আইন-আদালত

একজন ফোন করে জানান, আমার ভাই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মিরপুরে কলেজছাত্র ফয়জুল ইসলাম রাজনকে গুলি করে হত্যার খবর কীভাবে পান সে বিষয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন তার বড় ভাই মো. রাজিব। সেদিন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের সশস্ত্র অবস্থানের কারণে হাসপাতাল থেকে মরদেহ বের করে নিতে দেরি হওয়ার বিষয়ও তুলে ধরেন তিনি।

Advertisement

রোববার (২ আগস্ট) রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাজিব তার জবানবন্দি পেশ করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে করা মামলায় জবানবন্দি পেশ করেন তিনি।

মামলায় রাষ্ট্র পক্ষের ২৮তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি পেশ করেন রাজিব। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কলেজছাত্র রাজনকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীর বড় ভাই মো. রাজিব। জবানবন্দিতে রাজিব জানান, সেদিন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অবস্থান করায় ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ মরদেহ হাসপাতাল থেকে আনতে পারছিলেন না তারা।

তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে খোঁজ নিয়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে পারেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নির্দেশে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তার ভাইকে হত্যা করেছে।

Advertisement

আরও পড়ুন হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু / তদন্ত প্রতিবেদন হয়নি, লাশ উত্তোলনের আবেদনও খারিজ

এদিন ২৮তম সাক্ষী রাজিবের সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা হয়েছে। সাক্ষ্য শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আগামী ৪ আগস্ট থেকে মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেছেন।

এর আগে জবানবন্দিতে রাজিব বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট সময়কালে আমি মিরপুর-১১ এলাকায় একটি প্রিন্টিং ফ্যাক্টরিতে চাকরি করতাম। আমার ছোট ভাই ফয়জুল ইসলাম মিরপুর-১০ এলাকায় অবস্থিত ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ালেখা করতো। পাশাপাশি একটি কসমেটিকসের দোকানে কাজ করতো। আমার ভাই ১৭ জুলাই থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল।

রাজনের মৃত্যুর দিনের ঘটনা উল্লেখ করে রাজিব বলেন, ১৯ জুলাই ডিউটি শেষ করে কেরানীগঞ্জের বাড়িতে যাই। বাড়ি যাওয়ার পর আমার মা বলেন যে, তিনি আমার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। দুপুর ১২টার সময় রাজনের সঙ্গে আমার মায়ের সর্বশেষ কথা হয়। এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে এক অপরিচিত নারী আমার মাকে ফোন দিয়ে প্রথমে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি রাজনের মা কি না এবং পাশে কেউ আছে কি না। আমার মা আমাকে ফোন দিলে আমি ওই নারীর সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমাকে জানান যে আমার ভাই রাজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে।

রাজিব আরও বলেন, এরপর আমি বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য মিরপুর-৬-এ অবস্থানরত আমার বোন শান্তাকে মিরপুর আজমল হাসপাতালে খোঁজ নিতে বলি। বোন খোঁজ নিয়ে রাত ৮টার দিকে জানায় যে আমার ভাই রাজন নিহত হয়েছে।

Advertisement

আরও পড়ুন জাহাজবাড়ি হত্যাকাণ্ডে অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়েছে

তিনি বলেন, ওই সময়ে হাসপাতালের সামনে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অবস্থান করায় আমার ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ মরদেহ হাসপাতাল থেকে আনা যাচ্ছিল না। রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে আমার বোনের অনুরোধে একজন অপরিচিত ব্যক্তি একটি অ্যাম্বুলেন্সযোগে আমার ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ মরদেহ কেরানীগঞ্জে আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দেন। এরপর আমি আমার ভাইয়ের মরদেহ কাঁধে করে অ্যাম্বুলেন্স থেকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাই। আমার ভাইয়ের বুকের ডান পাশে একটি বড় গুলির ছিদ্র দেখতে পাই। গুলিটি বুকের সামনের দিকে লেগে পিঠের দিক দিয়ে বের হয়ে যায়।

জবানবন্দিতে রাজিব আরও বলেন, পরদিন ২০ জুলাই জানাজা শেষে আমার ছোট ভাই রাজনকে স্থানীয় বাহেরচর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করি।

হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে রাজিব বলেন, আমার ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমি খোঁজখবর নিয়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্নভাবে জানতে পারি, যুবলীগের সভাপতি পরশ ও সাধারণ সম্পাদক নিখিলের নির্দেশে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে। আমি আরও জানতে পারি, শুধু মিরপুর নয়, উত্তরা, মহাখালী, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী এবং টেকনিক্যালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ও পুলিশের কিছু সদস্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

এদিকে, ‌‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ী: শহীদ পরিবার ও আহতদের গণশুনানি’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যাত্রাবাড়ীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মামলা হয়েছে। কেউ আদালতে, কেউ থানায়, আবার কেউ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন।

স্থানীয় থানায় হওয়া মামলাগুলোও ট্রাইব্যুনালে নেওয়ার এখতিয়ার চিফ প্রসিকিউটরের রয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, যেহেতু এই মামলাগুলো যাত্রাবাড়ী গণহত্যার, এটা যেহেতু মানবতাবিরোধী অপরাধ; সে কারণে যে মামলাগুলো থানা পুলিশ ধরেছে, সেগুলোও আমি তুলে নিয়ে ট্রাইব্যুনালে বিচারের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবো।

চিফ প্রসিকিউটর জানান, যাত্রাবাড়ীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ৭৫ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শুধু ৫ আগস্টেই ৫০ থেকে ৫৫ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

এফএইচ/কেএসআর