দেশজুড়ে

সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে রাজশাহীর রেলগেইট অবরোধ

আজ ৩ আগস্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এই দিনেই রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আয়োজিত বিশাল সমাবেশ থেকে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী নাহিদ ইসলাম তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগ দাবিতে এক দফা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ৪ আগস্ট থেকে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের জন্য ‌‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই ঘোষণার সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে একাত্মতা প্রকাশ করে দেশের বিভিন্ন জেলার মতো রাজশাহীতেও আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।

Advertisement

সকাল থেকেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হতে থাকেন। জাতীয় পতাকা, ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে মানুষের ঢল ছড়িয়ে পড়ে দোয়েল চত্বর, জগন্নাথ হল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গেট এবং শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত। পুরো এলাকা ‘দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। বিকেল ৫টার দিকে নাহিদ ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে এক দফা ঘোষণা করেন এবং শেখ হাসিনার সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বলেন, কেবল প্রধানমন্ত্রীর নয়, পুরো মন্ত্রিসভার পদত্যাগ এবং আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও গুম-অপহরণের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও ঘোষণা দেন, সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে একটি জাতীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হবে এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি শুরু হবে।

‘৩ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের গণআন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক দিন। সেদিন আমি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে। রাজশাহীর রাজপথে আমি দেখেছি হাজারো শিক্ষার্থীর সাহস, শৃঙ্খলা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। তারা কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশায় আন্দোলন করছিল।’

Advertisement

সমাবেশ শেষে বিক্ষোভকারীরা টিএসসি ও রাজু ভাস্কর্য এলাকায় অবস্থান নেন। পরে তারা শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। একই সময়ে আন্দোলনের আরেক সমন্বয়কারী আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া অসহযোগ আন্দোলন সফল করতে ১৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এতে কর ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ না করা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা বন্ধ রাখা, গণপরিবহন চলাচল বন্ধ, সরকারি সভা-সেমিনার বর্জন, ব্যাংকের সীমিত কার্যক্রম, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অফিসে না যাওয়া, বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আহ্বান জানানো হয়।

রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় আন্দোলনের কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও মিরপুর-১০ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহতদের বিচারের দাবিতে হাজারো মানুষ রাজপথে অবস্থান নেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাবি শিক্ষার্থীদের সড়কে অবস্থান/ ছবি: জাগো নিউজ

কেন্দ্রের এই ঘোষণার সঙ্গে সমন্বয় রেখে রাজশাহীতেও আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), রাজশাহী কলেজসহ নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সকাল থেকেই একত্রিত হতে থাকেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রুয়েটের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হয়। এতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট, রাজশাহী কলেজ এবং বিভিন্ন স্কুল-কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রুয়েটের একাধিক শিক্ষকও কর্মসূচিতে যোগ দেন।

Advertisement

আরও পড়ুন ফিরে দেখা ২ আগস্ট / গ্রেফতার আতঙ্কে স্তব্ধ রাজশাহী, গোপনে বড় আন্দোলনের প্রস্তুতি

মহাসড়কে প্রায় আধা ঘণ্টা অবস্থানের পর আন্দোলনকারীরা একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। মিছিলটি সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, তালাইমারী হয়ে রাজশাহীর রেলগেইট তথা শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরে গিয়ে মিলিত হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় অবস্থান নিয়ে কেন্দ্রের এক দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন। ‘এক দুই তিন চার, স্বৈরাচার তুই গদি ছাড়’, ‘দফা এক, দাবি এক, স্বৈরাচারের পদত্যাগ’, ‘নয় ছয় বুঝি না, কবে যাবি হাসিনা’ এবং ‘আবু সাঈদ মরলো কেন, প্রশাসন জবাব চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

‘পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সামান্য উসকানিতেই বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষার্থী ও পুলিশের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াই। আমরা দুই পক্ষকেই সংযত থাকার আহ্বান জানাই এবং উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করি। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সংঘর্ষ এড়িয়ে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। আমরা যেমন চাইনি রাষ্ট্রীয় কোনো স্থাপনা বা পুলিশের ক্ষতি হোক, তেমনি চাইনি আন্দোলনরত কোনো শিক্ষার্থীও আহত বা প্রাণহানির শিকার হোক।’

মহাসড়ক অবরোধের সময় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীরা রুয়েটের প্রধান ফটকে প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন প্রতিবাদী দেয়াল লিখনও করেন। পরে রেলগেইটে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান শেষে আন্দোলনকারীরা তালাইমারীর দিকে মিছিল নিয়ে যান, যেখানে পরবর্তী দিনের কর্মসূচি নিয়ে সমন্বয়কারীরা আলোচনা করেন।

দিনভর কর্মসূচির মধ্যে কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। বিক্ষোভ মিছিলের ভিডিও ধারণ করাকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এক পুলিশ কর্মকর্তা হামলার শিকার হন। পরে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একই দিনে বিক্ষোভ চলাকালে নগরীর দুটি পুলিশ বক্স ও দেবীশিংপাড়া আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তালাইমারী এলাকায় নৌকা প্রতীক এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুনও ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া এক পুলিশ সদস্য ও কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।

৩ আগস্টের আন্দোলনে অংশ নেওয়া রুয়েট শিক্ষার্থী তানভির হাসান বলেন, কেন্দ্র থেকে এক দফা ঘোষণার পর আমাদের আর পিছু হটার সুযোগ ছিল না। রাজশাহীর শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই কেন্দ্রের কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে আন্দোলন চালিয়ে গেছে। রেলগেইট অবরোধের মাধ্যমে আমরা স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছি-দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মতো রাজশাহীও এই গণআন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের দাবি ছিল জনগণের ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার এবং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।

