খেলাধুলা

এ এক অজানা ইতিহাস: ব্রাজিলকেও হারিয়েছিল হাইতি!

২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ক্যারিবিয়ান দেশ হাইতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে লাতিন পরাশক্তি ব্রাজিল। এই ম্যাচটির আগে ঘুরে-ফিরে আসছে দুই দেশের আগের তিনবারের মুখোমুখি হওয়ার ইতিহাস। যেখানে তিন ম্যাচে হাইতিকে ১৭ গোল দিয়েছিল ব্রাজিলিয়ানরা এবং হজম করেছিল মাত্র একটি গোল। সর্বশেষ ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ম্যাচে হাইতিকে ৭-১ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিল।

Advertisement

কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এমন একটি অধ্যায় আছে, যা অনেকেরই অজানা। অধিকাংশ ফুটবল ভক্তই সে ইতিহাস জানে না। এক সময় ব্রাজিলকেও হারিয়ে দিয়েছিল হাইতি। শুধু হারিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সাত গোলের রোমাঞ্চকর ম্যাচে ৪-৩ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল ক্যারিবীয় দেশটি।

১৯৯৯ সালের ৮ জুন ত্রিনিদাদ ও টোবাগোয় অনুষ্ঠিত ক্যারিবিয়ান কাপের শেষ পর্বে ঘটেছিল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। প্রায় ২৭ বছর আগে পোর্ট অব স্পেনের ড. হোয়াও হাভেলাঞ্জ সেন্টার অব এক্সিলেন্স স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল হাইতি। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, ম্যাচটি আজও বহু জনপ্রিয় পরিসংখ্যানভিত্তিক ডাটাবেসে অনুপস্থিত। কোনো ইতিহাস, কোনো পরিসংখ্যানে এই ম্যাচটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

বর্তমানে ব্রাজিল ও হাইতির মুখোমুখি লড়াইয়ের হিসাব করতে গেলে বেশিরভাগ পরিসংখ্যান সংস্থা মাত্র তিনটি ম্যাচের তথ্য দেয়। ১৯৭৪ ও ২০০৪ সালের দুটি প্রীতি ম্যাচ এবং ২০১৬ কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর ম্যাচ। এই তিনটিতেই বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালের ওই ম্যাচ যেন ইতিহাসের আড়ালেই থেকে গেছে।

Advertisement

মিয়ামিভিত্তিক অলাভজনক সংগঠন ‘লিটল হাইতি এফসি’র প্রতিষ্ঠাতা এবং হাইতির ফুটবল সমর্থক গোমেজ ডন লালো বলেন, ‘একটু খুঁজলে এখনো এই ম্যাচের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু এটি মূলধারার ফুটবল ইতিহাস থেকে প্রায় হারিয়েই গেছে।’

মজার ব্যাপার হলো, ম্যাচটির বিস্তারিত বিবরণ নিয়েও রয়েছে মতভেদ। কিছু সূত্র বলছে প্রথমার্ধ গোলশূন্য ছিল, আবার কিছু তথ্য অনুযায়ী মিশেল গ্যাব্রিয়েল বিরতির আগেই হাইতিকে এগিয়ে দিয়েছিলেন। তবে একটি বিষয়ে সবাই একমত- শেষ পর্যন্ত স্কোরলাইন ছিল ৪-৩, আর জয়ী দল ছিল হাইতি। ব্রাজিলকে হারিয়ে তারা উঠেছিল সেমিফাইনালে।

তবে ব্রাজিলের সেই দলটি মূল জাতীয় দল ছিল না। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন আমন্ত্রণ গ্রহণ করে টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও সেখানে পাঠিয়েছিল অনূর্ধ্ব বা তরুণ খেলোয়াড়দের একটি দল। উইকিপিডিয়া বলছে, দলটি ছিল অনূর্ধ্ব-২০। ফলে রোনালদো, রিভালদো, কাফু কিংবা রবার্তো কার্লোসের মতো তারকারা ছিলেন না সেই দলে।

সেই দলে ছিলেন পরবর্তীতে ইউরোপীয় ফুটবলে পরিচিতি পাওয়া কয়েকজন ফুটবলার। লুইজাও, এদু দ্রাসেনা, ফাবিও রোশেমব্যাক, আলেসান্দ্রো সালভিনো, মার্সিনিও, এভারটন এবং হুলিয়ানো ভিসেন্তিনির মতো খেলোয়াড়রা ছিলেন সেই স্কোয়াডে।

Advertisement

একই সময়ে ব্রাজিলের মূল জাতীয় দল নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলছিল। ভ্যান্ডারলেই লুক্সেমবার্গোর অধীনে ওই ম্যাচে ৩-১ ব্যবধানে জয়ও পেয়েছিল সেলেসাওরা। ফলে ক্যারিবিয়ান কাপে তরুণ দলের ব্যর্থতা তেমন আলোচনায়ই আসেনি। সম্ভবত, এ কারণে ইতিহাস বা পরিসংখ্যানগত কোনো কিছুতেই ঠাঁই পায়নি ম্যাচটি।

ব্রাজিলের সাবেক ফুটবলার হুলিয়ানো ভিসেন্তিনি পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘যা আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল, তা ছিল তাদের শারীরিক শক্তি। আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় দলের বিপক্ষে খেলছিলাম। তারা ছিল আমাদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, বেশি অভিজ্ঞ এবং দ্রুতগতির।’

ব্রাজিলকে হারানোর পর হাইতি টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে উঠেছিল। যদিও সেখানে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর কাছে হেরে যায় তারা। পরে স্বাগতিকরাই শিরোপা জিতে নেয়।

দুই দশকেরও বেশি সময় পর আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলের বিপক্ষে নামার আগে সেই স্মৃতি নতুন করে উজ্জীবিত করছে হাইতির সমর্থকদের। গোমেজ ডন লালো বলেন, ‘কেউ কাঁদছে, কেউ উদযাপন করছে। কারণ এমন একটি মাইলফলক আমাদের জন্য অসাধারণ ব্যাপার। হাইতিতে মানুষ ফুটবল নিয়েই বাঁচে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশ নিয়ে গর্বিত। মানুষ আমাদের বিশ্বাস থেকে বিরত রাখতে পারবে না। আমরা কী অর্জন করতে পারি, সেটিতে আমাদের আস্থা আছে। তাই পুরো সম্প্রদায়ই উচ্ছ্বসিত।’

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হেরেছে হাইতি। অন্যদিকে ব্রাজিল এসেছে ফেবারিটের তকমা নিয়ে। যদিও প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে তারা। তবু ইতিহাস বলছে, অসম্ভব বলে কিছু নেই। কারণ একসময় ফুটবল বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে ব্রাজিলকে হারিয়েছিল হাইতি।

সূত্র: টিওয়াইসি স্পোর্টস

আইএইচএস/