আইন-আদালত

বাজেটে বিচারব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরে জোর

বিচারব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত ও জনবান্ধব করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট উত্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আইন ও বিচার বিভাগের জন্য মোট ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বরাদ্দের প্রস্তাব করেন।

Advertisement

প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের জন্য এক হাজার ৯৯৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য ১৮৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে আবর্তক ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৯৪১ কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং মূলধন ব্যয় ১৮৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এছাড়া আর্থিক সম্পদ খাতে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।  

আইন ও বিচার বিভাগের কাজ কী

আইন ও বিচার বিভাগ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে সাংবিধানিক ও আইনগত বিষয়ে পরামর্শ প্রদান, দরিদ্র বিচারপ্রার্থীদের আইনগত সহায়তা প্রদান, সুপ্রিম কোর্ট-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি পরিচালনা, প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতিদের নিয়োগ ও চাকরির শর্তাবলি সংক্রান্ত বিধি-বিধান প্রণয়ন, আদালত ভবন নির্মাণ ও সংস্কারের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারের পক্ষে বিভিন্ন আদালতে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে।

আরও পড়ুন কিছু ব্যাংক থেকে এক-তৃতীয়াংশ টাকা চুরি হয়ে গেছে: গভর্নর

এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিসংক্রান্ত মামলা ও আপিল নিষ্পত্তি, আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ফি, জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি নির্ধারণ এবং ভূমি ও নিকাহ নিবন্ধন-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমও বিভাগটির আওতাভুক্ত। 

Advertisement

ই-জুডিসিয়ারি প্রকল্পে গুরুত্ব

বাজেটে বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়নকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে অধস্তন আদালতের বিচারব্যবস্থা অটোমেশনের জন্য ‘ই-জুডিসিয়ারি’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মামলা দাখিল, নথি ব্যবস্থাপনা, শুনানির সময়সূচি নির্ধারণ এবং বিচারিক তথ্য সংরক্ষণ আরও সহজ ও দ্রুত হবে। একই সঙ্গে মামলার জট কমানো এবং বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি হ্রাসেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

ভূমি, বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনে ডিজিটাল সেবা

বাজেটে ‘ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা অটোমেশন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির জন্য ‘বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নিবন্ধনসেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সেবার গতি বাড়বে এবং নাগরিক ভোগান্তি কমবে।  

Advertisement

নারী ও শিশুদের ন্যায়বিচারে বিশেষ উদ্যোগ

নারীদের জন্য ন্যায়বিচারের প্রবেশাধিকার বাড়াতে কমিউনিটি বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মামলা পরিচালনার মানোন্নয়ন এবং মধ্যস্থতা ও সিভিল লিটিগেশন প্রক্রিয়ার বিকাশের মাধ্যমে ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

আরও পড়ুন বাজেটে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ ২১৮৮ কোটি টাকা

এছাড়া শিশুদের জন্য বিকল্প ও রেস্টোরেটিভ বিচারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হবে, যা শিশুবান্ধব ও মানবিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।  

আদালতের অবকাঠামো উন্নয়নেও বড় পরিকল্পনা

ডিজিটাল রূপান্তরের পাশাপাশি বিচার বিভাগের অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনসমূহের অবকাঠামো নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক সুবিধা নিশ্চিতকরণ, নির্বাচিত জেলাগুলোতে জেলা জজ আদালত ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ এবং চৌকি আদালতসমূহের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

এছাড়া বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য রেকর্ড ভবন নির্মাণ, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত মাজার মসজিদ নির্মাণ, বিভিন্ন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে নতুন গাড়ি সরবরাহ বা প্রতিস্থাপন এবং ‘জেলা ও দায়রা জজদের বাসভবন নির্মাণ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।  

কোন প্রতিষ্ঠানে কত বরাদ্দ

আইন ও বিচার বিভাগের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে সচিবালয়, আইন ও বিচার বিভাগ। এ প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৫৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

এছাড়া দেওয়ানি ও দায়রা আদালতসমূহের জন্য ৬০৮ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহের জন্য ৪১১ কোটি ২ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ আদালত ও ট্রাইব্যুনাল এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ পেয়েছে।  

বাংলাদেশ জুডিসিয়াল একাডেমি স্থাপনের উদ্যোগ

বিচারকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিচারব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল একাডেমি স্থাপন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে বাজেটে। এর মাধ্যমে বিচারকদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।

সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিচার ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নারী ও শিশুদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং বিচারিক সেবার আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘোষিত প্রকল্পগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের বিচারব্যবস্থা আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে। 

এমডিএএ/কেএসআর