আমাদের দেশে প্রচলিত ওয়াজ-মাহফিলে মহানবী হজরত মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অর্থনৈতিক জীবন সম্পর্কে এমন কিছু বর্ণনা শোনানো হয়, যা শুনে সাধারণ মানুষের মনে একটি স্থায়ী ধারণা তৈরি হয় যে তিনি চরম দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের মধ্যে জীবন পার করেছেন। তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র খুব সামান্য ছিল, তাঁর বর্ম বন্ধক রাখা ছিল এবং ঘরে দিনের পর দিন খাবার থাকত না—এই ধরনের খণ্ডিত বর্ণনাগুলো শুনে অনেকে মনে করেন যে ইসলামে আধ্যাত্মিকতা বা ধার্মিকতা অর্জনের পথই হলো দুনিয়া ত্যাগ করা এবং চরম দারিদ্র্য বেছে নেওয়া। কিন্তু রাসুলুল্লাহর (সা.) সামগ্রিক অর্থনৈতিক জীবন এবং ইসলামের মূল দর্শনের দিকে তাকালে বোঝা যায় যে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ সঠিক নয় এবং এর পেছনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ভুল ব্যাখ্যা রয়েছে।
Advertisement
মহানবীর (সা.) নবুয়্যতপূর্ব জীবন ও নবুয়্যতপরবর্তী মক্কী জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে সেটি অভাব-অনটনের জীবন ছিল না, বরং তা ছিল অত্যন্ত সচ্ছল এক ব্যক্তির জীবন। তিনি নিজে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। পরবর্তীতে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজার (রা.) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তাঁর জীবনে যে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও প্রাচুর্য আসে, তার স্পষ্ট প্রমাণ ইতিহাসে রয়েছে। সে সময়ে তাঁর দস্তরখান ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত এবং তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই ভালো ছিল যে তিনি বহু মানুষের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিজে বহন করতেন। সিরাত ও ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে এই বিষয়গুলোর চমৎকার ও বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়, যেগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে মহানবীর (সা.) অর্থনৈতিক জীবন এই সময়ে কতটা সমৃদ্ধ ছিল।
মদিনায় হিজরতের পর প্রাথমিক অবস্থায় মুসলমানদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা বদলে যায়। মক্কা থেকে সবকিছু ছেড়ে মুহাজিররা যখন মদিনায় আসেন, তখন স্বভাবতই এক বিশাল মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়। একই সাথে মহানবীর (সা.) ওপর শুধু দ্বীন প্রচারের দায়িত্বই নয়, বরং একটি নবগঠিত রাষ্ট্রের পরিচালনার দায়িত্বও এসে পড়ে। দল বেঁধে মুহাজিরদের কাফেলা মদিনায় আসছিল এবং তাদের সবাইকে পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়নি। ‘আহলুস সুফফা’র অধিবাসীরা মসজিদে নববিতে থাকতেন।
এমতাবস্থায় সমাজের ও রাষ্ট্রের প্রধান অভিভাবক বা পিতা হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বেচ্ছায় একটি অতি সাধারণ ও কৃচ্ছ্রতার জীবন বেছে নেন। এটি কোনো নিয়তি বা ভাগ্যের চাপিয়ে দেওয়া দারিদ্র্য ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত। মুসলমানদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রে যে সম্পদ বা সাহায্য আসত, নবীজির (সা.) প্রধান লক্ষ্যই ছিল তা দিয়ে আগে মুহাজির ও অভাবী মানুষদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি নিজের পরিবারের ওপরও কঠোরতা আরোপ করেছিলেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, যতক্ষণ না সমাজের এই অভাবী মানুষদের দায়িত্ব তিনি পুরোপুরি সম্পন্ন করতে পারছেন, ততক্ষণ তিনি নিজের ঘরে আরাম-আয়েশ বা প্রাচুর্য চান না।
Advertisement
