জাতীয়

মাইলস্টোনে বোন হারানো তাহসিনের হাসির গল্প ছুঁয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে

রাজধানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে গত সোমবার অনুষ্ঠিত নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের সমাপনী অনুষ্ঠানে তোলা একটি ছবি মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। হাজারো শিশুর ভিড়ে স্কুল ড্রেস পরা এক কিশোরের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া দুই হাত আর মুখভরা হাসি স্পর্শ করে অনেক মানুষকে।

Advertisement

ছবির সেই কিশোর তাহসিন আব্দুল্লাহ। তবে সেই হাসির পেছনে রয়েছে এক গভীর বেদনার গল্প।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় তাহসিন হারায় তার বড় বোন তাসনিয়াকে। একই স্কুলে পড়লেও সেদিন তারা ছিল দুটি আলাদা ভবনে। তাহসিন তখন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী, আর তাসনিয়া পড়ত অষ্টম শ্রেণিতে। যুদ্ধবিমানটি আছড়ে পড়ে তাসনিয়াদের ভবনে।

বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তাহসিন দৌড়ে যায় বড় বোনকে খুঁজতে। কারও কাছ থেকে শুনেছিল স্যালাইন ও পানির প্রয়োজন। বড় বোনের জন্য ছোট্ট দুই হাতে স্যালাইন ও পানির বোতল নিয়ে অপেক্ষা করেছিল সে। কিন্তু সেই অপেক্ষার আর অবসান হয়নি।

Advertisement

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুর্ঘটনার পর বদলে যায় তাহসিন। এক হিলিং সেশনে সে কাগজে লিখেছিল, ‘আমার কষ্ট অনেক। আমি আমার প্রিয় বোনকে হারিয়ে ফেলেছি। সে মারা গেছে। ওকে আমি অনেক অনেক মিস করি, ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।’

বোনকে হারানোর পর থেকে তাহসিনের মুখে আগের মতো প্রাণখোলা হাসি দেখা যেত না।

আরও পড়ুন কষ্টগুলো নীল জলে ভাসিয়ে দিলাম, বললো মাইলস্টোনের শিশুরা

তবে গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে দেখা যায় অন্য এক তাহসিনকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাঠ প্রদক্ষিণ করার সময় তার কাছাকাছি আসার মুহূর্তে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে শিশুটি। সেই নির্মল হাসি ও উচ্ছ্বাস ক্যামেরাবন্দি হয়। পরে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য মানুষ তাহসিনের হাসির সঙ্গে নিজেদের অনুভূতি মিলিয়ে নেন।

পরে প্রধানমন্ত্রী জানতে পারেন, ছবির সেই হাসিমাখা মুখটির পেছনে রয়েছে এক হৃদয়বিদারক পারিবারিক ইতিহাস। বিষয়টি জানার পর তিনি তার অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে তাহসিন ও তার পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দেন।

Advertisement

এরই ধারাবাহিকতায় আজ বুধবার (২৯ জুলাই) বাবা নাজমুল হককে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তাহসিন। বর্তমানে সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবারে তার নার্সারিতে পড়ুয়া আরও একটি ছোট বোন রয়েছে।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাহসিনের পড়াশোনার খোঁজখবর নেন এবং বড় হয়ে কী হতে চায়, তা জানতে চান। জবাবে তাহসিন জানায়, সে বড় হয়ে একজন সফল ব্যবসায়ী হতে চায়। পাশাপাশি এমন কিছু করতে চায়, যার মাধ্যমে মানুষের উপকার হবে এবং যার প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হবে।

প্রধানমন্ত্রী তার এই স্বপ্নের প্রশংসা করেন। তিনি মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া, নিয়মিত খেলাধুলা এবং নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

আলাপচারিতায় তাহসিন জানায়, তার সবচেয়ে প্রিয় খেলা ফুটবল। পরে প্রধানমন্ত্রী নিজের সই করা একটি ফুটবলসহ বিশেষ উপহার তাহসিনের হাতে তুলে দেন।

সাক্ষাৎ শেষে উচ্ছ্বসিত তাহসিন জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আবারও দেখা করতে পেরে সে খুবই আনন্দিত। এমন একটি সুযোগ পাবে, তা সে কল্পনাও করেনি। পুরো বিষয়টিই তার কাছে ছিল একেবারে সারপ্রাইজ।

সে জানায়, স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্প শোনানোর জন্য সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

আরও পড়ুন নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস / মাঠে প্রধানমন্ত্রী, সমাপনীতে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেবেন পুরস্কার

তাহসিন আরও জানায়, প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে একেবারে পরিবারের একজনের মতো কথা বলেছেন। তাই তার মোটেও নার্ভাস লাগেনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কক্ষও ঘুরে দেখেছে সে। সেখানে রাখা গাড়ি ও জাহাজের রেপ্লিকা তাকে মুগ্ধ করেছে। বাবার মোবাইল ফোন দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেলফিও তুলেছে সে।

মাইলস্টোনের যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো তাহসিনের বাবার প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ মো. মেহেদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত সহযোগী অধ্যাপক (অর্থোপেডিক) ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব-১ জাহিদুল ইসলাম রনি এবং ‘আমরা বিএনপি পরিবার’র সদস্য সচিব মোকছেদুল মোমিন মিথুন উপস্থিত ছিলেন।

কেএইচ/এমআইএইচএস