উস্তাদ মোহাম্মদ বাজুর
Advertisement
একটি চমৎকার হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘চারটি বিষয় মানুষের জীবনে আনন্দ ও সুখ নিয়ে আসে; এক. নেককার স্ত্রী, দুই. সৎ ও ভালো প্রতিবেশী, তিন. প্রশস্ত বাসস্থান এবং চার. একটি সচল ও আরামদায়ক বাহন। একইভাবে চারটি বিষয় মানুষের জীবনে কষ্ট ও দুর্দশা নিয়ে; চরিত্রহীন বা অসৎ স্ত্রী, খারাপ বাহন, খারাপ প্রতিবেশী এবং সংকীর্ণ বা ছোট বাসস্থান।’
আসুন, এই বিষয়গুলো আমরা একে একে বোঝার চেষ্টা করি।
প্রথমেই আসা যাক নেককার বা ধার্মিক স্ত্রীর প্রসঙ্গে। আপনি যদি বিবাহিত হন এবং আপনার ঘরে একজন নেককার স্ত্রী থাকেন, তবে বিষয়টি আপনি খুব ভালো করেই অনুধাবন করতে পারবেন। ঘরে যদি একজন ভালো স্ত্রী থাকল জীবনের বাকি সবকিছু এমনিতেই সুন্দরভাবে বিন্যস্ত হয়ে যায়। আর যদি এর বিপরীতটি ঘটে, তবে পুরো জীবনই বিষাদময় হয়ে ওঠে।
Advertisement
আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, পার্থিব জীবনের সর্বোত্তম সম্পদ হলো নেককার স্ত্রী। আমাদের সমাজে কিংবা পশ্চিমা বিশ্বে বলা হয়, ‘স্ত্রী যদি খুশি থাকে, তবে জীবনও সুখী হয়।’ কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, ‘স্ত্রী যদি দ্বীনদার ও নেককার হন, তবেই জীবন আনন্দময় হয়।’
যখন ঘরে এমন একজন নারী থাকেন যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তিনি আপনার অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করেন, সন্তান প্রতিপালনে আল্লাহকে ভয় করেন এবং নিজের ইবাদত-বন্দেগিতে আল্লাহকে ভয় করেন, তখন পুরো সংসারের চিত্রই বদলে যায়।
সর্বোত্তম নারী কে—এই প্রশ্নের জবাবে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, সে-ই উত্তম নারী, যার স্বামী তার দিকে তাকালে সে স্বামীর মন আনন্দে ভরিয়ে দেয়; স্বামী কোনো ন্যায়সঙ্গত নির্দেশ দিলে তা সানন্দে মেনে নেয়; আর স্বামী যখন বাইরে বা সফরে থাকে, তখন সে তার সতিত্ব, স্বামীর ঘর ও সম্পদ আমানত হিসেবে হেফাজত করে।
আজ আমাদের অনেক ঘরই যেন একেকটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। স্বামী ঘরে ফিরতে চায় না, আর স্ত্রীও অধীর আগ্রহে স্বামীর পথ চেয়ে বসে থাকে না। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? এর প্রধান কারণ হলো, আমরা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে শিখিনি।
Advertisement
আমরা গাড়ি চালানো শেখার জন্য ত্রিশ-চল্লিশ দিন বা তারও বেশি সময় ব্যয় করি; কীভাবে গাড়ি থামাতে হয়, কীভাবে সমান্তরাল পার্কিং করতে হয় তা বিস্তারিত শিখি। কিন্তু বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা সম্পূর্ণ উদাসীন। ভাবি, সব নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। আমি জানি না আমার কী অধিকার আর কী দায়িত্ব, স্ত্রীও জানে না তার কী প্রাপ্য আর কী কর্তব্য। আর এই অজ্ঞতা থেকেই যাবতীয় দ্বন্দ্বের সূচনা হয়।
আমরা যেমন কর্মক্ষেত্রে গেলে নির্দিষ্ট দায়িত্বের তালিকা পাই কী করতে হবে আর কী করা যাবে না এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে পদোন্নতি পাই ও সবাই সুখে থাকি; ঠিক একইভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেও দায়িত্ব জানা প্রয়োজন।
স্বামী যখন তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে, স্ত্রীকে সম্মান ও মর্যাদা দেবে এবং তার প্রয়োজনীয় খেয়াল রাখবে, তখন একজন দ্বীনদার স্ত্রীও নিজের দায়িত্ববোধ থেকে সেই শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার প্রতিদান দেবে।
আমার বোনদের বলি, স্বামী যখন তার সমস্ত দায়িত্ব পালন করে আপনাকে সম্মানের আসনে বসায়, তখন ঘরে ফিরে সে একটু শান্তি চায়। সে আশা করে ঘরে এসে একটা সুন্দর পরিবেশ পাবে, পরিচ্ছন্ন ঘর দেখবে এবং সন্তানরা তাকে হাসিমুখে বরণ করে নেবে। এমনকি আপনি যদি চাকরিও করেন, তবে চাকরি ও সংসারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
