জামালপুরের ইসলামপুরে এতিমখানার পরিচালনা কমিটি অনুমোদনকে কেন্দ্র করে উপজেলা সরকারি কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও সমাজসেবা কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক মো. আ. লতিফ মিয়াকে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদুর রহমান মলিনের বিরুদ্ধে।
Advertisement
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকেলে উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের পাশে সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক ও প্রশাসক গোপনীয় সহকারী (সিএটু) মো. সুমন মণ্ডলের কক্ষে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন উপজেলার চরপুটিমারী ইউনিয়নের বেনুয়ারচর আব্দুল মালেক মণ্ডল এতিমখানার পরিচালনা কমিটি নিয়ে স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। কমিটি অনুমোদনকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে।
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ইসলামপুর উপজেলায় ১৪টি এতিমখানা রয়েছে। এর মধ্যে আটটি এতিমখানার পরিচালনা কমিটির মেয়াদ গত জুন মাসে শেষ হয়েছে। এসময় কিছু সরকারি বরাদ্দ আসায় সংশ্লিষ্ট এতিমখানাগুলোর বিল প্রস্তুত ও বরাদ্দের অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়া কমিটিগুলোর অনুমোদনের বিষয়টি সামনে আসে।
Advertisement
এর মধ্যে চরপুটিমারী ইউনিয়নের বেনুয়ারচর আব্দুল মালেক মণ্ডল এতিমখানার পরিচালনা কমিটির মেয়াদ গত ২৫ জুন শেষ হয়। এরপর আগের কমিটির পক্ষ থেকে পুনরায় কমিটি অনুমোদনের জন্য উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করা হয়। এ খবর পেয়ে অপর পক্ষও নতুন কমিটির অনুমোদন চেয়ে আবেদন করে। দুই পক্ষের আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে পাঠানো হয়। জেলা কার্যালয় থেকে যে কমিটি অনুমোদন দেওয়া হবে, সেটিই কার্যকর হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, এতিমখানার কমিটি অনুমোদন নিয়ে বিরোধের জেরে মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কর্মচারী মো. আ. লতিফ মিয়ার সঙ্গে হামিদুর রহমান মলিনসহ কয়েকজনের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাকে গালিগালাজ, হেনস্তা ও মারধরের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন লতিফ মিয়া। এসময় তার বিরুদ্ধে কমিটি অনুমোদনের জন্য ৫০ হাজার টাকার বান্ডিল চাওয়ার অভিযোগ তোলা হয় এবং সেই অভিযোগের ভিডিও ধারণের চেষ্টা করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনার পর উপজেলা হিসাবরক্ষণ ও সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান। পরে বিষয়টি জেলা প্রশাসককেও অবহিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলা পরিষদের সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক ও প্রশাসক গোপনীয় সহকারী (সিএটু) মো. সুমন মণ্ডল বলেন, ‘আনসার সদস্যসহ অন্যান্য কর্মচারীদের চেষ্টায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে।’
Advertisement
ইউএনওর উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা এহসানুল হক বলেন, ‘মারধর করা হয়েছে কি না, সেটা আমি দেখিনি। পাশের কক্ষে অবস্থানকালে হৈ-হুল্লোড় শুনতে পাই। দ্রুত সেখানে গিয়ে সবার সহযোগিতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছি।’
ইউএনও কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা বিষয়টি নিয়ে দুঃখিত।’
ভুক্তভোগী মো. আ. লতিফ মিয়া বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকেলে ফ্যামিলি কার্ড জরিপ কাজে সুপারভাইজার পদে নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ইউএনও স্যারের কার্যালয়ে আমার পেশাগত দায়িত্ব ছিল। যথাসময়ে উপস্থিত হয়ে ইউএনও স্যারের কার্যালয়ের পাশে সিএটু সুমন মণ্ডলের কক্ষে অবস্থান করি। এসময় আমার মোবাইল ফোনে অপরিচিত একটি নম্বর থেকে কল আসে। কল রিসিভ করা মাত্রই অপরিচিত ব্যক্তি আমাকে উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে যাওয়ার জন্য ডাকেন। আমি নিয়োগ পরীক্ষার কাজে থাকার বিষয়টি তাকে জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর ইসলামপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদুর রহমান মলিনের নেতৃত্বে একদল লোক এসে এতিমখানার কমিটি অনুমোদন কেন হচ্ছে না, তা আমার কাছে জানতে চান। বিষয়টি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলামাত্রই তারা আমাকে গালিগালাজ করেন এবং হামলা চালান। আমাকে কিল-ঘুষি মারার চেষ্টা করা হয়। পরে খবর পেয়ে পাশে থাকা আনসার সদস্য ও সরকারি কর্মচারীরা আমাকে উদ্ধার করেন।’
লতিফ মিয়া আরও অভিযোগ করেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কমিটি অনুমোদনের জন্য ৫০ হাজার টাকার বান্ডিল চাওয়ার অভিযোগ তুলে আমাকে হেনস্তা করা হয়েছে এবং ভিডিও ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে। আমি কোনো অন্যায় করিনি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাকে যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, গালিগালাজ ও মারধরের চেষ্টা করা হয়েছে, আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
অপরদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে ইসলামপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদুর রহমান মলিন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অযথা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। মূলত এতিমখানার কমিটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। আমি বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছি। এখন উল্টো আমার বিরুদ্ধেই মনগড়া অভিযোগ করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যিনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন, তিনি কমিটি অনুমোদনের জন্য ২০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ্ মো. জুবায়ের বলেন, ‘ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। বিষয়টি জেলা প্রশাসক স্যার জানেন। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মারধরের ঘটনা ঘটেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি বাইরে ছিলাম। কার্যালয়ে এসে জানতে পেরেছি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। আগামীকাল আইনশৃঙ্খলা বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।’
হৃদয় আহম্মেদ/এফএ/জেআইএম