গরমের দিনে ক্লান্ত শরীরে একটু স্বস্তি পেতে অনেকেই রাস্তার ধারের চটপটি, ফুচকা বা শরবতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কম দামে সুস্বাদু এই খাবারগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই খাবারের আড়ালেই লুকিয়ে আছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।
Advertisement
সাম্প্রতিক নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক প্লেট চটপটিতেই থাকতে পারে ৭ কোটি ক্ষতিকর জীবাণু, যার একটি বড় অংশ মলমূত্রজাত ব্যাকটেরিয়া। এসব জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে ডায়রিয়া, পেটের সংক্রমণসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি করে।
কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তার খাবার?রাজধানীর বেশিরভাগ স্ট্রিট ফুড বিক্রির জায়গাগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের সময় পরিচ্ছন্নতার অভাবই প্রধান সমস্যা। ফুটপাতের ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া, খোলা পরিবেশের কারণে খাবার সহজেই দূষিত হয়ে পড়ে।
অনেক বিক্রেতা অপরিষ্কার পানিতে প্লেট ধুয়ে আবার সেই প্লেটেই খাবার পরিবেশন করেন। এতে জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া খাবারগুলো খোলা অবস্থায় রাখা হয়, ফলে তাতে মাছি বসে বা ধুলা জমে, যা রোগের অন্যতম বাহক।
Advertisement
স্ট্রিট ফুড তৈরিতে ব্যবহৃত পানি অনেক সময়ই নিরাপদ নয়। অনেক এলাকায় পানির লাইনের সঙ্গে পয়ঃনিষ্কাশনের লাইন মিশে যাওয়ার কারণে পানি দূষিত থাকে। সেই পানি দিয়েই খাবার তৈরি বা বাসন ধোয়া হয়।শরবত বা আখের রসে ব্যবহৃত বরফও অনেক সময় অপরিষ্কার পানি থেকে তৈরি হয়। ফলে এই বরফ শরীরে প্রবেশ করে নানা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
একই তেল বারবার ব্যবহাররাস্তার খাবারের দোকানে প্রায়ই একই তেল বারবার ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তেল গরম করলে এতে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি হৃদরোগ, লিভারের সমস্যা এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
যেসব ধরনের রোগ হতে পারেএই ধরনের দূষিত খাবার খেলে শরীরে নানা ধরনের জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হলো ডায়রিয়া ও ফুড পয়জনিং, যা সাধারণত ব্যাকটেরিয়া বা দূষিত পানির কারণে হয়। এতে বমি, পেটব্যথা, দুর্বলতা এবং পানিশূন্যতার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
এছাড়া পেটের সংক্রমণও একটি বড় ঝুঁকি, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে হজমের সমস্যা ও পুষ্টির ঘাটতি তৈরি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে টাইফয়েডের মতো গুরুতর সংক্রমণও হতে পারে, যা দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে ছড়ায় এবং জ্বর, মাথাব্যথা ও দুর্বলতার কারণ হয়।
Advertisement
জন্ডিস বা হেপাটাইটিসও এই ধরনের খাবার থেকে হতে পারে, যা লিভারের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও লিভারের কার্যকারিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি।
যেভাবে প্রতিরোধ করবেন ১. পরিষ্কার দোকান বেছে নিনরাস্তার খাবার খেতে হলে এমন দোকান বেছে নিন যেখানে কিছুটা হলেও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা হয়। বিক্রেতা হাত ধুচ্ছেন কি না, পরিষ্কার পানি ব্যবহার করছেন কি না সেদিকে খেয়াল করুন।
২. খোলা খাবার এড়িয়ে চলাযেসব খাবার খোলা অবস্থায় রাখা হয়, সেগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো। ঢেকে রাখা খাবার তুলনামূলক নিরাপদ।
৩. বরফ ও পানি সম্পর্কে সতর্ক থাকাশরবত বা ঠান্ডা পানীয় খাওয়ার সময় বরফের উৎস সম্পর্কে সচেতন থাকুন। সম্ভব হলে বোতলজাত বা নিরাপদ পানি ব্যবহার করা পানীয় বেছে নিন।
৪. বারবার ব্যবহার করা তেল এড়িয়ে চলাঅতিরিক্ত তেলে ভাজা বা দীর্ঘ সময় ধরে ভাজা খাবার না খাওয়াই ভালো। এতে ক্ষতিকর চর্বি শরীরে প্রবেশ করে।
৫. ঘরে তৈরি বিকল্প বেছে নেওয়াসম্ভব হলে বাড়িতে চটপটি বা ফুচকা তৈরি করে খেতে পারেন। এতে উপকরণ ও পরিচ্ছন্নতা দুটাই আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
৬. হাত পরিষ্কার রাখাখাওয়ার আগে অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন বা স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন। এতে অনেক জীবাণু থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
৭. সচেতনতা বাড়ানোনিজে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি পরিবার ও আশপাশের মানুষদেরও সচেতন করুন। বিশেষ করে শিশুদের রাস্তার খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক রাখুন।
সূত্র: বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, হেলথলাইন, হেলথ শটস ও অন্যান্য
আরও পড়ুন: গরমে ভাত না রুটি, কোনটি শরীরের জন্য ভালো? আদা-মধু-কালিজিরায় মিলতে পারে বড় উপকারএসএকেওয়াই