হাদিসে এসেছে, কোনো নারী যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিকমতো আদায় করে, রমজান মাসের রোজা রাখে, নিজের সতিত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তবে সে জান্নাতের যে কোনো দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে।
আজকাল অনেক বোন ‘স্বামীর আনুগত্য’ শব্দটিতে অস্বস্তি বোধ করেন। তাঁরা মনে করেন এটা বুঝি কোনো আলেম বা শায়খের মনগড়া কথা। অথচ যিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং রমজানের রোজার নির্দেশ দিয়েছেন, তিনিই স্বামীর আনুগত্যের কথা বলেছেন।
খেয়াল করে দেখুন, এই আনুগত্যের বিষয়টি ডান হাতে খাওয়া বা বাম পায়ে বাথরুমে ঢোকার মতো সাধারণ কোনো নফল বা মুস্তাহাব বিষয়ের সাথে আসেনি, এসেছে দ্বীনের মৌলিক স্তম্ভগুলোর সাথে। কাজেই নামাজ ও রোজার মতোই ন্যায়সঙ্গত ক্ষেত্রে স্বামীর আনুগত্য করাও একটি বড় ইবাদত, বিশেষ করে স্বামী যখন তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে।
ভাইদের বলি, স্ত্রীকে সম্মান করুন, তার পাওনা বুঝিয়ে দিন। একজন নেককার স্ত্রী নিশ্চয়ই আপনাকে তার দ্বিগুণ ভালোবাসা ও সম্মান ফিরিয়ে দেবে।
আরও পড়ুন সুখী পরিবার গঠনে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্বআল্লাহ তাআলা তিনটি কাজকে কঠোরভাবে হারাম করেছেন; কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া, মায়ের সাথে অবাধ্যতা বা অসৌজন্যমূলক আচরণ করা এবং নিজের পাওনা বা অধিকার ঠিকই দাবি করা কিন্তু অন্যের পাওনা পরিশোধ না করা।
মায়ের অবাধ্যতা এবং সন্তানকে জীবন্ত হত্যা করার মতো ভয়াবহ অপরাধের সাথে এই আচরণকে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে মানুষ নিজের সুবিধা পুরোটা চায় কিন্তু নিজের দায়িত্বটুকু পালন করতে চায় না। এটি স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। আপনার পাওনা অধিকার পেতে হলে আগে অপরপক্ষের পাওনা মিটিয়ে দিন।
স্ত্রী যদি অসুস্থ থাকে, সন্তান হওয়ার পর শারীরিক কষ্টে থাকে কিংবা ভালো বোধ না করে, তবে আপনি যদি এগিয়ে গিয়ে তাকে ঘরের কাজে সাহায্য করেন, তবে আপনি রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্দর একটি সুন্নতের অনুকরণ করবেন।
অনেক পুরুষ মনে করেন ঘরের কাজে সাহায্য করলে বুঝি তাঁদের পুরুষত্ব কমে যাবে। মোটেও তা নয়। আমাদের চেয়ে বহুগুণ উত্তম ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে ঘরের কাজে সহায়তা করতেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরটি কত বড় ছিল? দশ ফুট বাই পনেরো ফুট! আজকের দিনে আপনাদের জামাকাপড় রাখার আলমারি বা ওয়াক-ইন ক্লোজেটও ওই ঘরের চেয়ে বড়। এত ছোট একটি ঘরে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কী এমন সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারত? এর আসল শিক্ষা হলো মানসিকতা—স্ত্রীকে প্রীতি ও সহায়তার অনুভূতি দেওয়া। নবীজি (সা.) বুঝিয়ে দিয়েছেন, স্ত্রী যদি প্রয়োজনে সাহায্য চায়, তবে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হয়েও তিনি হাত বাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। আমি বলছি না আপনাকে প্রতিদিন ঘর মোছা বা বাসন মাজার দায়িত্ব নিতে হবে, তবে প্রয়োজনের সময় একজন সহানুভূতিশীল সঙ্গী হিসেবে পাশে দাঁড়ানো জরুরি।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে বিয়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে শান্তিময় জীবনের কথা বলেছেন, যেন তোমরা একে অপরের কাছে গিয়ে প্রশান্তি লাভ করতে পারো।
কাজেই কাজ শেষে ঘরে ফেরার সময় এমন এক সুকুন বা প্রশান্তির পরিবেশ পাওয়ার আশা একজন স্বামী করতেই পারে। একইভাবে স্ত্রীও পথ চেয়ে থাকে এমন এক স্বামীর জন্য, যিনি তার কাজের মূল্য দেবেন।
আজই বোনদের এক ক্লাসে আমি যখন বললাম, একটা ভালো ও মিষ্টি কথা বলাও সদকা, তাই স্বামীর সাথে সুন্দর ভাষায় কথা বলুন; তখন উপস্থিত বোনরা হেসে উঠে বললেন, ‘আমরা তো স্বামীর কাছ থেকে কখনো একটা ভালো কথা শুনতেই পাই না!’
