ঢাকায় এসে থানার হাজতে এক রাত কাটাতে হলো কুমিল্লার দুই তরুণকে। তাদের অপরাধ, গভীর রাতে জিয়া উদ্যান এলাকা দিয়ে ফিরছিলেন। আটকের পর পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন তারা। তবে এজন্য এক পুলিশ সদস্যকে দিতে হয়েছে ১০০ টাকা। পরে অভিভাবকরা থানায় এসে এক হাজার টাকা করে দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যান।
Advertisement
ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর কাফরুল থানায়। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)।
রাজধানীর বিভিন্ন থানার মধ্যে একটি মিরপুর বিভাগের কাফরুল থানা। অপরাধ দমনে থানা পুলিশের সদস্যরা সর্বদা সক্রিয় হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। আইন-কানুনের ব্যত্যয় ঘটলে অভিযুক্ত আসামিদের আটক, গ্রেফতার কিংবা মামলা করা হয়। অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ ওঠে।
কেমন চলছে কাফরুল থানা তা সরেজমিনে দেখতে বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে ঢুঁ মারি সেখানে।
Advertisement
কাফরুল থানায় গাড়ির স্তূপ, ছবি: জাগো নিউজ
থানা চত্বরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে থানার জরাজীর্ণ দৃশ্য। প্রধান ফটক পেরোতেই দুপাশে স্তূপ হয়ে আছে ভাঙাচোরা ও পুরোনো জব্দ করা গাড়ি। ভেতরে সেবা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন।
জিয়া উদ্যানে ঘুরতে এসে হাজতে দুই বন্ধু২৯ জুলাই, বিকেল ৩টা। কাফরুল থানা ভবনের ভেতরে সোফায় বসে ছিলেন রাফসান আহমেদ সিয়াম ও হৃদয় নামের দুই তরুণ। তাদের চেহারায় তখনো ক্লান্তির ছাপ।
আলাপকালে জানা যায়, দুজনেই এসেছিলেন কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এক বন্ধুর বাসায়। রাফসান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ছাত্র। ঢাকায় এসেছিলেন কলেজের কিছু কাগজপত্র সংগ্রহ করতে।
Advertisement
আর হৃদয় এসেছিলেন রংপুর থেকে গাবতলীতে নামতে যাওয়া তার পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রিসিভ করে কুমিল্লায় নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। বুধবার তাদের এসব কাজ সম্পন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু আগের রাতে ঘটে বিপত্তি।
রাফসান আহমেদ সিয়াম জানান, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাতে আনুমানিক ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে চা খেয়ে সংসদ ভবনের পেছনের রাস্তা দিয়ে তারা ফার্মগেটে বন্ধুর বাসায় ফিরছিলেন। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ সদস্য তাদের পথরোধ করে এত রাতে ওই পথ দিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা স্যারদের বলি, বাসায় যাচ্ছি। আমরা নতুন আসায় রাস্তাঘাট চিনতাম না, জানলে এদিক দিয়ে জীবনেও আসতাম না। আমাদের ভুল হয়েছে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ করি। কিন্তু পুলিশ আমাদের অনেকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখে সবকিছু তল্লাশি করে, তবে আমাদের কাছে অবৈধ কিছুই পায়নি।’
আরও পড়ুন ডিএমপির দুই থানার ওসি বদলি নায়িকা ববির বাড়িতে চুরি, কাফরুল থানায় মামলাপুলিশের বরাত দিয়ে সিয়াম আরও জানান, হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তোলার সময় তাদের বলা হয়েছিল বড় স্যারের সঙ্গে কথা বলিয়ে আবার নামিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু থানায় এনে একটি সাদা কাগজে নাম-ঠিকানাসহ পরিচয় লিখে নিয়ে বলা হয়, ‘বড় স্যার চলে গেছেন, সকালে কথা হবে।’ অনেক আকুতি করেও রক্ষা মেলেনি। রাত কাটাতে হয় থানার সেলে।
হাজতের বর্ণনা দিয়ে সিয়াম বলেন, ‘আমরা প্রায় ২১ জনের মতো ছিলাম। এত আসামির মধ্যে রাতে ভালো করে ঘুমাতেও পারিনি। রাতে খাবার দিলেও আমি খাইনি, শুধু সকালের নাশতাটা খেয়েছি। পরে আজ গার্ডিয়ান এসে এক হাজার টাকা করে জরিমানা দিয়ে আমাদের ছাড়িয়ে নিয়েছে।’
ডিএমপির কাফরুল থানা, ছবি: জাগো নিউজ
মোবাইলে এক কলে ১০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগআটক হওয়ার একই বিবরণ দিয়ে হৃদয় বলেন, ‘আমার বউ আজ (২৯ জুলাই) রংপুর থেকে আসবে, গাবতলী থেকে তাকে রিসিভ করার কথা। তাই সকালে কখন রওয়ানা দেবে, কীভাবে আসবে—তা জানার জন্য ফোনে কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কেউ সাহায্য করেনি, আগেই আমাদের ফোন থানায় জমা নিয়ে নেওয়া হয়েছিল।’
হৃদয় আরও অভিযোগ করেন, ‘থানায় বসা এক পুলিশ সদস্য আমাদের পাহারা দিচ্ছিলেন। একটি কল করার সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে তিনি আমাদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নিয়েছেন।’
তবে অভিযুক্ত ওই পুলিশ সদস্যের নাম বা পরিচয় এবং থানা থেকে ছাড়া পেতে জরিমানা বাবদ এক হাজার টাকা কে নিয়েছেন সে বিষয়ে বলতে পারেননি এই ভুক্তভোগী।
গ্রেফতারের তথ্য মিলেনিকাফরুল থানা পুলিশের কাছে আসামি গ্রেফতারের তথ্য চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারেনি। দায়িত্বরত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিদিন সাত থেকে ১০ জন গ্রেফতার করেন তারা।
ডিএমপির কাফরুল থানা, ছবি: জাগো নিউজ
কাফরুল থানার ওসির বক্তব্যথানার জনবল বা যানবাহনসহ কোনো ধরনের সংকট আছে কি না জানতে চাইলে কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার থানায় যখন যা প্রয়োজন মনে করে, তা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে কিছু সমস্যা তো থাকেই। মাঝেমধ্যে থানার গাড়িও নষ্ট হয়, আবার ঠিক করি। আমাদের আসামি ধরার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। আমরা অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের ধরছি।’
আটক আসামিদের ফোনকলের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে ১০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ওসি বলেন, ‘আমার কাছে এমন কোনো অভিযোগ আসেনি। এলে আমি ব্যবস্থা নেব।’
আরও পড়ুন কাফরুলে গুলি করে ব্যবসায়ীর কাছে কোটি টাকা চাঁদা দাবি, গ্রেফতার ৪ সরেজমিনে মোহাম্মদপুর থানা / ‘পুলিশ বলছে, অপরাধ যেহেতু করেছে একটা শিক্ষা দেওয়া লাগবে’এছাড়া থানার বাইরে জব্দ করা গাড়ির স্তূপ প্রসঙ্গে তিনি জানান, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আলামত হিসেবে এসব গাড়ি থানায়ই রাখতে হয়, তাই গাড়িগুলো অন্য কোথাও রাখার সুযোগ নেই।
মিরপুর বিভাগের বিভিন্ন থানা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে জানতে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকারকে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেআর/এমএমএআর/ এমএফএ