ওয়াজ-মাহফিলে বা সাধারণ আলোচনায় মানুষ এই কৃচ্ছ্রতার সময়টুকুর কথা ঢালাওভাবে বর্ণনা করে, কিন্তু এর পেছনের মূল কারণ ও প্রেক্ষাপটটি উল্লেখ করে না।
জীবনের শেষভাগে এসে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। একের পর এক বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয় এবং আল্লাহ তাআলা বিপুল সচ্ছলতা দান করেন। সে সময়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও গণিমতের প্রাচুর্যের কারণে নবীজির (সা.) পারিবারিক জীবনেও যথেষ্ট সচ্ছলতা আসে।
যদি দুনিয়া ত্যাগ করা বা অভাব-অনটনে থাকাই নবী বা রাসুল হওয়ার মূল শর্ত বা দ্বীনের লক্ষ্য হতো, তবে পূর্ববর্তী মহান নবীগণ—যেমন হজরত সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) ও হযরত দাউদের (আলাইহিস সালাম) ব্যাপারে পবিত্র কোরআন ভিন্ন কথা বলত না। কুরআনেই বর্ণিত হয়েছে যে আল্লাহ তাআলা তাঁদের বিশাল রাজত্ব, বৈষয়িক ক্ষমতা এবং অতুলনীয় শিল্প ও সম্পদ দান করেছিলেন।
পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় ধন-সম্পদকে ‘খাইর’ বা কল্যাণ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। মানুষ যখন হালাল উপায়ে সম্পদ অর্জন করতে বের হয়, তখন কোরআন তাকে ‘আল্লাহর ফজল বা অনুগ্রহের সন্ধান’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সুরা জুমুআতেও ব্যবসার উদ্দেশ্যে বের হওয়াকে আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ বলা হয়েছে। সমাজে যখন এমন সামর্থ্যবান মানুষ তৈরি হন যারা বড় কলকারখানা স্থাপন করেন, বিশাল কৃষিকাজের ব্যবস্থা করেন কিংবা বড় বাণিজ্যিক কাফেলা পরিচালনা করেন, তখন তাদের মাধ্যমে সমাজে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার পথ সুগম হয়। এটি আল্লাহর অন্যতম বড় নেয়ামত ও রহমত।
Advertisement
মানুষের জীবনে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের ভিন্নতা থাকতে পারে। একজন মানুষ আলেম বা বুদ্ধিজীবী হতে পারেন, একজন গবেষক হতে পারেন, আবার অন্য একজন মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে তিনি বড় শিল্পকারখানা গড়বেন, বড় ল্যাবরেটরি তৈরি করবেন এবং গবেষণার মাধ্যমে মানবজাতির সেবা করবেন। একেক জনের কর্মক্ষেত্র ও সিদ্ধান্ত একেক রকম হতে পারে। কেউ যদি দ্বীনের বা জ্ঞানের কোনো বড় লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে চান, তবে অনেক সময় তাঁকে ব্যবসার মতো বৈষয়িক সচ্ছলতাকে বিদায় জানিয়ে কিছুটা সাধারণ জীবন বেছে নিতে হয়। এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
আমাদের সমাজে সুফিবাদের একটি ধারা রয়েছে, যেখানে আধ্যাত্মিকতা অর্জনের জন্য কম খাওয়া, কম ঘুমানো বা কম কথা বলাকে বাধ্যতামূলক মনে করা হয় এবং সম্পদ অর্জনকে নেতিবাচক চোখে দেখা হয়। কিন্তু ইসলামের মূল বার্তা হলো, মানুষের জীবন, সম্পদ এবং সম্মান অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাবান। আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে সমস্ত নেয়ামত দিয়েছেন, তার ভেতরে থেকে আল্লাহর বেঁধে দেওয়া সীমানা মেনে জীবনযাপন করাই হলো ইসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
মদিনার জীবনে মহানবী (সা.) যে সাধারণ ও কঠিন জীবনযাপন করেছিলেন, তা কোনো সুফিয়ানা দারিদ্র্য বা দুনিয়াত্যাগের দৃষ্টান্ত ছিল না। বরং তা ছিল একজন রাষ্ট্রপ্রধান ও সমাজ সংস্কারকের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা, দূরদর্শিতা এবং প্রজাবাৎসল্যের এক অনন্য ও চিরকালীন উদাহরণ, যা যুগে যুগে শাসকদের জন্য এক চরম শিক্ষণীয় আদর্শ হয়ে আছে ও থাকবে।
সূত্র: ইউটিউব চ্যানেল Ghamidi Center Of Islamic Learning-এ প্রকাশিত জাভেদ আহমদ ঘামিদির رسول اللہ کی معاشی زندگی শীর্ষক বক্তব্য থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।
ওএফএফ