সুন্নত পালনের জন্য দাড়ি রাখা নিয়ে আমাদের যতটা আগ্রহ, মুখের কথায় সুন্নতের মাধুর্য ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে আমাদের ততটা তাগিদ নেই কেন? আমরা যদি মানুষকে ধন্যবাদ জানাতে শিখি, তবে আমাদের কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার সবচেয়ে বড় দাবিদার তো আমাদের জীবনসঙ্গী। একটা সুন্দর কথা বলতে তো কোনো টাকা লাগে না, তবে কেন এই কৃপণতা? আপনার স্ত্রীর সাথে সুন্দরভাবে কথা বলুন।
সুখী জীবনের দ্বিতীয় উপাদান হলো একটি প্রশস্ত বাসস্থান। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ, আমার গুনাহ ক্ষমা করুন, আমার ঘরকে প্রশস্ত করে দিন এবং আমার রিজিক বরকতময় করুন।’
সুতরাং হালাল উপার্জনে একটি প্রশস্ত বাড়ি তৈরি করার চেষ্টা করা যেখানে পরিবারের সবার নিজস্ব জায়গা থাকবে, পড়াশোনা বা ইবাদতের আলাদা স্থান থাকবে, এটা ইসলামে নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় নয়।
তৃতীয় উপাদান হলো ভালো প্রতিবেশী। আপনার বাড়ি যত সুন্দর বা আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধই হোক না কেন, প্রতিবেশী যদি খারাপ হয় তবে আপনার সমস্ত আনন্দ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের সামনে তিনবার কসম খেয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়!’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কে হে আল্লাহর রাসুল?’ তিনি বললেন, ‘যার অনিষ্ট ও ক্ষতি থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদবোধ করে না।’ অর্থাৎ যার প্রতিবেশী সারাক্ষণ চিন্তায় থাকে, আজ পাশের ঘর থেকে কী ঝামেলা আসবে, তাদের সন্তানরা আমার বাগান নষ্ট করবে কিনা, নাকি অহেতুক গালিগালাজ করবে!
পূর্বসূরিদের একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তির গল্প মনে পড়ে। তখনকার সময়ে ওই এলাকার একেকটি বাড়ির দাম ছিল হয়তো ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু তিনি নিজের বাড়ি বিক্রির দাম হাঁকলেন ৭৫ হাজার টাকা। সবাই অবাক হয়ে জানতে চাইল, সবার বাড়ির দাম ৫০ হাজার হলে আপনার বাড়ির দাম ৭৫ হাজার কেন? তিনি উত্তর দিলেন, বাড়ির আসল দাম ৫০ হাজারই, আর বাকি ২৫ হাজার টাকা হলো আমার পাশে অমুক ভালো লোকটির প্রতিবেশী হয়ে থাকার মূল্য!
একজন ভালো প্রতিবেশীর কারণে ঘরের মূল্য এভাবে বেড়ে যায়। আমরা মুসলমানরা যদি সত্যি ইসলামের আদর্শ অনুযায়ী চলতাম, তবে বাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপনে লেখা থাকত, চারটি বেডরুম, তিনটি বাথরুম, সাথে একজন মুসলিম প্রতিবেশী! কারণ পাশের বাড়ির মানুষটি জানত, ওখানে গভীর রাতে গান-বাজনা হবে না, কুকুরের উৎপাত থাকবে না, মদ্যপানের ঝামেলা থাকবে না, আর কেউ পরনারীর দিকে কুনজরে তাকাবে না।
আরও পড়ুন অমুসলিম প্রতিবেশীদের সাথে যে আচরণের শিক্ষা দেয় ইসলামআল্লাহ তাআলা আমাদের ঘরগুলোকে এই শুভ চার উপাদানে ভরিয়ে দিন, মৃত্যুর দিন পর্যন্ত আমাদের শান্তিতে রাখুন এবং আমাদের শোনা কথাগুলো জীবনে বাস্তবায়ন করার তওফিক দান করুন।
সূত্র: উস্তাদ মোহাম্মদ বাজুর একজন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, আলেম, শিক্ষক ও দাঈ। তিনি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব, তরবিয়ত এবং সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে মননশীল ও হৃদয়গ্রাহী বয়ান দেওয়ার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তিনি মূলত লেবানিজ বংশোদ্ভূত এবং দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ইউটিউব চ্যানেল এপিক মসজিদ-এ প্রকাশিত তার ইংরেজি বক্তব্যের ভিডিও থকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।
ওএফএফ