৩ আগস্টের আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু।

সেদিনের স্মৃতি স্মরণ করে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, কেন্দ্র থেকে এক দফা ঘোষণার পর রাজশাহীতেও আন্দোলনে নতুন গতি আসে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট, রাজশাহী কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এক কাতারে নেমে এসেছিল।

আরও পড়ুন ফিরে দেখা ১ আগস্ট / রাবি থেকে শিক্ষার্থীদের তুলে নেওয়ার চেষ্টা, ঢাল হয়ে দাঁড়ান শিক্ষকরা

মাহমুদুল হাসান মিঠু বলেন, আমরা শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি আন্দোলনকে কেন্দ্রের কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে নিতে। রেলগেইট অবরোধ ছিল রাজশাহীর আন্দোলনের অন্যতম বড় কর্মসূচি, যেখানে হাজারো শিক্ষার্থীর পাশাপাশি শিক্ষক ও সাধারণ মানুষও সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। সেদিন রাজশাহীর রাজপথে যে ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল।

‘কেন্দ্র থেকে এক দফা ঘোষণার পর আমাদের আর পিছু হটার সুযোগ ছিল না। রাজশাহীর শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই কেন্দ্রের কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে আন্দোলন চালিয়ে গেছে। রেলগেইট অবরোধের মাধ্যমে আমরা স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছি-দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মতো রাজশাহীও এই গণআন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের দাবি ছিল জনগণের ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার এবং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।’

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পদবী থাকায় পূর্বের কর্মসূচিগুলোতে আমরা পিছনের সারিতে থেকে আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। যখন দেখলাম, স্কুল কলেজের ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে তখন বিবেকের তাড়নায় একজন ছাত্রনেতা হিসেবে তাদের সুরক্ষার জন্য আমরা সামনের কাতারে চলে আসি। মাথায় একটাই জিনিস ঘুরপাক করতো, গুলি যদি লাগে তাহলে যেন আমাদের বুকে লাগে, আঘাত এলে আমরা যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারি। কারণ রাজশাহীতে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা শহরে সশস্ত্র অবস্থানে ছিল। সেই দৃশ্য আজও মনে হলে মনে হয়, এটি ছিল বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্নে মানুষের সম্মিলিত জাগরণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

৩ আগস্টের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে রাজপথে নেমেছিলেন নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হাছানাত আলী।

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ৩ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের গণআন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক দিন। সেদিন আমি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে। রাজশাহীর রাজপথে আমি দেখেছি হাজারো শিক্ষার্থীর সাহস, শৃঙ্খলা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। তারা কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশায় আন্দোলন করছিল। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক দাবির প্রতি সহমর্মিতা জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ইতিহাসে রাজশাহীর সেই দিনের আন্দোলন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অবস্থান/ছবি: জাগো নিউজ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম স্মৃতিচারণ করে বলেন, ৩ আগস্ট কেন্দ্রের কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে রাজশাহীর শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমেছিল। পরিস্থিতি অনেক উত্তপ্ত হলেও আমরা শিক্ষকরা সার্বক্ষণিক শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলাম, যাতে কোনো সংঘর্ষ বা প্রাণহানির ঘটনা না ঘটে। রাজশাহীর আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেটিই ছিল সেদিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।”

সেদিনের ঘটনা স্মৃতিচারণ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ৩ আগস্টের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও অনিশ্চয়তায় ভরা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তখন তালাইমাড়ি পুলিশ বক্সের সামনে অবস্থান করছিল, আর অপর পাশে মতিহার থানা পুলিশের সদস্যরা অবস্থান নিয়েছিলেন। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। টিয়ার গ্যাসের জবাবে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মতিহার থানার দিকে অগ্রসর হয়ে থানা ঘেরাওয়ের চেষ্টা করে। তখন পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সামান্য উসকানিতেই বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষার্থী ও পুলিশের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াই। আমরা দুই পক্ষকেই সংযত থাকার আহ্বান জানাই এবং উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করি। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সংঘর্ষ এড়িয়ে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। আমরা যেমন চাইনি রাষ্ট্রীয় কোনো স্থাপনা বা পুলিশের ক্ষতি হোক, তেমনি চাইনি আন্দোলনরত কোনো শিক্ষার্থীও আহত বা প্রাণহানির শিকার হোক।

আরও পড়ুন ফিরে দেখা ৩১ জুলাই / আন্দোলনের মধ্যেই ভিন্ন মতাদর্শের লড়াই চলে রাবির দুই শিক্ষক সংগঠনের

ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, একজন শিক্ষক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ছিল আমাদের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে সহিংসতা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখা। সেই কঠিন মুহূর্তে আমরা মানবিক অবস্থান থেকে কাজ করেছি, যাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ না নেয়।

৩ আগস্টের রাজশাহীর আন্দোলন ছিল কেন্দ্র ঘোষিত এক দফা দাবির সঙ্গে সমন্বিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট, রাজশাহী কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সেদিন নগরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ। রেলগেইট অবরোধ, মহাসড়কে বিক্ষোভ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর একাত্মতা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আন্দোলন অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় রাজশাহীর আন্দোলনকে জাতীয় গণআন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী অধ্যায়ে পরিণত করে।

এনএইচআর/এএসএম