই নাতুমি কি রাগ করলে?’
ফিলিস্তিনিরা প্রত্যাশা করে দীর্ঘ ভগ্নস্তূপের ওপর জন্ম হোক অগ্নিস্ফূলিঙ্গের। যার মাধ্যমে অত্যাচার, বোমা বর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পাবে গোটা জাতি:‘মানুষের খুলির ওপর, ধ্বংসের ওপরসর্বনাশা হায়েনার ছোবলে ছেঁড়াখোড়া জঞ্জালের ওপরস্ফূলিঙ্গের জন্ম হোকভয় নেই, প্রতিটি গৃহে তলোয়ারের টোকা পড়ছে।’সততার পাশাপাশি তিনি অস্তিত্ব রক্ষায় চরম আঘাত হানতে পারেন বলেও অত্যাচারীদের প্রতি সতর্কতা জারি করেন। তিনি কারো সম্পদ লুণ্ঠন করেন না। তবে কেউ তার সম্পদ লুণ্ঠন করলে তাকেও ছাড় দেন না—‘আমি কেড়ে নেইনি কারো সমূহ সম্পদকিন্তু আমি যখন অনাহারীআমি নির্দ্বিধায় ছিঁড়ে খাইআমার সর্বস্ব লুণ্ঠনকারীর মাংস’অত্যাচারীকে তিনি সাবধান করেছেন:‘অতএব, সাবধানআমার ক্ষুধাকে সাবধানআমার ক্রোধকে সাবধান।’(অনুবাদ: রফিক আজাদ)
আরও পড়ুন বাংলামূলীয়তা: সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার ইতিহাসতিন.বর্তমান ব্রাজিল দেশটি ১৫০০ থেকে ১৮২২ সাল পর্যন্ত পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল। ১৮২২ সালে স্বাধীন হওয়ার পর দেশটি একজন সম্রাট দ্বারা পরিচালিত হয়। ১৮৮৮ সালে দেশটিতে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয়। ১৮৮৯ সালে সামরিক অফিসাররা রক্তপাতহীন ক্যুর মাধ্যমে সম্রাটকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করে ব্রাজিলে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র স্থাপন করা হয়। পরে সেখানে সামরিক জান্তা শাসন শুরু হয়। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত জান্তা শাসন চলে। এই দীর্ঘ পরাধীনতা সে দেশের কবিদের প্রভাবিত করে।
Advertisement
আমাদেউ থিয়াগো দে মেলো (১৯২৬-২০২২) তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন অস্তিত্বের সেই সংকটের কথা। ঈশ্বর যে শান্তি তাদের জন্য রেখেছিল; সেই শান্তি ভোগ করার ভাগ্য তাদের নেই। ‘ঘোষণাপত্র’ কবিতায় মেলো তাই তুলে ধরেন—‘ধারা ৬।শর্তবদ্ধ হলো যে, দশ শতক ধরেপরিপূর্ণ হবে ঈসা নবীর স্বপ্নপাশাপাশি হাঁটবে নেকড়ে এবং খরগোশআহার্য হিসেবে থাকবে প্রতি প্রভাতের সুমিষ্ট সতেজতা।’কিন্তু ঈশ্বরের সেই ঘোষণা রক্ষিত হয়নি। তাই নিষিদ্ধ হলো ভালোবাসা—‘বিশেষ ঘোষণা।নিষিদ্ধ হলো কেবল একটিভালোবাসাহীন ভালোবাসা।’
ব্রাজিলের মানুষ বারবার স্বাধীনতা হারিয়ে পরাধীনতা ও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে। সেই হারানো স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার বাসনা আকুণ্ঠ তাড়া করেছে:‘শেষ ঘোষণা।নিষিদ্ধ হলো ‘স্বাধীনতা’ নামক শব্দতুলে ফেলা হবে তাকে সব অভিধান থেকেএখন থেকে স্বাধীনতাঅগ্নি অথবা স্রোতস্বিনীর মতোঅথবা শস্যকণার মতোজীবন্ত সত্য হবেনিরবধি তা আন্দোলিত হবেহৃদয়ে মানুষের।’(অনুবাদ: হাসান ফেরদৌস)
এভাবে তৃতীয় বিশ্বের কবিরা নিজেদের দেশের, জাতির ঐতিহ্য সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। তারে লেখনিতে উঠে এসেছে উত্তর ঔপনিবেশিক ভাবনা। অস্তিত্বের সংকট যেভাবে অনুভব করেছেন; ঠিক সেভাবে আত্ম, সমষ্টিগত ও জাতিগত জাগরণ প্রত্যাশা নিয়ে কবিতার মধ্য দিয়ে সর্বাত্মক উত্তোরণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, লক্ষ্মীপুর আলিম মাদ্রাসা, চান্দিনা।
এসইউ